hadith book logo

প্রতিবন্ধী ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

লেখকঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন আল-আযহারী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

প্রতিবন্ধীদের জন্য আমাদের করণীয়:

১- নিজের সুস্থতা ও আরোগ্যতার কারণে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা এবং প্রতিবন্ধী ভাইদের জন্য দো‘আ করা। ইসলাম তাদের যে সব অধিকার দিয়েছে তা যথাযথভাবে আদায় করা।

২- যথাসম্ভব প্রতিবন্ধীদের সাহায্য-সহযোগিতা করা। সেটা অন্ধ ব্যক্তিকে রাস্তা চলায় সাহায্য করা হোক কিংবা তাদের জীবন-যাপনের ক্ষেত্রে সাহায্য করা হোক কিংবা তাদের শিক্ষাদানে সহযোগিতা হোক। সুস্থদের সামান্য সাহায্যে তাদের জীবন-যাপন সহজ হতে পারে, তাদের মুখে ফুটতে পারে হাসি এবং তারা দাঁড়াতে পারে সমাজের সবার সাথে এক লাইনে।

৩- আমাদের মনে রাখা দরকার, প্রতিবন্ধীর দেখাশোনা করা তার উপর জরূরী, যে তার অভিভাবক। আর সমষ্টিগতভাবে সকল মুসলিমের জন্য ফরযে কিফায়া। অর্থাৎ সমাজের কিছু লোক তাদের দেখা-শোনা করলে বাকি লোকেরা গুনাহগার হবে না।

৪- তাদের জন্য এমন কিছু শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার যা তাদের প্রয়োজনীয় কাজ নিজে করতে সাহায্য করবে এবং নিজে রোজগার করে স্বয়ং সম্পন্ন হতে পারে। তাদের শিক্ষা-প্রশিক্ষণে বর্তমান যুগে বিভিন্ন ধরনের উপকরণ আবিষ্কৃত হয়েছে, যেমন স্পষ্ট হস্তলিপি, সাঙ্কেতিক ভাষা, হুইল চেয়্যার, চলন্ত চেয়্যার, কম্পিউটার প্রোগ্রাম ইত্যাদি। এই রকম যাবতীয় উপকারি উপকরণ ব্যবহার করে তাদেরকে দক্ষ করে গড়ে তোলা উচিত।

৫- প্রতিবন্ধীর কল্যাণে আমাদের দেশে ১৯৯৯ সালে ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ গঠিত হলেও ২০০৯ সালে এর কার্যক্রমে নতুন গতি সঞ্চার হয়। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ভবনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার, বিনামূল্যে চিকিৎসা, শিক্ষা উপকরণ ও অন্যান্য সহায়তা প্রদান করছে যা পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন জেলায় সম্প্রসারণ করা হবে। এছাড়াও সমাজ সেবা অধিদপ্তরের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় দরিদ্র প্রতিবন্ধী ভাতা ও ছাত্রদের জন্য শিক্ষা বৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধীদের কোটা রয়েছে। অনেক বেসরকারি সংস্থা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু সরকারিভাবে এসব কার্যক্রম মনিটরিংএর সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। আমাদের উচিত প্রতিবন্ধীদেরকে এ সব সাহায্য সহযোগিতার কথা জানানো। তাদের অনেকেই এ সুযোগ সুবিধার কথা আদৌ জানে না, বা জানলেও যথাযথ উদ্যোগের অভাবে ভোগ করতে পারে না।

৬- বিশ্বের প্রায় শতকরা ১০ ভাগ জনগোষ্ঠী যে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সমস্যায় আক্রান্ত। তাদের অন্যসব নাগরিকের মতো সমান অধিকার ও সুযোগের সমতা বিধান ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ ও বিশ্বব্যাপী সচেতনতা তৈরিতে প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর ‘বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস’ পালিত হয়। প্রায় ত্রিশ বছর আগে জাতিসংঘ এ দিবসের সূচনা করে ২০০৬ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য কনভেনশন (Convention on the Rights of Persons with Disabilities) প্রণয়ন করার মধ্য দিয়ে অধিকার রক্ষায় একটি নতুন অধ্যায় সূচিত হয়। কিন্তু সিআরপিডির আদলে এখনো আমাদের দেশে প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১ কিংবা প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন ২০১০ কোনটিরই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি যা দুর্ভাগ্যজনক। কালবিলম্ব না করে এ বিষয়ে দ্রত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। কারণ এ আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংসংস্থানসহ অন্যান্য মৌলিক অধিকার ও রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক অধিকার সুরক্ষা ও সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশ ২০০৭ সালে সিআরপিডিতে স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন করেছে।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, শুধুমাত্র আইনি সুরক্ষা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমাজে সহজগম্যতা বা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য যথেষ্ট নয়। এজন্য প্রয়োজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রতি আমাদের সমাজে বিদ্যমান নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা। ইসলাম তাদেরকে যেভাবে সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছে তা সবার মনে রাখা দরকার। আল্লাহর কাছে তাকওয়া ছাড়া শারীরিক অবকাঠামোর কোনো মূল্য নেই। প্রতিবন্ধীরাও মানুষ। আর আল্লাহ সব মানব জাতিকে সম্মানিত করেছেন।

(লেখাটি মিশরী লেখক মাহমুদ কাল‘আবী ও আরো কিছু পত্র পত্রিকা অনুসারে সাজানো)