১
ঈমানের প্রকৃত স্বাদ
লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২
ঈমানের প্রকৃত স্বাদ বলতে আমরা কি বুঝি?
ঈমান একটি মহা মূল্যবান বস্তু। দুনিয়ার সব কিছুর চাইতে ঈমানের মূল্য অনেক বেশি। একজন প্রকৃত মুমিন সে তার জীবনের সব কিছুকে ত্যাগ করতে রাজি, কিন্তু ঈমান থেকে এক চুল পরিমাণও বিচ্যুত হতে সে রাজি নয়। একজন মুমিনের নিকট ঈমানই সবচেয়ে বড় ও মহা মূল্যবান সম্পদ। এছাড়া দুনিয়ার সব কিছুই তার নিকট তুচ্ছ ও মূল্যহীন। সমগ্র দুনিয়ার ধন-সম্পদ, রাজত্ব, ভোগ সামগ্রী তার ঈমানের সামনে একেবারেই নগণ্য। ঈমানের মূল বিষয় হল, আল্লাহর উপর অবিচল, অটুট ও দৃঢ় বিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রেরিত রাসূল ও তার দেওয়া দীনের আনুগত্য করা। ঈমানের শিকড় খুবই মজবুত এবং দৃঢ়। ঈমানের পরিধি অনেক ব্যাপক ও বিস্তৃত। ঈমানের শাখা প্রশাখা অন্তহীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ أَلَمۡ تَرَ كَيۡفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلٗا كَلِمَةٗ طَيِّبَةٗ كَشَجَرَةٖ طَيِّبَةٍ أَصۡلُهَا ثَابِتٞ وَفَرۡعُهَا فِي ٱلسَّمَآءِ ٢٤ تُؤۡتِيٓ أُكُلَهَا كُلَّ حِينِۢ بِإِذۡنِ رَبِّهَاۗ وَيَضۡرِبُ ٱللَّهُ ٱلۡأَمۡثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ يَتَذَكَّرُونَ ٢٥ ﴾ [ ابراهيم : ٢٤، ٢٥ ]
“তুমি কি দেখ না, আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? কালিমা তাইয়েবা, যা একটি ভাল বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল সুস্থির আর শাখা-প্রশাখা আকাশে। সেটি তার রবের অনুমতিতে সব সময় ফল দান করে; আর আল্লাহ মানুষের জন্য নানা দৃষ্টান্ত প্রদান করেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে”। [সূরা ইব্রাহীম, আয়াত: ২৪,২৫]
ঈমান গ্রহণকারী একজন কৃতদাসও আল্লাহর নিকট সমগ্র পৃথিবী বিখ্যাত কোনো রাজা মহারাজা বা অনেক বেশি সম্পদের মালিকের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। যে ঈমানই একজন কাফির জাহান্নামীকে জান্নাতের অন্তর্ভুক্ত করবে। একজন ব্যক্তির চূড়ান্ত সফলতা ও বিফলতার ফয়সালা প্রকৃতপক্ষে ঈমানের ওপর হয়। নবীদের দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল ঈমান। আল্লাহ তা‘আলার নিকট থেকে তাঁর সকল অহি ও কিতাবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঈমান। এ ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত না হলে ব্যক্তির নেক আমলের কোনও মূল্য বহন করে না। এ ঈমানই ব্যক্তিকে আল্লাহ তালার প্রিয়জন বানায়। তার জীবনের নিরাপত্তা সম্মান আল্লাহর জিম্মায় থাকে। পৃথিবীর সমস্ত শয়তানি শক্তি ঈমানের শত্রু। মুমিনের কারণে পৃথিবীর ইতিহাসে শতশত ঐতিহাসিক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। কুরআন সাক্ষ্য দিয়ে বলছে তাদের ওপর অত্যাচার ও জুলুমের কারণ ঈমান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এমন একটি ইতিহাসের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَٱلسَّمَآءِ ذَاتِ ٱلۡبُرُوجِ ١ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡمَوۡعُودِ ٢ وَشَاهِدٖ وَمَشۡهُودٖ ٣ قُتِلَ أَصۡحَٰبُ ٱلۡأُخۡدُودِ ٤ ٱلنَّارِ ذَاتِ ٱلۡوَقُودِ ٥ إِذۡ هُمۡ عَلَيۡهَا قُعُودٞ ٦ وَهُمۡ عَلَىٰ مَا يَفۡعَلُونَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ شُهُودٞ ٧ وَمَا نَقَمُواْ مِنۡهُمۡ إِلَّآ أَن يُؤۡمِنُواْ بِٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡحَمِيدِ ٨ ﴾ [ البروج : ١، ٨ ]
