hadith book logo

জানাযার কিছু বিধান

লেখকঃ শিহাবউদ্দিন হোসাইন • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬

সান্ত্বনা দান ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা

প্রশ্ন ১- শোকবার্তা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া ও তাদের সাথে বৈঠক করা কি বৈধ?

উত্তর - শোকাহত মুসলিম পরিবারকে সান্ত্বনা দেয়া মুস্তাহাব, এর মাধ্যমে তাদেরকে সুহৃদয়তা দেখানো হয়। এ সময় যদি তাদের নিকট চা, কফি ইত্যাদি পান করে বা আতর ইত্যাদি গ্রহণ করে, যা সাধারণত অন্যান্য সাক্ষাত প্রার্থীদের সাথে করা হয়, এতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ২- শোক প্রকাশের সময় এ কথা বলা কেমন যে, সে তার শেষ ঠিকানায় চলে গেছে?

উত্তর - আমার জানামতে তাতে কোন সমস্যা নেই, কারণ দুনিয়ার তুলনায় পরকাল নিশ্চয় তার শেষ ঠিকানা। তবে মুমিনদের সত্যিকারের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জান্নাত আর কাফেরদের শেষ ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম।

প্রশ্ন ৩- সান্ত্বনা দেয়ার উদ্দেশ্যেঃ

﴿يَٰٓأَيَّتُهَا ٱلنَّفۡسُ ٱلۡمُطۡمَئِنَّةُ ٢٧﴾ [ الفجر :27]

“হে প্রশান্ত আত্মা” [ফজর: ২৭] বলে মৃতকে সম্বোধন করা কেমন?

উত্তর - এ ধরণের বাক্য পরিত্যাগ করা উচিত, কারণ তাদের জানা নেই যে মৃতের আত্মা বাস্তবিকেই কেমন। শরিয়ত অনুমোদিত আমল হচ্ছে মৃতের জন্যে প্রার্থনা করা, তার জন্যে ক্ষমা ও রহমতের দো‘আ করা।

প্রশ্ন ৪- পেপার পত্রিকায় শোকপ্রকাশ করা কেমন, এটাকি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?

উত্তর - এটা নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত না হলেও বর্জন করা উচিত, কারণ এতে নিষ্প্রয়োজনে অনেক অর্থ ব্যয় হয়।

প্রশ্ন ৫- মৃতের অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী তিন দিন পর্যন্ত মৃতের বাড়িতে অবস্থান করে, এটা কেমন?

উত্তর – মৃতের পরিবারের সাথে হৃদ্যতা প্রকাশের জন্য সেখানে তিন অবস্থান করা বৈধ, তবে এ ক্ষেত্রে ওলিমার ন্যায় লোকদের জন্য খাওয়ার অনুষ্ঠান করবে না।

প্রশ্ন ৬ - সান্ত্বনা দেয়ার জন্য কি কোন নির্ধারিত সময় আছে?

উত্তর - আমার জানামতে এর জন্য নির্ধারিত কোন সময় নেই।

প্রশ্ন ৭- শোকাহত পরিবারকে খানা পৌঁছানো বাবদ জবেহকৃত প্রাণী পাঠিয়ে দেয়া কেমন?

উত্তর - দেয়া যেতে পারে, নিকটতম আত্মীয়দের দ্বারা তা রান্না করে নেবে। মুতার যুদ্ধে সাহাবি জাফর ইবন আবু তালিব শাহাদত বরণ করলে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের লোকদেরকে বললেন, তোমরা জাফরের পরিবারের জন্য খানা তৈরি করে পাঠিয়ে দাও, কারণ তারা কঠিন বিপদগ্রস্ত খানা তৈরির মানষিকতা তাদের নেই।

প্রশ্ন ৮- মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করেছে যে, তার ইন্তেকালের পর যেন বিলাপ করা না হয়, তবও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে, তাহলে কি মৃতকে আযাব দেয়া হবে?

উত্তর - তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই ভাল জানেন, প্রত্যেকের উচিত তার আপনজনদেরকে এ বিষয়ে সতর্ক করা। ওয়ারিসদের সতর্ক করার পরও যদি কেউ তার জন্য বিলাপ করে তাহলে ইনশাল্লাহ সে অপরাধী বলে সাব্যস্ত হবে না। মহান আল্লাহ তালা বলেন,

﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٞ وِزۡرَ أُخۡرَىٰۚ ١٨﴾ [ فاطر :18]

“আর কোন বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না”। সূরা ফাতিরঃ (১৮)

প্রশ্ন ৯- শোকাহত পরিবারের জন্য প্রেরিত দুপর বা রাতের খাবারে অন্য কেউ অংশগ্রণ করলে তা কি মাতম বা বিলাপে পরিণত হবে?

