hadith book logo

ইখলাসের অপরিহার্যতা ও হজ কবূলে তার প্রভাব

লেখকঃ ড. সালেহ ইবন আবদুল আযীয সিন্দী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

প্রথমত: রিয়া

রিয়া বা লোক দেখানো আমল হলো, আমলকারীর ইবাদতে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্য থাকবে না; বরং সে তার আমলগুলো প্রকাশ করবে, যেন মানুষ তার আমল-ইবাদত দেখে প্রশংসা করে।

রিয়ার রয়েছে বিভিন্ন স্তর ও প্রকার: যেমন,

(১) বড় রিয়া (২) ছোট রিয়া, তা থেকে নিরাপদ সে, যাকে আল্লাহ নিরাপদে রেখেছেন।

রিয়া হারাম হওয়ার বহু স্পষ্ট দলীল রয়েছে। দলীলসমূহে রিয়াকে ছোট শির্ক, গোপন শির্ক ও সূক্ষ্ম শির্ক নামে অভিহিত করা হয়েছে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمْ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ " قَالُوا : وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللهِ؟ قَالَ : " الرِّيَاءُ، يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمْ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً»

“আমি তোমাদের ওপর সর্বাধিক যে জিনিসের ভয় পাই তা হলো: ছোট শির্ক। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন: হে আল্লাহর রাসূল, ছোট শির্ক কি? তিনি বলেন, রিয়া। কিয়ামতের দিন যখন মানুষকে তাদের আমলের প্রতিদান দেয়া হবে তখন আল্লাহ এদেরকে বলবেন: তোমরা এখন ঐ সব লোকের নিকট যাও যাদেরকে তোমরা দেখানোর জন্য আমল করেছিলে, দেখ তোমরা তাদের নিকট কোনো প্রতিদান পাও কিনা।” [মুসনাদে আহমাদ: ৩৯/৩৯, সহীহ।]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,

«أَلَا أُخْبِرُكُمْ بِمَا هُوَ أَخْوَفُ عَلَيْكُمْ عِنْدِي مِنْ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ " , قَالَ : قُلْنَا : بَلَى , فَقَالَ : " الشِّرْكُ الْخَفِيُّ , أَنْ يَقُومَ الرَّجُلُ يُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلَاتَهُ لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ رَجُلٍ» .

“আমি কি তোমাদেরকে এমন বিষয়ের খবর দিব না, যা আমার নিকট তোমাদের ওপর মসীহ দাজ্জালের চেয়েও ভয়াবহ? বর্ণনাকারী বলেন, আমরা বললাম: জ্বী হ্যাঁ! তখন তিনি বলেন, গোপন শির্ক (আর তা হলো) কোনো লোক সালাতে দাঁড়াবে, অতঃপর তার সালাত সুন্দর করবে, যে ব্যক্তি দেখছে তার কারণে।” [ইবন মাজাহ: ২/১৪০৬।]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«أَيُّهَا النَّاسُ   إِيَّاكُمْ وَشِرْكَ السَّرَائِرِ " قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، وَمَا شِرْكُ السَّرَائِرِ ؟ قَالَ : " يَقُومُ الرَّجُلُ فَيُصَلِّي فَيُزَيِّنُ صَلاتَهُ جَاهِدًا لِمَا يَرَى مِنْ نَظَرِ النَّاسِ إِلَيْهِ ، فَذَلِكَ شِرْكُ السَّرَائِرِ»

“ওহে মানবমণ্ডলী! তোমরা নিজেদেরকে সূক্ষ্ম ও গুপ্ত শির্ক থেকে বাঁচাও। সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! সূক্ষ্ম শির্ক কি? তিনি বলেন, মানুষ সালাত আদায় করতে দাঁড়াবে আর তার সালাতকে সুন্দর করার চেষ্টা করবে এজন্য যে, মানুষ তার দিকে দেখছে। আর এটিই হচ্ছে সূক্ষ্ম শির্ক।” [সহীহ ইবন খুযাইমা: ২/৬৭ শাইখ আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন।]

এরই দৃষ্টান্ত হলে যেমন কোনো হাজী এ ধরণের ভয়াবহ ব্যাধির সম্মুখীন হয়ে থাকে। অর্থাৎ সে হজ করে আর তার নিয়তে ঢুকে থাকে যে সে তার হজের দ্বারা গর্ব প্রকাশ করে বেড়াবে বা কতবার সে হজ করল তার দ্বারা দেশে ফিরে গর্ব করবে অথবা তার সেই হজে এমন আলহাজ উপাধির মর্যাদা অর্জন হবে যা তার বংশের মধ্যে তার পূর্বে অর্জন করতে পারে নি। কখনও আবার হজ পালনরত অবস্থায় সৎ আমলের প্রচেষ্টা, সালাতে স্থিরতা, নমনীয়তা, দো‘আতে কাকুতি-মিনতি, বেশি বেশি নফল ইবাদত আদায় বা অন্যকে উপদেশ নসীহত ইত্যাদি প্রকাশ করে ইখলাসকে নষ্ট করে দেওয়া হয়। কেননা উক্ত আমল সে মানুষের সুনাম অর্জন ও তাদের চোখে বড় হওয়ার জন্য করে থাকে। এসব কাজ ইখলাসের পরিপন্থী ও নষ্টকারী, যা আমল ও তার নেকীর ওপর প্রভাব ফেলে। তাতে হয়তো আমল নষ্ট হয়ে যাবে না; বরং নেকী কমে যাবে।

অনুরূপ হজে সাথীদের খেদমত ও তাঁদের প্রয়োজনে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ায় যদি তাদের নিকট সুনাম অর্জনই উদ্দেশ্য হয়, তবে সে তার মহা সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে।

ইবাদত দ্বারা যদি সৃষ্টির সন্তুষ্টি ও তাদের নৈকট্য অর্জন করা হয় তবে নিঃসন্দেহে সে ইবাদত নষ্ট হয়ে যাবে তাতে কোনো নেকী হবে না; বরং যে এমন ইবাদত করবে সে আল্লাহর অসন্তুষ্টি ও শাস্তির উপযুক্ত হবে। হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

«أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنْ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيهِ مَعِي غَيْرِي تَرَكْتُهُ وَشِرْكَهُ»

“আমি শির্ককারীদের শির্ক (অংশীদারদের অংশ) গ্রহণ থেকে অমুখাপেক্ষী, যে ব্যক্তি এমন আমল কোনো করবে যাতে সে আমার সাথে অন্যকে শরীক করবে, আমি তাকে ও তার শির্ককৃত বস্তু উভয়কেই বর্জন করি।” [সহীহ মুসলিম: ১৮/৩২৬।]

শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ বলেন, “সর্বসম্মতি ক্রমে শির্ক মিশ্রিত আমলে কোনো নেকী দেওয়া হবে না।” [আল-ইখতিয়ারাত: ৯০।]