“শপথ দুর্গময় আকাশমণ্ডলীর। সে কঠিন দিনের, যে দিবসের ওয়াদা করা হয়েছে। শপথ তাদের যারা কিয়ামতকে অবলোকন করবে আর তার শপথ সে কঠিন দিবসে যা কিছু দেখানো হবে। ধ্বংস তাদের জন্য যারা বিশ্বাসীদেরকে আগুনে পুড়ে মারার জন্য গর্ত খনন করছিল তাতে প্রজ্বলিত করল দাউ দাউ অনল। মুমিনদের নিক্ষেপ করা হচ্ছিল সে প্রজ্বলিত অনল কুণ্ডে আর তারা সে গর্তের মুখে তামাশা দেখছিল। ঈমানদারদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণের একটিই কারণ, তারা তো মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলা যিনি স-প্রশংসিত সে মহান প্রভুর ওপর বিশ্বাস ছাড়া আর কোনও অপরাধ করেনি [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১-৪]।”
উপরের আয়াতগুলোতে ঈমানের কারণে নির্যাতনের একটি জীবন্ত চিত্র আল্লাহর অহিতে অঙ্কিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম বিভিন্ন সূরায় অনুরূপ চিত্র আরও মর্মস্পর্শী ভাবেও এঁকেছেন। এগুলো কোনও সাহিত্যিকের কল্পনার বুনুনকর্ম নয়। এগুলো মহাকালে ঘটে যাওয়া মহাসত্যের মহা দলিল। এ আয়াতগুলো সু-স্পষ্ট যে, হাজারো জুলুম নির্যাতন অন্যায় অত্যাচার একজন মুমিনকে তার ঈমান থেকে দূরে সরাতে পারেনি। তাদের নিকট ঈমানের স্বাদ ও মজা এত বেশি ছিল যে, তারা আগুনে পুড়ে মারা যাওয়াকে ঈমান থেকে বিচ্যুত হওয়ার তুলনায় অধিক প্রিয় মনে করত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদিসে বলেছেন,
عَنْ خَبَّابٍ قَالَ : شَكَوْنَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُتَوَسِّدٌ بُرْدَةً فِي ظِلِّ الْكَعْبَةِ فَقُلْنَا : أَلَا تَسْتَنْصِرُ لَنَا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ ـ أَوْ أَلَا يَعْنِي : تَسْتَنْصِرُ لَنَا ـ؟ فَقَالَ : «قَدْ كَانَ الرَّجُلُ فِيمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ يُؤْخَذُ فَيُحْفَرُ لَهُ فِي الْأَرْضِ فَيُجَاءُ بِالْمِنْشَارِ فَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُجْعَلُ بِنِصْفَيْنِ فَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ، وَيُمْشَطُ بِأَمْشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُونَ عَظْمِهِ مِنْ لَحْمٍ أَوْ عَصَبٍ فَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ، وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ اللَّهُ هَذَا الْأَمْرَ حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنَ الْمَدِينَةِ إِلَى حَضْرَمَوْتَ لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ، وَالذِّئْبَ عَلَى غَنَمِهِ وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ»
“খাব্বাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কাবার ছায়া তলে একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে ছিল। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আমাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করবেন না? অত:পর তিনি বললেন, তোমাদের পূর্বেকার লোকদের ইতিহাস হল, তাদেরকে ধরে আনা হত এবং জমিনে তার জন্য গর্ত খনন করে, তাতে তাকে নিক্ষেপ করার পর তার মাথার উপর করাত বসিয়ে তাকে দ্বিখণ্ডিত করা হত। এহেন নির্যাতনও তাকে তার দ্বীন থেকে ফেরাতে পারত না। লোহার চিরুনি দিতে তার চামড়া আঁচড়ানো হত, তার দেহে হাড় চাড়া আর কোনো গোস্ত অবশিষ্ট থাকত না, এত নির্যাতনও তাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে বিন্দু পরিমাণও বিচ্যুতি ঘটাতে পারত না। আল্লাহর শপথ, অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা এ দীনকে পরিপূর্ণ করবে। এমনকি একজন মুসাফির মদিনা থেকে হাদরা-মওত পর্যন্ত নিরাপদে ভ্রমণ করবে, সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে এবং বকরীর জন্য নেকড়ে ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছ”। [বুখারি, হাদিস: ৩৬১২, ৬৯৪৩; নাসায়ী, হাদিস: ২০৪/৮; ইবনু হিব্বান, হাদিস: ৬৬৯৮; তাবরানী, হাদিস: ৩৬৩৮]
আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হচ্ছে এত নির্যাতন, এত নিষ্ঠুরতা, এত লোমহর্ষক বর্বরতা সহ্য করে ঈমানের ওপর অটল ও দৃঢ় কদমে দাঁড়িয়ে থাকতে কিসে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল? শরীরের এক একটি অংশ বিচ্ছেদ করার পর, হাড্ডি থেকে গোশতকে লোহার চিরুনি দিয়ে তুলে নেয়ার পরও তাদের কলিজা থেকে ঈমানকে পৃথক করা যায়নি। এটি সহজ বিষয় নয়। জ্বলন্ত কয়লার ওপর জীবন্ত বেলালকে শুইয়ে পাথর চাপা দেওয়া হয়েছে শরীরের চর্বি গলে গলে কয়লা দেহে ঢুকে পড়েছে, রক্ত ও চর্বিতে আগুন নিভে গিয়েছে। সে মর্মান্তিক মুহূর্তেও বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু ঈমান থেকে এক তিল পরিমাণ দূরে সরেননি। অচেতন অবস্থায় তিনি অস্পষ্ট স্বরে বলছিলেন, ‘আহাদুন আহাদুন’। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা সাহাবীদের ও পরবর্তীদের জীবনে রয়েছে ও গ্রন্থাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু সে মজলুম মুসলিমরা ঈমানের মধ্যে কী রহস্যজনক এক মজা খুঁজে পেয়েছিলেন। পার্থিব কোনও আনন্দ বা অসহ্য কোনো যাতনা তাদেরকে ঈমানের স্বাদ আস্বাদনে এক মুহূর্তের জন্য বিরত রাখতে পারে নি। কি ছিল তাদের জীবনে এমন অর্জন যা তাদেরকে ঈমান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মুখে কতগুলো বুলি আর ঈমানের কথাসমূহ উচ্চারণের নাম প্রকৃত ঈমান নয়। আমাদেরকে সে লোকদের মত ঈমান আনতে হবে যাদের মাথার ওপর করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করার পরও ঈমান অখণ্ড ছিল। এক চুল পরিমাণ বিশ্বাস টলেনি যাদের। কারা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরও ঈমানের উপর অটুট অবিচল থাকবে। এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুটি হাদিস নিয়ে আমরা আলোচনা করব।
﴿ أَلَمۡ تَرَ كَيۡفَ ضَرَبَ ٱللَّهُ مَثَلٗا كَلِمَةٗ طَيِّبَةٗ كَشَجَرَةٖ طَيِّبَةٍ أَصۡلُهَا ثَابِتٞ وَفَرۡعُهَا فِي ٱلسَّمَآءِ ٢٤ تُؤۡتِيٓ أُكُلَهَا كُلَّ حِينِۢ بِإِذۡنِ رَبِّهَاۗ وَيَضۡرِبُ ٱللَّهُ ٱلۡأَمۡثَالَ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمۡ يَتَذَكَّرُونَ ٢٥ ﴾ [ ابراهيم : ٢٤، ٢٥ ]
“তুমি কি দেখ না, আল্লাহ কীভাবে উপমা পেশ করেছেন? কালিমা তাইয়েবা, যা একটি ভাল বৃক্ষের ন্যায়, যার মূল সুস্থির আর শাখা-প্রশাখা আকাশে। সেটি তার রবের অনুমতিতে সব সময় ফল দান করে; আর আল্লাহ মানুষের জন্য নানা দৃষ্টান্ত প্রদান করেন, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে”। [সূরা ইব্রাহীম, আয়াত: ২৪,২৫]
