hadith book logo

দাঈ ভাইদের প্রতি

লেখকঃ চৌধুরী আবুল কালাম আজাদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

দাওয়াতের পন্থা ও পদ্ধতি :

বর্তমান যুগে আল্লাহ তাআলা দাওয়াতি কাজকে আমাদের জন্য অনেক সহজ করে দিয়েছেন। আমাদের পূর্বেকার লোকদের জন্য এতোটা সহজ ছিল না। আজকের যুগে ইসলাম প্রচার, দাওয়াতি কাজ পরিচালনা ও মানুষের কাছে দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন অনেক দিক দিয়েই সহজ। বিশেষ করে তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে দাওয়াত ও প্রচার কর্ম আরও সহজ হয়ে গিয়েছে। এ কাজে বর্তমানে রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্রসহ নানা মাধ্যমের সাহায্যে অতি সহজে উদ্দেশ্য হাসিল করা যায়।

অতএব, জ্ঞানবান ঈমানদার ব্যক্তিবর্গ ও নায়েবে রাসূলদের ওপর অবশ্য কর্তব্য, সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এ কাজে আত্মনিয়োগ করা, পরস্পর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আল্লাহর বার্তা তাঁর বান্দাদের নিকট পৌঁছে দেয়া। এ মহৎ কাজে জড়িত হলে চারদিক থেকে অসহযোগিতা, বাঁধা ও ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সম্মুখীন হতে হবে। এসব আমলে না নিয়ে নির্ভয়ে সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে হবে।

একজন মুসলমানের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, সার্বিক জীবনে সফলতার জন্য তার কুরআন-হাদিস অনুসরণ করাই যথেষ্ট। দাওয়াতের দিকটিও এর বাইরে নয়। দাওয়াতি ময়দানে সফল হতে হলে কি প্রক্রিয়ায় কাজ করতে হবে, সে সর্ম্পকে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন। রাসূলুল্লাহর হাদিসেও এ বিষয়টি এসেছে সুস্পষ্টভাবে।

আল্লাহ তাআলা খুব স্পষ্ট করে বলেছেন :

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ﴿১২৫﴾ سورة النحل

‘তুমি তোমার রবের পথে আহবান কর হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সাথে বিতর্ক কর সুন্দরতম পন্থায়।’ (নাহল : ১২৫)

দাওয়াত পদ্ধতি কি হবে এবং একজন দাওয়াত কর্মীকে কি কি গুণ অর্জন করতে হবে যা সে দাওয়াতি ময়দানে প্রয়োগ করবে উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন। সে দাওয়াত শুরু করবে হিকমত ও পরিবেশ-পরিস্থিতির বিবেচনায় বিভিন্ন কৌশল গ্রহণের মাধ্যমে। এখানে হিকমত বলতে বুঝানো হয়েছে সুস্পষ্ট দলিল প্রমাণসমূহ যা স্বচ্ছ ও সন্তোষজনক পন্থায় হক প্রতিষ্ঠিত করবে এবং অসার ও বাতুলতাকে খন্ডন করবে।

আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, আল্লাহ তাআলা মানুষের অবস্থা ভেদে দাওয়াতের স্তর বিন্যাস করে তা তিন ভাগে ভাগ করেছেন।

এক. যদি ব্যক্তি হক অন্বেষণকারী ও তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয় এবং হক পেলে সাথে সাথে তা অন্য যে কোনো মতবাদের উপর প্রাধান্য দেয়, তাহলে তাকে শুধু হিকমতের মাধ্যমে দাওয়াত দেয়া হবে। তার জন্য ওয়াজ-নসিহত ও বিতর্কে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

দুই. আর যদি সে হকের বিপরীতে নিমগ্ন থাকে, কিন্তু হক চিনতে পারলে তা গ্রহণ করবে বলে আশা থাকে, তাহলে আশা ও ভয় দেখিয়ে নসিহত করতে হবে।

তিন. অপরদিকে যে ব্যক্তি হকের বিরোধিতা করে এবং এর প্রতি বিদ্বেষ পোষণকারী তাকে উত্তম পন্থায় যুক্তি-প্রমাণ পেশ করে দাওয়াত দিতে হবে। যদি ফিরে আসে তো ভালো। তা না হলে সে ইসলাম বিরোধী বলে গণ্য হবে।

তাই দাঈ ইলাল্লাহ এর দায়িত্ব হচ্ছে, আল্লাহর দিকে আহবানের এ গুরুদায়িত্ব পালনকালে হিকমতের পথ অবলম্বন করা এবং দাওয়াত কর্ম হিকমত দিয়েই শুরু করা, এর প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া। যদি দাওয়াত প্রদত্ত ব্যক্তির মাঝে কোনো সংর্কীণতা বা আপত্তি থাকে তাহলে উত্তম উপদেশের স্মরণাপন্ন হওয়া, উৎসাহ ব্যঞ্জক পবিত্র আয়াত ও হাদিসের উপদেশ দ্বারা দাওয়াত পেশ করা। যদি কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি সন্দিহান হয়, তাহলে উত্তম পন্থায় বিতর্কের রাস্তা গ্রহণ করা। এবং কাঙ্খিত পর্যায়ে পৌঁছার নিমিত্তে ধৈর্য ধারণ করা, তাড়াহুড়ো বা বল প্রয়োগ কিংবা রূঢ় আচরণের চিন্তা পরিহার করা। বরং সন্দেহ নিরসনের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা করে প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে অব্যাহতভাবে। এবং দলিলাদি উপস্থাপন করতে হবে উত্তম পদ্ধতিতে। হকের মাধ্যমে নিজে উপকৃত হওয়া, হক গ্রহণ করা এবং হকের দাওয়াত দ্বারা কোনো ব্যক্তিকে প্রভাবিত করা ও বিতর্ক-আলোচনায় সন্তুষ্ট করে হক গ্রহণে তাকে উৎসাহী করার এটিই সহজ উপায়।

দাওয়াতের সঠিক পন্থা হলো, দাঈকে প্রজ্ঞাপূর্ণ, দূরদর্শী হয়ে দাওয়াত দানে প্রবৃত্ত হওয়া। তাড়াহুড়ো ও বল প্রয়োগের মানসিকতা ত্যাগ করে হিকমতের মাধ্যমে অগ্রসর হওয়া। কুরআন ও হাদিসের প্রভাবপূর্ণ উপদেশ বাণীর মাধ্যমে দাওয়াত পেশ করা যেগুলো দাওয়াত পেশকৃত ব্যক্তির হৃদয়-মনে প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম এবং হক গ্রহণে প্রেরণা দানে খুবই পারঙ্গম। বিতর্ক করার প্রয়োজন দেখা দিলে সেখানেও উত্তম আদর্শের স্বাক্ষর রাখতে হবে, যুক্তিপূর্ণ তথ্য ও নম্রতাপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে নিজ মতাদর্শে বিশ্বাসী ও অনুপ্রাণিত করার প্রতি মনোযোগী হতে হবে। সফল হতে হলে এ পদ্ধতির বিকল্প নেই।