hadith book logo

চিন্তা ও কর্মে বাস্তবতার অনুশীলন

লেখকঃ সানাউল্লাহ বিন নজির আহমদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত

ওমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহ. খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করে প্রথম খুতবায় বলেছিলেন, ‘‘জেনে রাখ! আমি এমন কিছু কাজ সম্পাদন করি, যার ওপর আল্লাহ ব্যতীত অন্য কেউ সাহায্য করতে পারে না। যা করতে করতে বৃদ্ধরা শেষ হয়ে গেছে, বাচ্চারা বার্ধক্যে পৌঁছেছে। তারা সবাই একে দীন মনে করেছে, অন্য কিছু মনে করেনি।’’ একদা ছেলে আব্দুল মালেক তাকে বলল, ‘‘হে আমীরুল মোমেনীন! আপনি আল্লাহর কিতাব এবং তার নবির সুন্নত বাস্তবায়ন করুন। এ কারণে যদি আপনাকে-আমাকে তেলের কড়াইতে ভাজাও হয় তাতে পরওয়া কীসের?! তিনি উত্তর দিলেন, ‘‘উটকে পোষ মানানোর ন্যায় আমি মানুষদের আস্তে আস্তে পোষ মানাতে চেষ্টা চালাচ্ছি। সুন্নতের একটি দরজা উন্মুক্ত করলে, লোভেরও একটি দরজা উন্মুক্ত করি। ফলে, তারা সুন্নত থেকে পলায়ন করতে চাইলে, লোভের আকর্ষণে ঠাঁই দাঁড়াবে। আমি যদি তাদেরকে পঞ্চাশ বছর তরবিয়ত করি, তবুও আমার ধারণা, আমি তাদের দ্বারা যা ইচ্ছে তা বাস্তবায়ন করাতে পরব না।’’ [আল-মারওজি, আস্সুন্নাহ, পৃ : ২৬] ইমাম শাতেবীর ‘মোয়াফাকাত’ গ্রন্থে কথাটি এভাবে আছে, ‘‘আমার আশঙ্কা, আমি যদি মানুষের ওপর হকের দন্ড এক সাথে রেখে দেই, তবে তারা এক সাথে সব প্রত্যাখ্যান করবে, তখন এ ফিতনার কারণ কে হবে?’’ [শাতেবী, মোয়াফাকাত : ২/৯৩]

খলিফা আব্দুল আজিজ রহ. হিজরির প্রথম শতাব্দীর শেষ দিকে খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার কঠিন বাস্তবতা চরমভাবে উপলব্ধি করেছেন। তাই তিনি ‘ধীরে কর’ নীতি গ্রহণ করেন। বর্তমান যুগের বিজ্ঞজনেরা যেমন বলে থাকেন। তিনি এক সময় মানুষের সামনে সুমিষ্ট লোভনীয় বস্ত্ত পেশ করেন, অন্য সময় তিক্ত সত্যকে মেনে নিতে বাধ্য করেন।

সালাউদ্দিন আইয়ূবী রহ. যখন ফাতেমী সাম্রাজ্য রহিত করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেন, তখন তিনি হঠাৎ করেই মিশরবাসীদের কাছে এ ঘোষণা দেননি। তিনি ছিলেন সে সময় মিশরের মন্ত্রী এবং নুরুদ্দিন মাহমুদের প্রেরিত সৈন্যবাহিনীর সেনা প্রধান। তিনিও ‘ধীরে চল’ নীতি গ্রহণ করেন। প্রথমে চার মাজহাবের আদর্শে বিশ্বাসী সুন্নি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। হিজরি ৫৬৬ সনে একটি পরিত্যক্ত জেলখানায় শাফেয়ি মাজহাবের মতাদর্শের একটি মাদরাসার ভিত্তি রাখেন। এরপর ফাতেমীদের জারিকৃত আজানের মধ্যে অতিরিক্ত বাক্য ( حي على خير العمل ) রহিত করেন। অতপর খুতবার মধ্যে খোলাফায়ে রাশেদিনের নাম উল্লেখ করার নির্দেশ জারি করেন। এক পর্যায়ে ফাতেমীদের খুতবা বাতিল ঘোষণা করেন। এ পরিকল্পনার জন্য তাকে সহযোগিতা করেছে তার মন্ত্রী ও পরামর্শদাতা কাজী ফাজেল। সে ছিল মিশরের অধিবাসী এবং সরকারী ও দাফতরিক কাজে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত।

একদা আলী রা. খলিফা ওমর রা. কে দেখেন, তিনি জাকাত খাতে উশুলকৃত সরকারী উটগুলোর চিকিৎসা নিজ হাতে প্রদান করছেন। তিনি উটগুলোর চর্মরোগের চিকিৎসা দিচ্ছিলেন। তাও ছিল গ্রীষ্মের কোন এক উত্তপ্ত দিনে। আলী রা. ওমরের শক্তি ও আমানতদারি দেখে আশ্চর্যান্বিত হলেন। অতপর তিনি বলেন, ‘‘আপনার পরবর্তী খলিফাদের আপনি অক্ষম করে দিয়েছেন!’’ এটা একটা বাস্তব ঘটনা, যার প্রেক্ষিতে মানুষ বলাবলি করত : অমুক ব্যক্তি কেন ওমরের মত হয়নি? অমুক ব্যক্তি কেন ওমরের মত কর্ম সম্পাদন করে না? অসম্ভব! এমনটি আর কখনো বাস্তবতার মুখ দেখবে না। ওমর ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত, যার ব্যাপারে রাসূল সা. বলেছেন, ‘‘আমি ওমরের ন্যায় এমন বিচক্ষণ ব্যক্তি দেখিনি, যে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে নিখুঁতভাবে পৌঁছতে পারে।’’ তবে এর অর্থ এ নয় যে, আমরা বসে থাকব কিংবা এর চেয়ে উত্তম বস্ত্তর জন্য চেষ্টা করব না। বরং উত্তরোত্তর উন্নতির জন্য সর্বদা চেষ্টা তদবির অব্যাহত রাখাই হবে বাস্তবতার দাবি।