ঈমান গ্রহণকারী একজন কৃতদাসও আল্লাহর নিকট সমগ্র পৃথিবী বিখ্যাত কোনো রাজা মহারাজা বা অনেক বেশি সম্পদের মালিকের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। যে ঈমানই একজন কাফির জাহান্নামীকে জান্নাতের অন্তর্ভুক্ত করবে। একজন ব্যক্তির চূড়ান্ত সফলতা ও বিফলতার ফয়সালা প্রকৃতপক্ষে ঈমানের ওপর হয়। নবীদের দাওয়াতের মূল বিষয় ছিল ঈমান। আল্লাহ তা‘আলার নিকট থেকে তাঁর সকল অহি ও কিতাবের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় ঈমান। এ ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত না হলে ব্যক্তির নেক আমলের কোনও মূল্য বহন করে না। এ ঈমানই ব্যক্তিকে আল্লাহ তালার প্রিয়জন বানায়। তার জীবনের নিরাপত্তা সম্মান আল্লাহর জিম্মায় থাকে। পৃথিবীর সমস্ত শয়তানি শক্তি ঈমানের শত্রু। মুমিনের কারণে পৃথিবীর ইতিহাসে শতশত ঐতিহাসিক ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। কুরআন সাক্ষ্য দিয়ে বলছে তাদের ওপর অত্যাচার ও জুলুমের কারণ ঈমান ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এমন একটি ইতিহাসের প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَٱلسَّمَآءِ ذَاتِ ٱلۡبُرُوجِ ١ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡمَوۡعُودِ ٢ وَشَاهِدٖ وَمَشۡهُودٖ ٣ قُتِلَ أَصۡحَٰبُ ٱلۡأُخۡدُودِ ٤ ٱلنَّارِ ذَاتِ ٱلۡوَقُودِ ٥ إِذۡ هُمۡ عَلَيۡهَا قُعُودٞ ٦ وَهُمۡ عَلَىٰ مَا يَفۡعَلُونَ بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ شُهُودٞ ٧ وَمَا نَقَمُواْ مِنۡهُمۡ إِلَّآ أَن يُؤۡمِنُواْ بِٱللَّهِ ٱلۡعَزِيزِ ٱلۡحَمِيدِ ٨ ﴾ [ البروج : ١، ٨ ]
“শপথ দুর্গময় আকাশমণ্ডলীর। সে কঠিন দিনের, যে দিবসের ওয়াদা করা হয়েছে। শপথ তাদের যারা কিয়ামতকে অবলোকন করবে আর তার শপথ সে কঠিন দিবসে যা কিছু দেখানো হবে। ধ্বংস তাদের জন্য যারা বিশ্বাসীদেরকে আগুনে পুড়ে মারার জন্য গর্ত খনন করছিল তাতে প্রজ্বলিত করল দাউ দাউ অনল। মুমিনদের নিক্ষেপ করা হচ্ছিল সে প্রজ্বলিত অনল কুণ্ডে আর তারা সে গর্তের মুখে তামাশা দেখছিল। ঈমানদারদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণের একটিই কারণ, তারা তো মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলা যিনি স-প্রশংসিত সে মহান প্রভুর ওপর বিশ্বাস ছাড়া আর কোনও অপরাধ করেনি [সূরা আল-বুরূজ, আয়াত: ১-৪]।”
উপরের আয়াতগুলোতে ঈমানের কারণে নির্যাতনের একটি জীবন্ত চিত্র আল্লাহর অহিতে অঙ্কিত হয়েছে। কুরআনুল কারিম বিভিন্ন সূরায় অনুরূপ চিত্র আরও মর্মস্পর্শী ভাবেও এঁকেছেন। এগুলো কোনও সাহিত্যিকের কল্পনার বুনুনকর্ম নয়। এগুলো মহাকালে ঘটে যাওয়া মহাসত্যের মহা দলিল। এ আয়াতগুলো সু-স্পষ্ট যে, হাজারো জুলুম নির্যাতন অন্যায় অত্যাচার একজন মুমিনকে তার ঈমান থেকে দূরে সরাতে পারেনি। তাদের নিকট ঈমানের স্বাদ ও মজা এত বেশি ছিল যে, তারা আগুনে পুড়ে মারা যাওয়াকে ঈমান থেকে বিচ্যুত হওয়ার তুলনায় অধিক প্রিয় মনে করত। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদিসে বলেছেন,
عَنْ خَبَّابٍ قَالَ : شَكَوْنَا إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ مُتَوَسِّدٌ بُرْدَةً فِي ظِلِّ الْكَعْبَةِ فَقُلْنَا : أَلَا تَسْتَنْصِرُ لَنَا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ ـ أَوْ أَلَا يَعْنِي : تَسْتَنْصِرُ لَنَا ـ؟ فَقَالَ : «قَدْ كَانَ الرَّجُلُ فِيمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ يُؤْخَذُ فَيُحْفَرُ لَهُ فِي الْأَرْضِ فَيُجَاءُ بِالْمِنْشَارِ فَيُوضَعُ عَلَى رَأْسِهِ فَيُجْعَلُ بِنِصْفَيْنِ فَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ، وَيُمْشَطُ بِأَمْشَاطِ الْحَدِيدِ مَا دُونَ عَظْمِهِ مِنْ لَحْمٍ أَوْ عَصَبٍ فَمَا يَصُدُّهُ ذَلِكَ عَنْ دِينِهِ، وَاللَّهِ لَيُتِمَّنَّ اللَّهُ هَذَا الْأَمْرَ حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنَ الْمَدِينَةِ إِلَى حَضْرَمَوْتَ لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ، وَالذِّئْبَ عَلَى غَنَمِهِ وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ»
