hadith book logo

ইত্তেবায়ে রাসূল

লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

ছয়টি বিষয়ে ইত্তেবা‘ জরুরি:

মোটকথা, যে কোনো ইবাদতে রাসূলের ইত্তেবা‘ জরুরী। মনগড়া কোনো ইবাদত আল্লাহর নিকট গ্রহণ যোগ্য নয়। আমলের ক্ষেত্রে ইত্তেবা‘ সহীহ হওয়া ও আমলটি শরী‘আত অনুযায়ী হওয়ার জন্য ছয়টি বিষয়ে এক ও অভিন্ন হতে হবে।

এক- ইবাদতের কারণটি শরী‘আত অনুযায়ী ও অনুমোদিত হতে হবে। সুতরাং যদি কোনো মানুষ এমন একটি কারণ দেখিয়ে ইবাদত করে যে কারণটি শরী‘আত অনুমোদন করে নি তা অবশ্যই প্রত্যাখ্যাত হবে। যেমন, কিছু মানুষ রজব মাসের সাতাশ তারিখ রাতে সালাত আদায় ও ইবাদত-বন্দেগী করে থাকে। তাদের যুক্তি হলো, এ রাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মি‘রাজে নিয়ে যাওয়া হয়েছে এবং পাঁচ ওয়াক্ত সালাত এ রাতেই ফরয করা হয়েছে। সুতরাং এ রাতে সালাত আদায় করা সাওয়াবের কাজ ও পূন্যময়। কিন্তু এখানে যে কারণটি উল্লেখ করা হয়েছে, তা শরী‘আতের দলীল দ্বারা প্রমাণিত নয়। কারণ, এ কারণটি দেখিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বা তার কোনো সাহাবী এ রাতে সালাত আদায় ও ইবাদত-বন্দেগী করে নি। তাই এ রাতে সালাত আদায় ও ইবাদত বন্দেগী করা বিদ‘আত। সুতরাং ইবাদতের কারণটি শরী‘আত অনুযায়ী হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি কারণটি শরী‘আত অনুমোদিত কিনা তা জানা যায়, তবে অনেক বিদ‘আত থেকে বাঁচা যাবে। কারণ, আমরা এ ধরনের অনেক ইবাদতকে শরী‘আত মনে করি। কিন্তু বাস্তবে তা শরী‘আত নয় বরং বিদ‘আত।

দুই- ইবাদতের ধরনটি শরী‘আত অনুমোদিত হতে হবে। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো একটি ইবাদত আল্লাহর জন্য করে থাকে কিন্তু তার ধরনটি শরী‘আত অনুমোদন করে নি। তাহলে সে ইবাদত গ্রহণযোগ্য হবে না। যেমন, এক ব্যক্তি ঘোড়া কুরবানি করল, এ লোকের কুরবানি সহীহ হবে না। কারণ, লোকটি কুরবানির পশুর ধরনের মধ্যে শরী‘আতের বিরোধিতা করছে। কারণ, শরী‘আত কুরবানি করার জন্য চতুষ্পদ জন্তু থেকে কেবল গরু, ছাগল উটকেই নির্ধারিত করেছেন।

তিন- পরিমাণ: পরিমাণ শরী‘আত অনুমোদিত হবে। যদি কোনো মানুষ পরিমাণ বাড়ায় বা কমায় তাহলে তার ইবাদত শুদ্ধ হবে না। যেমন, যদি কোনো মানুষ যোহরের সালাত চার রাকাতের জায়গায় পাঁচ রাকাত আদায় করে, তাহলে তার সালাত শুদ্ধ হবে না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহরের সালাত কখনো পাঁচ রাকাত আদায় করেন নি।

চার- পদ্ধতি: পদ্ধতি শরী‘আত অনুমোদিত হতে হবে। যেমন, যদি কোনো ব্যক্তি অযু করার সময় হাত ধোয়ার পূর্বে পা দুয়ে ফেলে তাহলে সেও সুন্নাতের বিরোধিতা করল। তার অযু ঠিক হবে না। কারণ, লোকটি অযু করার পদ্ধতিতে ভুল করেছেন এবং শরী‘আতের বিরোধিতা করেছে।

