hadith book logo

অর্থনীতিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর দশ দফা

লেখকঃ শাহ মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

যাকাত কাদের প্রাপ্য অর্থাৎ কাদের মধ্যে যাকাতের অর্থ বন্টন করে দিতে হবে

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকাত কাদের প্রাপ্য অর্থাৎ কাদের মধ্যে যাকাতের অর্থ বন্টন করে দিতে হবে সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَاِبْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ

দান-খয়রা তো পাওনা হলো দরিদ্র ও অভাবীগণের, যে সকল কর্মচারীর উপর আদায়ের ভার আছে তাদের, যাদের মন (সত্যের প্রতি) সম্প্রতি অনুরাগী হয়েছে, গোলামদের মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্যে, আল্লাহর পথে (মুজাহিদদের) এবং মুসাফিরদের জন্যে। এটি আল্লাহর তরফ হতে ফরয এবং আল্লাহ সব জানেন ও বুঝেন।(সূরা আত তাওবা : ৬০ আয়াত)

উপরের আয়াত হতে আটটি উদ্দেশ্যে যাকাতের অর্থ ব্যবহারের জন্যে সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ পাওয়া যায়। সেগুলি হচ্ছে :১। দরিদ্র জনসাধারণ২। অভাবী ব্যক্তি৩। যে সকল কর্মচারী যাকাত আদায়ে নিযুক্ত রয়েছে৪। নও-মুসলিম৫। ক্রীতদাস বা গোলাম মুক্তি৬। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি৭। আল্লাহর পথে মুজাহিদ এবং৮। মুসাফির।

এই আটটি খাতের মধ্যে ছয়টিই দারিদ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অন্য দুটি খাতও (৩ ও ৭) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা যাকাত আদায় ও ব্যবস্থাপনা একটি কঠিন ও শ্রমসাপেক্ষ কাজ। এ কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এটাই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব।সুতরাং, তাদের বেতন এই উৎস হতেই দেওয়া বাঞ্চনীয়। তাছাড়া যেসব ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামে লিপ্ত তারাও অন্য কোনভাবে জীবিকা অর্জনের সুযোগ হতে বঞ্চিত। সুতরাং, উপরে বর্ণিত আটটি খাতেই যদি যাকাতের অর্থ ব্যয় হয় তাহলে দরিদ্রতা দূর হবে। একই সঙ্গে অন্যান্য বহু অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার নিরসন হবে।রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিশ্চিতভাবেই জানতেন, ইসলামী রাষ্ট্রে মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাকাতের প্রতিষ্ঠা হলে বহুবিধ কল্যাণ সাধিত হবে। তাই তিনি যাকাত যথাযথ আদায় ও তার সুষ্ঠ বন্টনের জন্যে কঠোর তাগিদ দিয়ে গেছেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সুষ্ঠুভাবে যাকাত আদায়ের জন্যে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবম ও দশম হিজরীতে আরব ভূখন্ডের বারোটি এলাকায় বারোজন প্রখ্যাত সাহাবীকে দায়িত্ব প্রদান করেন। নীচে এর বিবরণ দেয়া হলো :নাম্বার এলাকা.... সাহাবীগণের নাম১। মদীনা মুনাওয়ারা.... বিলাল বিন রাবাহ২। মক্কা মুয়াযযামা.... হুবায়রাহ বিন শিবল৩। জেদ্দা.... হারিস বিন নওফল৪। তায়েফ.... উসমান বিন আবী আল-আস৫। সানা.... মুহাজির বিন আবি উমাইয়াহ৬। নাজরান.... আলী বিন আবী তালিব৭। ইয়ামান.... মুআয বিন জাবাল৮। বাহরাইন.... আবান বিন সাঈদ৯। হুনায়ন ....আমর বিন আল-আস১০। খায়বার.... সাওয়াদ বিন আযীয়াহ১১। ওয়াদী উল কুরা.... আমর বিন সাঈদ১২। হাযরামাউত.... যিয়াদ বিন লাবীদ

অনুরূপভাবে চৌদ্দটি প্রধান গোত্র হতে যাকাত আদায়ের দায়িত্ব তিনি বারোজন খ্যাতনামা সাহাবীর উপর অর্পণ করেছিলেন। যথাগোত্র.... সাহাবীগণের নাম১। বনু মুসতালিক.... ওয়ালীদ বিন উকরাহ২। বনু গাতফান..... নওফাল বিন মুয়াবিয়াহ৩। বনু বনু হাওয়াযিন..... ইকরামাহ বিন আবু জাহেল৪। বনু গিফার ও বনু আসলাম.... বুরাইদাহ বিন হুসায়ব৫। বনু হানযালাহ .....মালিক বিন নোওয়াইরাহ৬। বনু সুলাইম ও বনু মুযাইনাহ ....আব্বাস বিন বশীর আশহালী৭। বনু তামীম.... উয়ায়নাহ বিন হিসন৮। বনু জুহায়নাহ.... রাফি বিন মাকীস৯। বনু ক্বিলাব.... যাহহাক বিন সুফিয়ান১০। বনু সাকীফ.... কিলাব বিন উমাইয়াহ১১। বনু আযদ ....হুযায়ফা বিন আল ইমরান১২। বনু তাঈ ও বনু আসাদ.... আদী বিন হাতীম

