hadith book logo

শিশুর নৈতিকতা গঠনে পারিবারিক শিক্ষা ও পর্দা অনুশীলনের গুরুত্ব

লেখকঃ ড. মোঃ আবদুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

১. যত্নশীলতা, স্নেহ-মমতা, আদর-ভালোবাসা দেওয়া:

শিশুরা স্রষ্টার মহান আমানত। তারা নিষ্পাপ, অপ্রষ্ফুটিত পুষ্পকলির মতো পবিত্র। পিতা-মাতা, অভিভাবকদের কাছে কোমলতা, মমতা, আদর সোহাগ পেলে তাদের হৃদয় আনন্দে উচ্ছাসে ভরে ওঠে, যা শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য একটি অপরিহার্য উপাদান। পক্ষান্তরে নিষ্ঠুরতা, অবহেলা ও সহিংসতাপূর্ণ প্রতিকূল পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা তাদের মধ্যে মানসিক জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ক্রমান্বয়ে তাদের মানবিক গুণাবলী আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং পাশবিক চিন্তাধারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এরাই একদিন বড় হয়ে মানব সমাজের জন্য বিপজ্জনক ও ধ্বংসাত্মক উপাদানে পরিণত হয়।

সন্তানের প্রতি মাতাপিতার হৃদয়জুড়ে অফুরন্ত ভালোবাসার যে ফাল্গুধারা আছে তা একটি স্বতঃসিদ্ধ সহজাত সত্য হলেও আজকাল যান্ত্রিক সভ্যতা ও ভোগবাদী বস্তুতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা মানুষকে হৃদয় মনহীন এমন এক যন্ত্রে রূপান্তরিত করেছ যে, এক শ্রেণীর পিতা-মাতা অর্থ ও প্রাচুর্যের পাহাড় গড়তে গিয়ে সন্তানের মানসিক ভবিষ্যৎ গড়ার কথা বে-মা‘লুম ভুলে যান। যে সময় সন্তানের হৃদয় থাকে পিতা-মাতার স্নেহ মমতা ও আদর-সোহাগের প্রবল পিপাসা, তখন তারা তাকে তুলে দেন কাজের মেয়ে কিংবা বেতনভোগী কর্মচারীদের হাতে।

ফলে পিতা-মাতার সান্নিধ্য সংস্পর্শ বঞ্চিত এসব শিশু মানসিক শূন্যতায় ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। এই শূন্যতা ঘোচানোর জন্য সে একসময় অসৎ, ভবঘুরে বন্ধুদের সাহচর্য খুঁজে নেয়। সে জানে না যে, এরাই একদিন তাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দেবে। এ জন্য আমরা দেখি যে, বখাটেদের মধ্যে এমন অনেকেই রয়েছে, যারা মূলত ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। অর্থাভাব বা অন্য কিছু নয়, শুধুমাত্র পিতা-মাতার উদাসীনতাই তাদের এই অধঃপতনের কারণ।

আসলে পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা একত্রিত করলেও পিতা-মাতার ভালোবাসা আত্মত্যাগ ও উৎসর্গের কোনো বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। এজন্যই তো ইসলাম পারিবারিক ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন করেছে। যেন ভূমিষ্ঠ হওয়ার অব্যবহিত পরেই শিশু এমন একটি জান্নাতী পরিমণ্ডলের আশ্রয় পায়, সেখানে সবাই তাকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে বরণ করে নেয়।

শিশু ও সন্তান-সন্ততির প্রতি দয়া-ভালোবাসা প্রদর্শনে মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে কত যত্নশীল ছিলেন, তা নিম্নোক্ত হাদীসগুলো থেকে প্রমাণিত হয়। হাদীসে এসেছে,

«قبل رسول الله الحسن بن علي وعنده الأقرع بن حابس التميمي جالسا فقال الأقرع إن لي عشرة من الولد ما قبلت منهم أحدا فنظر إليه رسول الله ثم قال من لا يرحم لا يرحم» .

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নাতি হাসান ইবন ‘আলীকে চুমু দিচ্ছিলেন। তখন তাঁর কাছে আকরা ইবন হাবিছ আত-তাইমী নামে একজন সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। আকরা বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার দশটি সন্তান। আমি কোনো দিন তাদের কাউকে চুমু দেই নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে (বিস্ময়ভরে) তাকালেন। তারপর বললেন, যে ব্যক্তি দয়া প্রদর্শন করে না, সে দয়ার পাত্রও হতে পারে না।” [বুখারী, কিতাবুল আদব, বাবু রাহমাতিন ওয়ালাদ, হাদীস নং-৫৯৯৭।]

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের কান্না সহ্য করতে পারতেন না। প্রয়োজনে সে কারণে সালাতকেও সংক্ষিপ্ত করতেন। হাদীসে এসেছে,

«إني لأقومُ في الصلاة أريدُ أن أطوِّل فيها ، فأسمعُ بكاءَ الصَّبيِّ فأتجوَّزُ في صلاتي ، كراهية أن أشقَّ على أُمِّه» .

“আমি সালাতকে দীর্ঘায়িত করার ইচ্ছা নিয়ে সালাত পড়তে দাঁড়াই। তারপর শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পাই এবং তা তার মাকে বিচলিত করতে পারে এ আশংকায় আমি সালাত সংক্ষিপ্ত করি।”

আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

«دَخَلْ وَإِبْرَاهِيمُ يَجُودُ بِنَفْسِهِ ، فَجَعَلَتْ عَيْنَا رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم تَذْرِفَانِ . فَقَالَ لَهُ عَبْدُ الرَّحْمَنِ بْنُ عَوْفٍ رضى الله عنه وَأَنْتَ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَقَالَ « يَا ابْنَ عَوْفٍ إِنَّهَا رَحْمَةٌ . ثُمَّ أَتْبَعَهَا بِأُخْرَى فَقَالَ صلى الله عليه وسلم إِنَّ الْعَيْنَ تَدْمَعُ ، وَالْقَلْبَ يَحْزَنُ ، وَلاَ نَقُولُ إِلاَّ مَا يَرْضَى رَبُّنَا ، وَإِنَّا بِفِرَاقِكَ يَا إِبْرَاهِيمُ لَمَحْزُونُونَ » .

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পুত্র ইবরাহীম-এর কাছে গেলেন। তিনি তখন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন। এ দৃশ্য দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু’চোখে অশ্রু ঝরতে থাকে। আব্দুর রহমান ইবন আওফ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আপনিও (কাঁদছেন)! তিনি বললেন, হে আওফের পুত্র! এটা হচ্ছে মায়া-মমতা। এরপর তাঁর চোখ থেকে আবারও অশ্রু ঝরতে লাগল। তারপর তিনি বললেন, হে চোখ অশ্রু ঝরাও, হৃদয় শোকার্ত হও, তবে আমরা আমাদের মুখে এমন কথাই বলব, যাতে আমাদের রব সন্তুষ্ট হন। হে ইবরাহীম তোমার বিচ্ছেদে আমরা শোকাহত।” [বুখারী, কিতাবুল জানায়েয, হাদীস নং-১৩০৩।]