১
শিশু সাহিত্যসাধনায় মুসলমান
লেখকঃ মিরাজ রহমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ২
শিশু সাহিত্যসাধনায় মুসলমান
একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ- বীজ থেকে অঙ্কুর, অঙ্কুর থেকে চারা, চারা থেকে শিশুগাছ, শিশুগাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ একটি গাছের রূপ লাভ। প্রকৃতির এ পালা-বদলের মত আগামীদিনের পিতা- একজন শিশুর জীবনেও আসে কিছু পালা-বদল। দিন-বদলের সাথে সাথে আসে রূপ বদলের মত কিছু ঝড়-ঝাপটা। মানব-জীবনের এসব পালা-বদলে টিকে থাকার জন্য চাই কিছু সুশিক্ষা। প্রয়োজন পরে কিছু সু-দীক্ষার। চাই কিছু সুঠাম হাতের তত্ত্বাবধান। সুমতি লালনপালন। আগামীদিনের রাহবার-একজন আকাবিরকে তাই দক্ষ করে গড়ে তোলার জন্য দরকার কিছু সুখপঠন সামগ্রী। কারণ কচি মন-ক্যানভাসে এখনই এঁকে দেয়া চাই সুদর্শন-সুন্দর আদর্শময় কিছু ছবি, কিছু মডেল।
কবে, কার হাতে, কীভাবে এবং কাকে উৎসর্গ করে বাংলাভাষায় শিশুসাহিত্যসাধনার জন্ম ঘটে, ঠিক বলা মুসকিল। তবে বঙ্গদেশে হিন্দু পন্ডিতদের হাতে শিশুসাহিত্যসাধনার দ্বার উন্মোচিত হয়- একথা যেমন সত্য, মুসলমান সাহিত্যিকদের এ পথে বিলম্বে অংশগ্রহণের বিষয়টাও অসত্য নয়। বাংলাসাহিত্যের অন্যান্য শাখা-পলবের মত শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমানদের অবদানের সূর্য অনেক বিলম্বেই উদিত হয়। অনেক পরে হলেও সক্রিয় এবং সার্থক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিলম্বিতের এ দোষ এড়াতে পেরেছিল তারা, শতভাগ।
শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনার মধ্য দিয়ে বঙ্গদেশে শিশুসাহিত্যসাধনা শুরু হয়। বাংলাভাষাতে যারা প্রথম শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনায় ব্রতী হন বলে আমরা ইতিহাস গবেষণায় দেখতে পাই- তারা ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের খ্রিস্টান ও হিন্দু পন্ডিতগণ। পরবর্তীকালেও তাদের ধারাবাহিকতায় অনেক হিন্দু পন্ডিত এ পথে আগ্রহী হন এবং সাধনামুখর জীবন গড়তে সক্ষম হন। বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, রাজ কৃষ্ণ, রাজেন্দ্রলাল, মধুসূদন মুখোপাধ্যায়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ নাম হিন্দু শিশুপাঠ্য রচনা-আদিপর্বের গৌরব।
১৮০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পন্ডিতরা মিশনারি এবং দেশি ছাত্রদের জন্য শিশু পাঠ্যপুস্তক রচনা আরম্ভ করেন। এ মিশনারি যুগেই তাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কলিকাতা বুক সোসাইটি’ (১৮১৭), ‘ভার্নাকুলার লিটারেচর কমিটি’ (১৮৫০), এবং অনুবাদ সাহিত্য গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গ অনুবাদ সমাজ’ (১৮৫০)।
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তকগুলি ১৮৫০-১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। অক্ষয় দত্ত রচিত ‘চারুপাঠ’ (৩ খন্ড) প্রকাশিত হয় ১৮৫৩-১৮৫৯ সালে। মদন মোহন রচিত ‘তর্কালংকারে শিশু-শিক্ষা’ ১৮৪৯-১৮৫০ সালে তিন খন্ডে প্রকাশ পায়।
