hadith book logo

সালাতের গুরুত্ব ও ফযীলত

লেখকঃ শাইখ আব্দুল্লাহ ইবন সা‘দ ইবন ইবরাহীম আল-ফালেহ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

ফজর সালাত:

অন্যান্য সালাত অপেক্ষা ফজর সালাতের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব বেশি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “এশা ও ফজর সালাতে কী ফযীলত রয়েছে মানুষ যদি তা জানত তবে উক্ত সালাতে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও উপস্থিত হত।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “যে ব্যক্তি এশার সালাত জামা‘আতে আদায় করল, সে যেন রাত্রির অর্ধাংশ ইবাদতে লিপ্ত থাকল এবং যে ফজর সালাত জামা‘আতে আদায় করল সে যেন পূর্ণ রাত্রি সালাত আদায় করল।” (সহীহ মুসলিম) এবং তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করল সে আল্লাহর জিম্মার অন্তর্ভুক্ত হল।” (সহীহ মুসলিম)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “ফজরের (সুন্নাত) দু’রাকাত সালাত দুনিয়া ও তার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তা অপেক্ষা উত্তম।” (সহীহ মুসলিম)

এই ফযীলত তো শুধু ফজরের দু’রাকাত সুন্নাতে তাহলে ফজরের ফরয সালাতের ফযীলত কী হতে পারে? নিশ্চয় সুন্নাতের চেয়ে ফরজের সাওয়াব অনেক বেশি ও উত্তম। এ সমস্ত হাদীস ফজর সালাতের বিরাট প্রতিদান ও গুরুত্বের দলীল।

অতএব, প্রিয় মুসলিম ভাই! ফজর সালাতে অলসতা করে এত অধিক নেকী-সাওয়াব নষ্ট করবেন না বরং ঐ সমস্ত মাধ্যম অবলম্বন করার চেষ্টা করুন যা আপনাকে আল্লাহর হুকুমে ফজর সালাতের জন্য জাগিয়ে দিবে।

সালাফে সালেহীন বা সৎ পূর্বসূরীদের জামা‘আতের সালাত আদায় ও তাকবীরে তাহরীমায় শামিল হওয়ার প্রতি সচেষ্ট থাকার বাস্তব নমূনা:

১। সা‘ঈদ ইবন মুসাইয়্যিব রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “চল্লিশ বছর পর্যন্ত আমার সালাতের জামা‘আত ছুটে নি।”

২। আবু হাইয়্যান তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাবী‘ঈ ইবন খুসাইমকে পক্ষাঘাত (রোগ) অবস্থায় সালাতের জন্য (মসজিদে) নিয়ে আসা হত, তাকে বলা হয়েছিল যে, আপনার জন্য বাড়ীতে সালাত আদায়ের অনুমতি রয়েছে। তিনি বলেন আমি তো “হাইয়্যা ‘আলাস সালাহ” শুনতে পাই, তোমাদের যদি সালাতে পৌঁছার সমর্থ থাকে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও সালাতে উপস্থিত হও।”

৩। ইবরাহীম আত-তাইমী রহ. বলেন, “যদি কোনো ব্যক্তিকে সালাতের তাকবীরে উলায় (প্রথম) অংশ গ্রহণে অলসতা করতে দেখ তবে তার থেকে বিমূখ হয়ে যাও।”

৪। মুস‘আব বলেন, ‘আমের মৃত্যু যন্ত্রনায় কাতর অবস্থায় মুয়াজ্জিনের আজান শুনে বলেন, আমার হাত ধর, (মসজিদে যাওয়ার জন্য) তাকে বলা হলো: আপনি তো অসুস্থ। তিনি বললেন: আমি আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর আহ্বান শুনব আর সে আহ্বানে সাড়া দিব না? লোকেরা তার হাত ধরে মসজিদে নিয়ে গেল। তিনি মাগরিব সালাতে ইমামের সাথে যোগ দিলেন এবং এক রাকাত সালাত আদায় করার পর মারা যান, আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন। (এই ব্যক্তি হলেন আমের ইবন আব্দুল্লাহ্ ইবন যুবাইর ইবনুল ‘আওয়াম)

