hadith book logo

সাওম বিষয়ক আধুনিক কিছু মাসআলা

লেখকঃ ফিকহী গবেষণা সেন্টার, আল-ইমাম ইউনিভার্সিটি • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৯

ক্যাথেটার (Catheter) কি সাওমে কোনো প্রভাব ফেলবে? [মূল বইয়ের ৪৫৬ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]

বিবরণ: রোগীর মূত্রনালীতে বিশেষ এক ধরণের প্লাস্টিক পাইপ লাগানো হয়, যা রোগীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও পেশাব নির্গত করে। এটিই হচ্ছে, ক্যাথেটার। এর মাধ্যমে নির্গত পেশাব একটি ব্যাগে গিয়ে জমা হয়। রোগীকে ডাক্তার ক্যাথেটার দেওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, রোগীর স্বাভাবিক পেশাব না হওয়া অথবা তার টয়লেটে যেতে সমস্যা হওয়া। এই ক্যাথেটার ব্যবহার সাওমে কোনো প্রভাব ফেলবে কি?

হুকুম: কেউ তার মূত্রনালীতে তরল বা তেল জাতীয় কিছু প্রবেশ করালে তার সাওম নষ্ট হবে কিনা সে বিষয়ে পূর্ববর্তী ফকীহগণ গবেষণা করেছেন এবং তারা দ্বিমত পোষণ করেছেন:

প্রথম মত: অধিকাংশ ফকীহর মতে, মূত্রনালীতে ফোঁটায় ফোঁটায় কিছু প্রবেশ করালে সাওম ভাঙ্গবে না। কেননা লিঙ্গের অভ্যন্তর এবং পেটের মধ্যে কোনো রাস্তা নেই। অতএব, মূত্রনালীতে ফোটায় ফোটায় কিছু প্রবেশ করালে সাওম ভাঙ্গবে এমন কথা বলার কোনো সুযোগই নেই।

দ্বিতীয় মত: কারো কারো মতে, মূত্রনালীতে ফোঁটায় ফোঁটায় কিছু প্রবেশ করালে সাওম ভাঙ্গবে। ইমাম আবু ইউসুফ রহ. এই মতের প্রবক্তা, তবে তিনি শর্ত করেছেন যে, সাওম নষ্ট হওয়ার জন্য ঐ জিনিসটাকে মূত্রাশয় পর্যন্ত পৌঁছতে হবে। কেননা মূত্রাশয় এবং পেটের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে।

তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ ছাফ বলে দিয়েছেন যে, মূত্রাশয় এবং পাকস্থলীর মধ্যে দূরতম কোনো সম্পর্কও নেই।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণের বক্তব্য প্রথম মতকে শক্তিশালী করে। অর্থাৎ ক্যাথেটার সাওমের বিশুদ্ধতায় কোনো প্রভাব ফেলবে না। ‘আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমী’ এই মত সমর্থন করেছে।

তবে দ্বিতীয় মতানুযায়ী ক্যাথেটার সাওম ভঙ্গ করবে।

হেমো-ডায়ালাইসিস (Hemodialysis) কি সাওমে কোনো প্রভাব ফেলবে? [মূল বইয়ের ৪৬২ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।]

বিবরণ: মানব দেহের অন্যতম প্রধান কাজটি করে থাকে কিডনী। বিষ, অন্যান্য তরল পদার্থ এবং অতিরিক্ত লবণ থেকে শরীরের রক্ত পরিশোধনের কাজটি সে করে থাকে। কিডনীর ক্রিয়া অকেজো হয়ে গেলে যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা নিয়ে কিডনী ধোয়ার ব্যবস্থা না করা হয়, তাহলে তা অত্যন্ত মারাত্মক এবং জীবনের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। ডায়ালাইসিস-এর প্রকারের মধ্যে হেমো-ডায়ালাইসিস অন্যতম। এক্ষণে, সাওমে এর কোনো প্রভাব আছে কি?

হুকুম: দুইভাবে কিডনী ডায়ালাইসিস করা হয়:

১. হেমো-ডায়ালাইসিস: এই পদ্ধতিতে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে কিডনী ডায়ালাইসিস করা হয়। এক্ষেত্রে শরীরের রক্ত নিয়ে বিশেষ ঐ যন্ত্রে দেওয়া হয় এবং যন্ত্র ক্ষতিকারক পদার্থ থেকে রক্ত পরিশোধন করে শিরা দিয়ে আবার তা শরীরে ফিরিয়ে দেয়। এই পদ্ধতিতে কখনও কখনও শিরা দিয়ে খাদ্য উপাদান সমৃদ্ধ বিশেষ তরল পদার্থ দেওয়ার প্রয়োজনও পড়ে।

২. পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (Peritoneal Dialysis): আগত মাসআলায় এ বিষয়ে আলোচনা করা হবে।

বর্তমান যুগের ওলামায়ে কেরাম হেমো-ডায়ালাইসিস সাওমের বিশুদ্ধতায় প্রভাব ফেলবে কিনা সে বিষয়ে দুই ধরণের বক্তব্য পেশ করেছেন:

প্রথম মত: অধিকাংশ আলেমের মতে, হেমো-ডায়ালাইসিস সাওম নষ্ট করে দিবে। সঊদী আরবের ‘আল-লাজনাহ আদ-দায়েমাহ লিল-বুহূছ আল-ইলমিইয়া ওয়াল-ইফতা’ও এই ফাতওয়া দিয়েছে।

কেননা হেমো-ডায়ালাইসিস করতে গেলে রোগীকে বিভিন্ন ধরণের ঔষধ দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। যেমন, ব্লাড থিনার বা রক্ত পাতলা করার ঔষধ, হরমোন, ভিটামিন, সোডিয়াম ক্লোরাইড, কার্বোহাইড্রেট। নিঃসন্দেহে এসব পদার্থ সাওমে প্রভাব ফেলে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, ডায়ালাইসিস শরীরে পরিচ্ছন্ন রক্ত সমৃদ্ধ করে। আবার কখনও রক্তের পাশাপাশি অন্যান্য খাদ্য উপাদানও যোগান দেয়। এটিও সাওম ভঙ্গ করে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ডায়ালাইসিস করলে একই সাথে দু’টি সাওম ভঙ্গকারী বিষয় যুক্ত হয়।

দ্বিতীয় মত: বর্তমান যুগের কোনো কোনো আলেমের মতে, হেমো-ডায়ালাইসিস সাওম নষ্ট করবে না। কেননা হেমো-ডায়ালাইসিস ইনজেকশনের মতই; এটি খাদ্যও নয়, আবার পানীয়ও নয়, বরং এর মাধ্যমে পেনিটোরিয়াম (Peritoneum) বা পেটের অন্ত্রচ্ছদে ইনজেকশন দেওয়া হয় এবং ক্ষণিক পরে তা আবার বের করে নেওয়া হয়, অথবা ডায়ালাইসিস যন্ত্রের সাহায্যে রক্ত নেওয়া হয় এবং পরিশোধন করে তা আবার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।