hadith book logo

শরঈ পর্দা বলতে কী বুঝায়

লেখকঃ আলী হাসান তৈয়ব • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

পূর্ণ পর্দার শর্তগুলো নিম্নরূপ :

প্রথম শর্ত : অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত মতে পুরো শরীর ঢাকা। ফিতনার আশংকা থাকলে সর্বসম্মতিক্রমে মুখ ও হাতের তালুদ্বয় ঢাকাও পর্দার অন্তর্ভুক্ত।

দ্বিতীয় শর্ত : হিজাব নিজেই সৌন্দর্যবর্ধক না হওয়া। যেমন এতটা আকর্ষণীয় রঙের হওয়া যা সবার দৃষ্টি কাড়ে। আল্লাহ বলেন,

﴿ وَقُل لِّلۡمُؤۡمِنَٰتِ يَغۡضُضۡنَ مِنۡ أَبۡصَٰرِهِنَّ وَيَحۡفَظۡنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبۡدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنۡهَاۖ ﴾ [ النور : ٣١ ]

‘আর মুমিন নারীদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না ...। {সূরা আন-নূর, আয়াত : ৩১}

অতএব পর্দা যখন খোদ নিজেই সৌন্দর্যের আকার ধারণ করবে তা প্রকাশ বৈধ হবে না। তাকে হিজাব বা পর্দাও বলা হবে না। কারণ, হিজাব তো সেটিই যা বেগানা পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করে। সুতরাং বোরকা পরেও যারা নিজের সৌন্দর্য প্রকাশে অস্থির তারা যেন বিষয়টি ভেবে দেখেন। সত্যিকারার্থে শরঈ পর্দা রক্ষায় সংকল্পবদ্ধ হয়ে তারা যেন সৌন্দর্য আড়ালকারী রঙকে অগ্রাধিকার দেন। বলাবাহুল্য সেটি হলো কালো রঙ। পাশাপাশি তারা যেন কারুকাজ ও জাঁকজমককেও এড়িয়ে যান।

তৃতীয় শর্ত : মোটা ও পুরু হওয়া যাতে সৌন্দর্য দৃশ্যমান না হয়। কারণ হিজাবের উদ্দেশ্য নারীর মুগ্ধ করা সৌন্দর্য পরপুরুষের আড়াল করা। অতএব পোশাক যদি আড়ালকারী না হয় তবে তাকে হিজাব আখ্যায়িত করা যায় না। কেননা আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا، قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ، وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ مَائِلَاتٌ، رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ، وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا»

‘জাহান্নামবাসী দুটি দল রয়েছে। যাদেরকে আমি এখনো দেখিনি। একদল এমন লোক যাদের হাতে গরুর লেজের মত লাঠি থাকবে যা দিয়ে তারা লোকদেরকে প্রহার করবে। আর অন্য দল এমন নারী যারা পোশাক পরেও উলঙ্গ থাকে। তারা অন্যদের তাদের প্রতি আকৃষ্ট করবে নিজেরাও অন্যদের প্রতি ঝুঁকবে। তাদের মস্তক উটের পিঠের কুঁজের মত হবে। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এমনকি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ এর ঘ্রাণ এত এত দূর থেকেও পাওয়া যায়।’ [মুসলিম : ২১২৮]

চতুর্থ : প্রশস্ত ও ঢিলেঢালা হওয়া এবং সংকুচিত ও অন্তর্শোভা পরিদৃশ্যকারী না হওয়া। যাতে অঙ্গের আকার বা অবয়ব দৃশ্যমান না হয় এবং দেহের প্রলুব্ধকর অঙ্গ প্রস্ফুটিত না করে। এটিও পূর্বে বর্ণিত হাদীসের নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত।

পঞ্চম শর্ত : কাপড় সুগন্ধিযুক্ত না হওয়া। কারণ এতে করে তা পুরুষকে আরও বেশি প্রলুব্ধ করে। নারীর আতর ব্যবহারকে ব্যভিচারের পর্যায়ে গণ্য করা হয়েছে। আবূ মূসা আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«كُلُّ عَيْنٍ زَانِيَةٌ، وَالمَرْأَةُ إِذَا اسْتَعْطَرَتْ فَمَرَّتْ بِالمَجْلِسِ فَهِيَ كَذَا وَكَذَا» يَعْنِي زَانِيَةً «هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ صَحِيحٌ»

‘প্রতিটি চোখই ব্যভিচারী। আর নারী যখন সুগন্ধি ব্যবহার করে জনসমাগমের পাশ দিয়ে অতিক্রম তখন সে এটা সেটা অর্থাৎ ব্যভিচারী হয়।’ (কারণ সুগন্ধি পুরুষকে আকর্ষণ করে তার মধ্যে কামাগ্নি জ্বালিয়ে দেয়। আর শেষাবধি এটিই তাকে ব্যভিচারের দিকে নিয়ে যায়।) [তিরমিযী : ২৭৮৬]

ষষ্ঠ শর্ত : পুরুষের পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ না হওয়া। আবূ হুরায়রা রাদিয়াআল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

«لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ، وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ»

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেসব পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন যারা নারীদের পোশাক পরে এবং সেসব নারীকে অভিসম্পাত করেছেন যারা পুরুষের পোশাক পরিধান করে। [আবূ দাঊদ : ৪০৯৮]

আরেক হাদীসে এসেছে, ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُتَرَجِّلاتِ مِنَ النِّسَاءِ، وَالْمُخَنَّثِينَ مِنَ الرِّجَالَ

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষদের বেশধারী নারীদের এবং নারীদের বেশধারী পুরুষদের অভিসম্পাত করেছেন। [মুসনাদ আহমাদ : ২০০৬]

সপ্তম শর্ত : কোনো আহলে কিতাব তথা ইহুদী-খ্রিস্টান বা বিধর্মীর পোশাকের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ না হওয়া। কেননা ইসলামী শরীয়ত কাফেরদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে নিষেধ করেছে। পোশাক ও সংস্কৃতিতে তাদের থেকে ভিন্নতা অবলম্বনে উদ্বুদ্ধ করেছে। কেননা আবদুল্লাহ ইবন আমর বিন ‘আস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

رَأَى رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَلَىَّ ثَوْبَيْنِ مُعَصْفَرَيْنِ فَقَالَ « إِنَّ هَذِهِ مِنْ ثِيَابِ الْكُفَّارِ فَلاَ تَلْبَسْهَا » .

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার গায়ে জাফরান ব্যবহৃত একজোড়া কাপড় দেখে বললেন, ‘এসব হলো কাফেরদের পোশাক। তাই তুমি তা পরিধান করো না।’ [মুসলিম : ৫৫৫৫]

অষ্টম : প্রসিদ্ধি লাভের পোশাক না হওয়া। আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شُهْرَةٍ فِي الدُّنْيَا ، أَلْبَسَهُ اللَّهُ ثَوْبَ مَذَلَّةٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، ثُمَّ أَلْهَبَ فِيهِ نَارًا .

‘যে ব্যক্তি দুনিয়ায় প্রসিদ্ধি লাভের পোশাক পরবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরাবেন। অতপর সে কাপড়ে তাকে প্রজ্বলিত করবেন।’ [ইবন মাজা : ৩৬০৭]

প্রসিদ্ধি লাভের পোশাক সেটিই যা পরিধানের উদ্দেশ্য থাকে মানুষের নাম কুড়ানো। যেমন অহংকারের সঙ্গে রূপের বাহার দেখিয়ে খুব দামী বস্ত্র পরিধান করা। এই শর্তটি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।