উত্তর – না, তা মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। কারণ আগত লোকদের জন্য শোকাহত পরিবার খানার ব্যাবস্থা করেনি, বরং অন্যরা তাদের জন্য ব্যাবস্থা করেছে, আর তা অতিরিক্ত হওয়ায় অন্যরা তাতে অংশগ্রহণ করেছে, তাই এতে কোন সমস্যা নেই।

প্রশ্ন ১০ – অনিচ্ছায় যদি ক্রন্দনের মধ্যে বিলাপ এসে যায় তাহলে তার হুকুম কি?

উত্তর - বিলাপ সর্বাস্থায় না জায়েয, তবে চক্ষু অশ্রুশিক্ত ও অন্তর বিষণ্ন হতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পুত্র ইব্রাহিমের ইন্তেকালের পর তিনি বলেছেন,

«العين تدمع و القلب يحزن ولا نقول إلا ما يرضى الرب و إنا لفراقك يا إبراهيم لمحزونون» رواه البخاري )

“চক্ষু অশ্রু বিসর্জন করছে, অন্তর ব্যথিত হচ্ছে, তবুও প্রভূর অসন্তুষ্টির কারণ হয় এমন কথা বলব না, হে ইব্রাহীম, তোমার বিরহে আমরা ব্যথিত”। (বুখারি)

প্রশ্ন ১১ - শোকপ্রকাশের জন্য সফর করা ও শোকাহত লোকদের নিকট অবস্থান করা কেমন?

উত্তর - এ বিষয়টি শোকাহত লোকদের অবস্থার উপর নির্ভর করবে, তারা যদি এতে আন্দবোধ করে তাহলে তাদের নিকট অবস্থান করতে কোন সমস্যা নেই, অন্যথায় নয়।

প্রশ্ন ১২ - ফকিহগণ বলেছেন, স্বামী ব্যতীত অন্য কারো জন্য সর্বোচ্চ তিন দিন শোক প্রকাশ করা বৈধ, অর্থাৎ সাজসজ্জ্বা ত্যাগ করা, কথাটি কতটুকু সত্য?

উত্তর - কথাটি সম্পূর্ণ সঠিক, বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা তা প্রমাণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«لا تحد امرأة على ميت فوق ثلاث إلا على زوج أربعة أشهر وعشرا» ( متفق عليه )

“কোন নারী মৃত ব্যক্তির জন্য তিন দিনের বেশী শোক প্রকাশ করেব না, তবে তার স্বামীর জন্য চারমাস দশদিন শোক প্রকাশ করবে”। (বুখারি ও মুসলিম)

প্রশ্ন ১৩ - শোকাহত পরিবার নিজেদের খানা নিজেরা পাক করতে পারবে কি?

উত্তর – হ্যাঁ, তারা নিজেদের খানা নিজেরা রান্না করবে, এতে কোন সমস্যা নেই, তবে কারো জন্য পাকাবে না।

প্রশ্ন ১৪ - মৃত ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা কি মাতমের অন্তর্ভূক্ত?

উত্তর - মৃতকে উদ্দেশ্যে করে শোকগাথা ছন্দ বা কবিতা পাঠ করা হারাম ও নিষিদ্ধ মাতমের অন্তর্ভূক্ত হবে না। তবে কারো প্রশংসায় সীমাতিরিক্ত করা কোন অবস্থাতে জায়েয হবে না। যেমন করে থাকে কবি ও গায়কগণ।

প্রশ্ন ১৫ - পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে শোকবার্তা পাঠনো কেমন?

উত্তর - বিষয়টি বিবেচনা সাপেক্ষ, কারণ এটা একটি ব্যয়বহুল কাজ, তবুও যদি সত্যবাণী দ্বারা শোকপ্রকাশ করা হয় তবে জায়েয, তবে এভাবে না করাই উত্তম। শোকাহত পরিবারকে সান্ত্বনার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, তাদের নিকট পত্র পাঠাবে বা মোবাইল করবে, বা সাক্ষাত করবে।