“খাব্বাব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন কাবার ছায়া তলে একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে শুয়ে ছিল। তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল আমাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করবেন না? অত:পর তিনি বললেন, তোমাদের পূর্বেকার লোকদের ইতিহাস হল, তাদেরকে ধরে আনা হত এবং জমিনে তার জন্য গর্ত খনন করে, তাতে তাকে নিক্ষেপ করার পর তার মাথার উপর করাত বসিয়ে তাকে দ্বিখণ্ডিত করা হত। এহেন নির্যাতনও তাকে তার দ্বীন থেকে ফেরাতে পারত না। লোহার চিরুনি দিতে তার চামড়া আঁচড়ানো হত, তার দেহে হাড় চাড়া আর কোনো গোস্ত অবশিষ্ট থাকত না, এত নির্যাতনও তাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে বিন্দু পরিমাণও বিচ্যুতি ঘটাতে পারত না। আল্লাহর শপথ, অবশ্যই আল্লাহ তা‘আলা এ দীনকে পরিপূর্ণ করবে। এমনকি একজন মুসাফির মদিনা থেকে হাদরা-মওত পর্যন্ত নিরাপদে ভ্রমণ করবে, সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে এবং বকরীর জন্য নেকড়ে ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। কিন্তু তোমরা তাড়াহুড়া করছ”। [বুখারি, হাদিস: ৩৬১২, ৬৯৪৩; নাসায়ী, হাদিস: ২০৪/৮; ইবনু হিব্বান, হাদিস: ৬৬৯৮; তাবরানী, হাদিস: ৩৬৩৮]
আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ কথাটি হচ্ছে এত নির্যাতন, এত নিষ্ঠুরতা, এত লোমহর্ষক বর্বরতা সহ্য করে ঈমানের ওপর অটল ও দৃঢ় কদমে দাঁড়িয়ে থাকতে কিসে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছিল? শরীরের এক একটি অংশ বিচ্ছেদ করার পর, হাড্ডি থেকে গোশতকে লোহার চিরুনি দিয়ে তুলে নেয়ার পরও তাদের কলিজা থেকে ঈমানকে পৃথক করা যায়নি। এটি সহজ বিষয় নয়। জ্বলন্ত কয়লার ওপর জীবন্ত বেলালকে শুইয়ে পাথর চাপা দেওয়া হয়েছে শরীরের চর্বি গলে গলে কয়লা দেহে ঢুকে পড়েছে, রক্ত ও চর্বিতে আগুন নিভে গিয়েছে। সে মর্মান্তিক মুহূর্তেও বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু ঈমান থেকে এক তিল পরিমাণ দূরে সরেননি। অচেতন অবস্থায় তিনি অস্পষ্ট স্বরে বলছিলেন, ‘আহাদুন আহাদুন’। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা সাহাবীদের ও পরবর্তীদের জীবনে রয়েছে ও গ্রন্থাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু সে মজলুম মুসলিমরা ঈমানের মধ্যে কী রহস্যজনক এক মজা খুঁজে পেয়েছিলেন। পার্থিব কোনও আনন্দ বা অসহ্য কোনো যাতনা তাদেরকে ঈমানের স্বাদ আস্বাদনে এক মুহূর্তের জন্য বিরত রাখতে পারে নি। কি ছিল তাদের জীবনে এমন অর্জন যা তাদেরকে ঈমান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। মুখে কতগুলো বুলি আর ঈমানের কথাসমূহ উচ্চারণের নাম প্রকৃত ঈমান নয়। আমাদেরকে সে লোকদের মত ঈমান আনতে হবে যাদের মাথার ওপর করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করার পরও ঈমান অখণ্ড ছিল। এক চুল পরিমাণ বিশ্বাস টলেনি যাদের। কারা আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পরও ঈমানের উপর অটুট অবিচল থাকবে। এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দুটি হাদিস নিয়ে আমরা আলোচনা করব।