hadith book logo

চিন্তা ও কর্মে বাস্তবতার অনুশীলন

লেখকঃ সানাউল্লাহ বিন নজির আহমদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২

চিন্তা ও কর্মে বাস্তবতার অনুশীলন

আলোচনার শুরুতে ‘বাস্তবতা’ অভিধার মর্ম উদ্ঘাটন আবশ্যক বলে মনে করি। কারণ, কিছু পরিভাষা রয়েছে যার বিপরীতমুখী অনেক অর্থ বিদ্যমান। কিছু মানুষ নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অর্থ প্রয়োগ করে থাকে। যেমন, কোনো ইসলামি লেখক যদি বলে, ‘ইসলাম বাস্তবতার ধর্ম’ এর দ্বারা তার উদ্দেশ্য, ইসলাম মানুষের স্বভাবের ধর্ম এবং তার প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যশীল একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। পার্থিব জগতের সকল ক্ষেত্রে ও সকল বিষয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে মানব জাতিকে ভারসাম্যপূর্ণ ও উত্তম পন্থায় পরিচালনাকারী একমাত্র ধর্ম ইসলাম। কারো কারো নিকট বাস্তবতার অনুবর্তনের অর্থ চিন্তা ও আচরণের সমকালীন ধারা মেনে নেয়া এবং তাতেই সন্তুষ্ট থাকা, হোক না তা গ্রহণযোগ্য কিংবা পরিত্যাজ্য। অথবা পরস্পরের মাঝে অর্ধার্ধি সমঝোতা বা আদর্শ থেকে পিছু হটার নামই হচ্ছে বাস্তবতা। মূলত তারা নিজ দুর্বলতা ও অক্ষমতার বৈধতা দেয়ার জন্যই বাস্তবতার এ সংজ্ঞা পেশ করে। তারা অহর্নিশ বলে বেড়ায়, ‘আমাদের বাস্তবধর্মী হওয়া একান্ত প্রয়োজন’ যার অর্থ তুচ্ছ ও সামান্যে তুষ্ট থাকা।

বস্ত্তত এ হচ্ছে ওই সব লোকের বাস্তবতা, যাদের ব্যাপারে কোরআনুল করিমে এরশাদ হয়েছে : ‘‘এবং তারা বলল, ‘তোমরা গরমের মধ্যে বের হয়ো না’।’’ [আত্-তাওবা : ৮১] অথবা এটা সে সব লোকের বাস্তবতা, যারা কোরআনের আয়াত- ‘‘তোমরা নিজ হাতে নিজদেরকে ধ্বংসে নিক্ষেপ করো না’’ [আল-বাকারা : ১৯৫]- এর মনগড়া ব্যাখ্যা করে। বর্তমান সময়ে কিছু ইসলামি দল বা মুসলিম রাষ্ট্র অন্য দল বা রাষ্ট্রের সঙ্গে বাস্তবতার দোহাই দিয়ে যেসব চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে এবং যে ধরনের বশ্যতা মেনে নিচ্ছে, তা বাস্তবতার ভুল ব্যাখ্যার ফলেই সম্ভব হয়েছে। আমাদের আলোচ্য বিষয় তা নয়। আমাদের আলোচ্য বিষয় হচ্ছে ‘চিন্তা প্রসূত কাল্পনিক নকশার সামনে অবনত মস্তক না হওয়া। বা এমন কোন পরিকল্পনার জন্য জেদ না ধরা, যা বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব কিংবা খুব কঠিন।’ যদিও তা বাস্তবতার নিরিখে সঠিক বলে বিবেচিত হয়। তার কারণ, আমাদের চারপাশের পরিবেশ। এ পরিবেশ আমাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সামান্য সহযোগিতা করবে না। আরেকটি কারণ, আমাদের শিক্ষা-দীক্ষা ও উপায়-উপকরণ সীমিত, রয়েছে লোকবলের অভাব। তাই আমরা আমাদের উদ্দেশ্য বা উদ্দেশ্যের কাছাকাছি বিষয় বস্ত্ত নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি। আর শক্তি ও সামর্থ্য অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে আরো পরিপূর্ণ ও উত্তম বস্ত্তর জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখি। যারা দিবাস্বপ্নে মোহগ্রস্ত, যারা ঐতিহাসিক বিরোধগুলো বারবার চর্চা করে, যারা তথাকথিত বাস্তবতা ও আধুনিকতার রক্ষক ও ধ্বজাধারী, আমরা তাদের সামনে নত হব না, মেনে নিব না কখনো তাদের বশ্যতা।

ইমাম যাহাবী রহ. ‘খোলাফায়ে রাশেদিনের গুণাবলি বিশিষ্ট শাসকের প্রসঙ্গ’ অধ্যায়ে এ বিষয়ের ওপর একটি সুন্দর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘বর্তমান যুগে এমন একজন ইমাম প্রায় অসম্ভব, যিনি সর্ব ক্ষেত্রে ও সব বিষয়ে সঠিক পথে পরিচালিত হবেন। আল্লাহ যদি এ জাতির জন্য এমন একজন ইমামের ব্যবস্থা করে দেন, যার মধ্যে অনেক ভালো দিক থাকবে এবং সামান্য খারাপ দিকও থাকবে, সে-ই এ জাতির জন্য যোগ্য ইমাম, তার চেয়ে যোগ্য ইমাম আমাদের জন্য আর কে হবে?!’’

এ বাক্যের মাধ্যমে তিনি প্রকৃত বাস্তবতা মেনে নেয়ার একটি সুন্দর উদাহরণ পেশ করেছেন। তিনি এমন একজন ইমামের প্রত্যাশা করেছেন, যার মধ্যে খারাপও থাকবে, তবে কম। তিনি এ কথা বলেননি, ‘ইমামকে খোলাফায়ে রাশেদিনের মতই হতে হবে।’ আবার এ কথাও বলেননি যে, ‘আমরা এমন ইমাম কামনা করি না, যার মধ্যে খারাপের কোন অংশ থাকবে।’ তিনি ছিলেন সত্যিকারার্থে বাস্তব-দ্রষ্টা, সময়ের চাক্ষুষ সাক্ষী, পরিবেশের ওপর গভীর দৃষ্টি প্রদানকারী ও অতীত ইতিহাস সম্পর্কে বিজ্ঞ ব্যক্তি।