একদিকে শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনা যেমন শিশুসাহিত্য সাধনার গতিকে ত্বরান্বিত করে, তেমনি তৎকালে প্রকাশিত বিভিন্ন শিশুতোষ পত্রিকায় ছোটদের জন্য লেখা-রচনা সাহিত্যের এ ধারায় উন্নয়নের জোয়ার আনে।
যদ্দুর জানা যায়, ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘দিক-দর্শন’ নামে সর্বপ্রথম এদেশে শিশুতোষ পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। এরপর সময়ের সাথে সাথে ‘পঞ্চাবলী’ (১৮২৯) ‘বালকবন্ধু’ (১৮৭৮) ‘সখা’ (১৮৮৩) ‘বালক’ (১৮৮৫) ‘সাথী’ (১৮৯০) ‘সখা ও সাথী’ (১৮৯৪) ‘মুকুল’ (১৮৯৫) ‘প্রকৃতি’ (১৯০০) ইত্যাদি শিশুপাঠযোগ্য পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাভাষায় শিশুসাহিত্য সাধনায় নতুন প্রাণের জোয়ার আসে। নব উষার স্বর্ণদ্বার উন্মোচিত হয়। এসব পত্রিকার পাতায় তখন নতুন নতুন এবং শ্রেষ্ঠ সব শিশুসাহিত্যিকদের সমাগম ঘটতে থাকে। এককথায় বলা চলে, সেকালে রচিত শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক এবং প্রকাশিত শিশুপাঠ্য পত্রিকার মাধ্যমে সে যুগের বাঙালি শিশুদের জীবনযাপনের ও আনন্দ-উপভোগের যথাযথ খোরাক বণ্টন হয়েছিল।
শিশুচিত্তের চাহিদা মোতাবেক ধীরে সুধীরে বাংলা শিশুসাহিত্যসাধনা প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। লেখক-প্রকাশক উভয় শ্রেণি উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন শিশুতোষ প্রকাশনায়। ফলে আধুনিক বিশ্বের শিশুসাহিত্যসাধনার পাশাপাশি আমাদের বাঙালি শিশুসাহিত্যসাধনাও প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক মহলে বাঙালি শিশুসাহিত্যকে গর্বিত-প্রশংসিত করে তোলার পিছনে যে সব শিশুপত্রিকা ভূমিকা পালন করেছে বলে দেখা যায়, তা হলো- ‘শিশু’ (১৯১৩) ‘ধ্রুব’ (১৯১৩) ‘সন্দেশ’ (১৯১৩) ‘মৌচাক’ (১৯২০) ‘রঙমশাল’ (১৯২০) ‘শিশুসাথী’ (১৯২২) ‘খোকাখুকু’ (১৯২৩) ‘রামধনু’ (১৯২৭) ‘মাসপয়লা’ (১৯২৮) ‘পাঠশালা’ (১৯৩৬) ইত্যাদি।
কবে, কার হাতে, কীভাবে এবং কাকে উৎসর্গ করে বাংলাভাষায় শিশুসাহিত্যসাধনার জন্ম ঘটে, ঠিক বলা মুসকিল। তবে বঙ্গদেশে হিন্দু পন্ডিতদের হাতে শিশুসাহিত্যসাধনার দ্বার উন্মোচিত হয়- একথা যেমন সত্য, মুসলমান সাহিত্যিকদের এ পথে বিলম্বে অংশগ্রহণের বিষয়টাও অসত্য নয়। বাংলাসাহিত্যের অন্যান্য শাখা-পলবের মত শিশুসাহিত্যসাধনায় মুসলমানদের অবদানের সূর্য অনেক বিলম্বেই উদিত হয়। অনেক পরে হলেও সক্রিয় এবং সার্থক অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিলম্বিতের এ দোষ এড়াতে পেরেছিল তারা, শতভাগ।
শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনার মধ্য দিয়ে বঙ্গদেশে শিশুসাহিত্যসাধনা শুরু হয়। বাংলাভাষাতে যারা প্রথম শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনায় ব্রতী হন বলে আমরা ইতিহাস গবেষণায় দেখতে পাই- তারা ছিলেন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের খ্রিস্টান ও হিন্দু পন্ডিতগণ। পরবর্তীকালেও তাদের ধারাবাহিকতায় অনেক হিন্দু পন্ডিত এ পথে আগ্রহী হন এবং সাধনামুখর জীবন গড়তে সক্ষম হন। বিদ্যাসাগর, অক্ষয় দত্ত, শিবনাথ শাস্ত্রী, রাজ কৃষ্ণ, রাজেন্দ্রলাল, মধুসূদন মুখোপাধ্যায়, যোগীন্দ্রনাথ সরকার প্রমুখ নাম হিন্দু শিশুপাঠ্য রচনা-আদিপর্বের গৌরব।