যাকাত যথাযথ বিলি বন্টনের জন্যেও নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উদ্যোগেই বলিষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরী হয়েছিল যা আজকে যেকোন উন্নত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সঙ্গে তুলনীয়। এ থেকেই বোঝা যায় যাকাত বায়তুলমালের কত বড় গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে নীচে বর্ণিত আট শ্রেনীর কর্মচারী নিয়োজিত ছিল। এর হচ্ছে-

১। সায়ী = গবাদী পশুর যাকাত সংগ্রাহক২। ক্বাতিব = করণিক৩। ক্বাসাম = বন্টনকারী৪। আশির = যাকাত প্রদানকারী ও যাকাত প্রাপকদের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপনকারী৫। আরিফ = যাকাত প্রাপকদের অনুসন্ধানকারী৬। হাসিব = হিসাব রক্ষক৭। হাফিজ = যাকাতের বস্তু ও অর্থ সংরক্ষক এবং৮। ক্বায়াল = যাকাতের পরিমাণ নির্ণয় ও ওজনকারী

যাকাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য বহুবিধ। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান এবং মূখ্য হচ্ছে কতিপয় ব্যক্তির হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে না দেওয়া। ইসলাম সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যকে শুধু নিন্দাই করে না, বরং তা দূরীভূত করার পদক্ষেপও অবলম্বন করতে বলে। তাই একটি সুখী, সুন্দর এবং উন্নত সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে বিত্তশালী মুসলিমদের অবশ্যই তাঁদের সম্পদের একটা অংশ ব্যয় করা উচিৎ। এর ফলে শুধু অসহায় ও দু:স্থ মানবতার কল্যাণ হবে তায় নয়, আয়-বন্টনের বৈষম্যও হ্রাস পাবে।

যাকাত প্রদানের ফলে সম্পদশালী মুসলিমের মন হতে ধন-সম্পদের লালসা দূরীভূত হবে। দরিদ্রদের অভাব মোচনের জন্যে নিজেদের দায়-দায়িত্ব সম্বন্ধে তারা সচেতন হবে। বিত্তবান মুসলমানদের আল্লাহ সৎপথে তাঁদের সম্পদ ব্যয় করার নির্দেশ দিয়েছেন। বাৎসরিক উদ্বৃত্ত অর্থ হতে নির্দিষ্ট হারে একটা অংশ দরিদ্র এবং দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের মধ্যে তাঁরা বিতরণ করবেন। এর ফলে তারা দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ সন্তুষ্টি অর্জন করেন।

যাকাত মজুতদারী বন্ধু করারও এক প্রধান ও বলিষ্ঠ উপায়। মজুতকৃত সম্পদের উপরই যাকাত হিসেব করা হয়ে থাকে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ এবং মজুত সম্পদ যে কোন অর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। অবৈধভাবে অর্থ মজুত করার ফলে নানারকম সামাজিক সমস্যা দেখা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশৃংখলা এর প্রকৃষ্ট নজীর। অল্প কিছু লোকের হাতে বিপুল অবৈধ ও কালো টাকা জমেছিল। সরকারের এমন কোন কৌশল বা পদ্ধতি ছিল না যার দ্বারা এই অবৈধ অর্থের সঠিক পরিমাণ জানা সম্ভব ছিল। ফলে এসবের উপর কোন প্রকার কর বসানো যায়নি। পরিণামে সৃষ্টি হয়েছে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফ্রীতি ও সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যের।

কোন পদ্ধতিই সার্থকভাবে উপরোক্ত সমস্যার মুকাবিলা করতে সক্ষম নয়। একমাত্র ইসলামেই তার সমাধান রয়েছে। কারণ বিত্তবানের জন্যে তাদের মজুতকৃত অর্থ বা সম্পদের একটা অংশ নিছক বিলিয়ে দেবার মতো কোন পার্থিব কারণ নেই। কিন্তু একজন মুসলমানের আল্লাহ ও আখিরাতের ভয় রয়েছে। উপরন্ত ইসলামী রাষ্ট্রে আল-কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রবর্তিত আইনে সরকারের হাতে প্রভূত ক্ষমতাও রয়েছে মজুত সম্পদকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে ব্যয়, বিতরণ বা সরকারের কাছে সমর্পণে বাধ্য করতে। এর ফলে বিত্তবানদের সামনে দুটি মাত্র পথ খোলা থাকবে-

১। শিল্প বা ব্যবসায়ে অর্থ বিনিয়োগ করা, অথবা

২। ইসলামী অনুশাসন অনুযায়ী তা ব্যয় করা।