পাঁচ- সময়: সময়টি শরী‘আত অনুযায়ী হতে হবে। যদি কোনো ইবাদত শরী‘আত নির্ধারিত সময়ে না করে নির্ধারিত সময়ের আগে বা পরে করে তাহলে তা ইবাদত বলে গণ্য হবে না এবং ইবাদত সঠিক হবে না। যেমন, কোনো ব্যক্তি যিলহজ মাসের প্রথমে কুরবানি করে ফেলল বা ঈদের সালাতের পূর্বে কুরবানি করল, তাহলে তার কুরবানি সহীহ হবে না। বরং এটি গোশত খাওয়ার জন্য যবেহ করা হবে। অনুরূপ যদি কেউ রমযান মাসে কুরবানি করে তাহলে তার কুরবানি শুদ্ধ হবে না। সুতরাং ইবাদত শুদ্ধ হওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়টি শরী‘আতসম্মত হতে হবে।

ছয়- স্থান: ইবাদতের স্থানটি শরী‘আত অনুমোদিত হবে। যদি স্থানটি শরী‘আত সম্মত না হয়, তবে ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হবে না। যেমন, শরী‘আত অনুযায়ী ইতিকাফ করার স্থান হলো মসজিদ। যদি কোনো ব্যক্তি মসজিদের বাইরে ইতিকাফ করে তার ইতিকাফ করা শুদ্ধ হবে না। যদি কোনো নারী বলে আমি স্বীয় ঘরে সালাতের স্থানে ইতিকাফ করব, তাহলে তার ইতিকাফ শুদ্ধ হবে না। কারণ, ইতিকাফের স্থান হলো মসজিদ। অনুরূপভাবে কোনো ব্যক্তি বায়তুল্লাহ’র তাওয়াফ করতে গিয়ে দেখে সেখানে অনেক ভিড় তখন সে সেখান থেকে ফিরে মহল্লার মসজিদে তাওয়াফ করা আরম্ভ করল তার তাওয়াফ শুদ্ধ হবে না। কারণ, তাওয়াফ করার স্থান হলো মসজিদ। আল্লাহ তা‘আলা তার স্বীয় বন্ধু ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে বলেন,

﴿أَن طَهِّرَا بَيۡتِيَ لِلطَّآئِفِينَ وَٱلۡعَٰكِفِينَ وَٱلرُّكَّعِ ٱلسُّجُودِ ١٢٥﴾ [ البقرة : ١٢٥ ]

“তোমরা ইতেকাফ কারী, তাওয়াফকারী ও রুকু- সাজদাকারীদের জন্য আল্লাহর ঘরকে পবিত্র কর”। [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১২৫]

নবী আকরাম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইত্তেবা‘ তথা অনুসরণ ইসলামের অন্যতম মূল ভিত্তি। এ প্রসঙ্গে কুরআন ও হাদীসে প্রচুর উদ্ধৃতি বিদ্যমান। সবগুলো এ সংক্ষিপ্ত বইতে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ ٧﴾ [ الحشر : ٧ ]

“রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন তা থেকে বিরত থাক”। [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ৩]

আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,

﴿مَّن يُطِعِ ٱلرَّسُولَ فَقَدۡ أَطَاعَ ٱللَّهَۖ وَمَن تَوَلَّىٰ فَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ عَلَيۡهِمۡ حَفِيظٗا ٨٠ ﴾ [ النساء : ٨٠ ]

“যে রাসূলের আনুগত্য করল, সে প্রকারান্তরে আল্লাহরই আনুগত্য করল। আর যে বিমুখ হলো, আমি আপনাকে তাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে প্রেরণ করিনি”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮০]

আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব থেকেবর্ণিত, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শোনেছেন:

«ذَاقَ طَعْمَ الْإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا»

“সে ব্যক্তি ঈমানের স্বাদ পেয়েছে, যে রব হিসেবে আল্লাহকে, দীন হিসেবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছে”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩৪।]

অপর একটি হাদীস আনাস ইবন মালেক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ : أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ المَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلَّا لِلَّهِ، وَأَنْ يَكْرَهَ أَنْ يَعُودَ فِي الكُفْرِ كَمَا يَكْرَهُ أَنْ يُقْذَفَ فِي النَّارِ»

“তিনটি জিনিস যার মধ্যে পাওয়া যাবে, সে ঈমানের সাধ গ্রহণ করবে। এক- আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল তার নিকট দুনিয়ার সব কিছু হতে প্রিয় হওয়া। দুই- কোনো মানুষকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ভালোবাসা। তিন- ঈমান আনার পর কুফুরীতে ফিরে যাওয়াতে এমন অপছন্দ করবে, যেমন আগুনে নিক্ষেপ করাকে অপছন্দ করে”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৬।]