১৮০০ খ্রিস্টাব্দের প্রথম দিকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পন্ডিতরা মিশনারি এবং দেশি ছাত্রদের জন্য শিশু পাঠ্যপুস্তক রচনা আরম্ভ করেন। এ মিশনারি যুগেই তাদের হাতে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘কলিকাতা বুক সোসাইটি’ (১৮১৭), ‘ভার্নাকুলার লিটারেচর কমিটি’ (১৮৫০), এবং অনুবাদ সাহিত্য গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় ‘বঙ্গ অনুবাদ সমাজ’ (১৮৫০)।
ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর রচিত শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তকগুলি ১৮৫০-১৮৬৩ সালে প্রকাশিত হয়। অক্ষয় দত্ত রচিত ‘চারুপাঠ’ (৩ খন্ড) প্রকাশিত হয় ১৮৫৩-১৮৫৯ সালে। মদন মোহন রচিত ‘তর্কালংকারে শিশু-শিক্ষা’ ১৮৪৯-১৮৫০ সালে তিন খন্ডে প্রকাশ পায়।
একদিকে শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক রচনা যেমন শিশুসাহিত্য সাধনার গতিকে ত্বরান্বিত করে, তেমনি তৎকালে প্রকাশিত বিভিন্ন শিশুতোষ পত্রিকায় ছোটদের জন্য লেখা-রচনা সাহিত্যের এ ধারায় উন্নয়নের জোয়ার আনে।
যদ্দুর জানা যায়, ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে ‘দিক-দর্শন’ নামে সর্বপ্রথম এদেশে শিশুতোষ পত্রিকার প্রকাশ ঘটে। এরপর সময়ের সাথে সাথে ‘পঞ্চাবলী’ (১৮২৯) ‘বালকবন্ধু’ (১৮৭৮) ‘সখা’ (১৮৮৩) ‘বালক’ (১৮৮৫) ‘সাথী’ (১৮৯০) ‘সখা ও সাথী’ (১৮৯৪) ‘মুকুল’ (১৮৯৫) ‘প্রকৃতি’ (১৯০০) ইত্যাদি শিশুপাঠযোগ্য পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে বাংলাভাষায় শিশুসাহিত্য সাধনায় নতুন প্রাণের জোয়ার আসে। নব উষার স্বর্ণদ্বার উন্মোচিত হয়। এসব পত্রিকার পাতায় তখন নতুন নতুন এবং শ্রেষ্ঠ সব শিশুসাহিত্যিকদের সমাগম ঘটতে থাকে। এককথায় বলা চলে, সেকালে রচিত শিশুতোষ পাঠ্যপুস্তক এবং প্রকাশিত শিশুপাঠ্য পত্রিকার মাধ্যমে সে যুগের বাঙালি শিশুদের জীবনযাপনের ও আনন্দ-উপভোগের যথাযথ খোরাক বণ্টন হয়েছিল।
শিশুচিত্তের চাহিদা মোতাবেক ধীরে সুধীরে বাংলা শিশুসাহিত্যসাধনা প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠে। লেখক-প্রকাশক উভয় শ্রেণি উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন শিশুতোষ প্রকাশনায়। ফলে আধুনিক বিশ্বের শিশুসাহিত্যসাধনার পাশাপাশি আমাদের বাঙালি শিশুসাহিত্যসাধনাও প্রশংসা কুড়াতে সক্ষম হয়। আন্তর্জাতিক মহলে বাঙালি শিশুসাহিত্যকে গর্বিত-প্রশংসিত করে তোলার পিছনে যে সব শিশুপত্রিকা ভূমিকা পালন করেছে বলে দেখা যায়, তা হলো- ‘শিশু’ (১৯১৩) ‘ধ্রুব’ (১৯১৩) ‘সন্দেশ’ (১৯১৩) ‘মৌচাক’ (১৯২০) ‘রঙমশাল’ (১৯২০) ‘শিশুসাথী’ (১৯২২) ‘খোকাখুকু’ (১৯২৩) ‘রামধনু’ (১৯২৭) ‘মাসপয়লা’ (১৯২৮) ‘পাঠশালা’ (১৯৩৬) ইত্যাদি।