৫। ওয়াকী‘ ইবন জাররাহ বলেন, “আ‘মাশের বয়স যখন প্রায় সত্তর বছর হয়েছিল তবুও তার (সালাতে) তাকবীরে উলা ছুটে নি।”

৬। মুহাম্মাদ ইবন মুবারক বলেন, “সা‘ঈদ ইবন আব্দুল আযীযের সালাতের জামা‘আত ছুটে গেলে তিনি কাঁদতেন।”

৭। গাস্সান বলেন, আমার নিকট আমার ভ্রাতুস্পুত্র বিশর বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি আমার চাচা বিশর ইবন মানসুর বাসরীকে তাকবীরে উলা ছুটেছে দেখি নি।”

সালাতে সালাফে সালেহীনের বিনয় ও একাগ্রতার কতিপয় বাস্তব চিত্র

১। ‘আমের আবদে কায়েস আম্বারীকে বলা হলো: “আপনি কি সালাতে স্বীয় আত্মার সাথে কথা বলেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, আমি আমার আত্মা সাথে আল্লাহর সম্মুখীন এবং স্বীয় পরিণাম সম্পর্কে কথা বলি।”

২। ‘আলী ইবন হুসাইন ইবন যাইনুল আবেদীন যখন সালাতে দাঁড়াতেন তার কম্পন শুরু হয়ে যেত। যখন এ বিষয়ে তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো তখন তিনি বললেন: “তোমরা কি জান না যে, আমি কার সম্মুখে দণ্ডায়মান হই এবং কথোপকথন করি”?

একবার তার বাড়ীতে আগুন লেগে যায় আর তিনি তখন সাজদারত ছিলেন। সাজদাহ থেকে তিনি যখন মাথা উঠান সে সময় আগুন নিভে গিয়েছিল, এ ব্যাপারে তাকে বলা হলে তিনি বলেন, “আমাকে অন্য আরেকটি আগুনে এই আগুন থেকে বিমুখ করে রেখেছিল।”

৩। মুসলিম ইবন ইয়াসার আল বাসারী যখন সালাত আদায় করতেন মনে হতো যেন একটি কাঠ দাঁড়ানো আছে। এদিক সেদিক ঝুকতেন না এবং যখন সালাত শুরু করতেন তার পরিবারকে বলতেন: “তোমরা কথপোকথন কর, কেননা আমি তোমাদের কথা শুনতে পাই না।”

৪। আ‘মাশ বলেন, “ইবরাহীম আত-তাইমী যখন সাজদাহ করতেন মনে হতো তিনি যেন কোনো দেওয়ালের অংশ এবং চড়ুই পাখী তাঁর পিঠে বসে যেত।”

৫। আহমদ ইবনে সিনান বলেন, “আমি ওয়াকী‘কে দেখেছি যখন তিনি সালাতে দাঁড়াতেন সামান্যতমও নড়াচড়া করতেন না এবং উভয় পায়ে ভর না দিয়ে শুধু এক পায়ে ভর করে ঝুঁকে যেতেন না।”

৬। ইয়া‘কুব ইবন ইয়াযীদ বাসরীর একবার সালাতের অবস্থায় কাঁধ থেকে চাদর চুরি হয়ে যায় এবং তাকে এরপর ফিরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু সালাতে মগ্ন থাকার জন্য তিনি তা অনুভবও করতে পারেন নি। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহমত অবতীর্ণ করুন।

৭। মুহাম্মাদ ইবন ইয়া‘কূব বলেন, “আমি মুহাম্মাদ ইবন নাসর মারওয়াযীর চেয়ে উত্তম সালাত আদায়কারী অন্য কাউকে দেখি নি, তার কানে মাছি বসতো এবং রক্ত বয়ে যেত, কিন্তু তিনি মাছিকে সরাতেন না, অতঃপর তিনি বলেন, তিনি স্বীয় চিবুক (থুৎনি) বুকে রেখে এমনভাবে সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন যে মনে হতো তিনি একটি স্থাপনকৃত কাঠ।”

(ইমাম যাহাবী রহ-এর “সিয়ারু আলামিন নুবালা” এর তাহযীব, মুহাম্মাদ ইবন হাসান ইবন আকীলের “নুযহাতুল ফুযালা” থেকে সংকলিত)