hadith book logo

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর সালাত (দরূদ) পড়ার অর্থ, ফযিলত, পদ্ধতি ও স্থানসমূহ

লেখকঃ জাকেরুল্লাহ আবুল খায়ের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের জীবন

এখানে একটি বিষয় জেনে থাকা খুবই জরুরী যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তার জীবন সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কথা সমাজে প্রচলিত রয়েছে। মূলত তার জীবন সম্পর্কে অস্পষ্টতা থাকার কারণ হল, এ সম্পর্কে হাদিস ও কুরআনে আসা নির্দেশনা সম্পর্কে সু-স্পষ্ট জ্ঞান না থাকা এবং এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা হাদিস কুরআনে উল্লেখ না করা। তবে এ ক্ষেত্রে হাদিসে বা কুরআনে যতটুকু বর্ণনা পাওয়া যায়, তার উপর ঈমান আনা ও বিশ্বাস করাই একজন মুমিনের কাজ। সহীহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের কবর থেকে সালাম দাতার উত্তর দিয়ে থাকেন। কবরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শোনা এবং উত্তর প্রদান কিভাবে? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ ব্যাপারে এ কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, ইহজীবন হিসেবে যেভাবে অন্য মানুষের উপর মৃত্যু আসে সেভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরও মৃত্যু এসেছে। কুরআন মজীদের কয়েকটি স্থানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য ‘মৃত্যু’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

﴿ إِنَّكَ مَيِّتٞ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ ٣٠ ﴾ [ الزمر : ٣٠ ]

“হে মুহাম্মদ! আপনিও মৃত্যু বরণ করবেন এবং তারাও (কাফের-মুশরিকরাও) মৃত্যু বরণ করবে”। [সূরা ঝুমার, আয়াত: ৩০] সূরা আলে ইমরানে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿ وَمَا مُحَمَّدٌ إِلَّا رَسُولٞ قَدۡ خَلَتۡ مِن قَبۡلِهِ ٱلرُّسُلُۚ أَفَإِيْن مَّاتَ أَوۡ قُتِلَ ٱنقَلَبۡتُمۡ عَلَىٰٓ أَعۡقَٰبِكُمۡۚ وَمَن يَنقَلِبۡ عَلَىٰ عَقِبَيۡهِ فَلَن يَضُرَّ ٱللَّهَ شَيۡ‍ٔٗاۗ وَسَيَجۡزِي ٱللَّهُ ٱلشَّٰكِرِينَ ١٤٤ ﴾ [ ال عمران : ١٤٤ ]

“আর মুহাম্মদ রাসূল ছাড়া আর কিছু নয়, তাঁর আগেও অনেক রাসূল চলে গেছেন। তা হলে কি তিনি যদি মারা যান কিংবা নিহত হন, তবে তোমরা পশ্চাদপসরণ করবে? বস্তুত: কেউ যদি পশ্চাদপসরণ করে, তবে তাতে আল্লাহর কিছুই ক্ষতি হবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের ছাওয়াব দান করবেন”। [আলে ইমরান: ১৪৪] সূরা আম্বিয়াতে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেছেন,

﴿ وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٖ مِّن قَبۡلِكَ ٱلۡخُلۡدَۖ أَفَإِيْن مِّتَّ فَهُمُ ٱلۡخَٰلِدُونَ ٣٤ ﴾ [ الانبياء : ٣٤ ]

‘আপনার পূর্বেও আমি কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করিনি। সুতরাং আপনার মৃত্যু হলে তারা কি চিরজীবী হবে? [সুরা আম্বিয়া: ৩৪]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন:

«مَنْ كَانَ يَعْبُدُ مُحَمَّداً فَإِنَّ مُحَمَّداً قَدْ مَاتَ»

‘তোমাদের মধ্যে যে কেউ মুহাম্মদের ইবাদত করত তারা যেন জেনে রাখে, তিনি মারা গেছেন।’ [বুখারি, হাদিস: ৩৪৬৭]

কাজেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর তাকে গোসল দেওয়া হয়েছে, কাফন পরানো হয়েছে, জানাযার সালাত আদায় করা হয়েছে এবং কয়েক মন মাটির নীচে কবরে দাফন করা হয়েছে। সুতরাং, এটা একেবারেই নিঃসন্দেহ বলা যায় যে, ইহকালীন জীবন হিসেবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মারা গেছেন। তবে তাঁর বরযখী জীবন, সকল নবী-রাসূল, শহীদ, অলি এবং নেককার লোকদের চেয়ে অনেক অনেক পরিপূর্ণ। বরযখী জীবন সম্পর্কে জেনে রাখা উচিত, এই জীবনটি মৃত্যুর পূর্বে পৃথিবীর জীবনের মতও নয় এবং কিয়ামতের পরের জীবনের মতও নয়। আসলে সেই জীবনের বাস্তবতা কি? তা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। তাই আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,

﴿وَلَا تَقُولُواْ لِمَن يُقۡتَلُ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ أَمۡوَٰتُۢ ۚ بَلۡ أَحۡيَآءٞ وَلَٰكِن لَّا تَشۡعُرُونَ ١٥٤﴾ [ البقرة : ١٥٤ ]

“আর যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয় তাঁদের মৃত বলও না। বরং তারা জীবিত কিন্তু তোমরা তা বুঝ না”। [সূরা বাকারা, আয়াত: ১৫৪] যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা বরযখী জীবন সম্পর্কে অকাট্যভাবে ঘোষণা করে দিলেন যে, বরযখী জীবনের ধরণ সম্পর্কে তোমাদের কোনো বোধ নেই, সেহেতু এ ব্যাপারে আমাদের জন্যেও যুক্তির ঘোড়া দৌড়ানো কোনো ক্রমেই উচিত নয়। এরূপ যুক্তি পেশ করা মোটেও ঠিক হবে না যে, যখন সালামও শুনেন এবং তার উত্তরও দিয়ে থাকেন তাহলে সেই জীবন দুনিয়াবি জীবন থেকে ভিন্ন হবে কেন? অথবা যখন তিনি সালাম শুনেন তাহলে অন্য কথা-বার্তা শুনবেন না কেন? ইত্যাদি। আসলে আমাদের ঈমানের চাহিদা হল, যা কিছু আমাদেরকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তাকে কোনো রকম কমবেশ না করে সম্পূর্ণভাবে মেনে নেওয়া। যে ব্যাপারে চুপ থেকেছেন সে ব্যাপারে খোঁজ-খবর নেওয়ার পরিবর্তে চুপ থাকা। এটাই হল স্বীয় দ্বীন-ঈমান বাঁচানোর নিরাপদ উপায়। অন্যথায় আমরা যদি আমাদের জ্ঞানের বাইরে এবং আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়ে কোনো দিক নির্দেশনা দেননি সে বিষয়ে মাথা ঘামাই তা হলে আমরা পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হব। যারা আল্লাহ ও তার রাসূল যে সব বিষয়গুলো স্পষ্ট করেননি সে সব বিষয়গুলো সম্পর্কে না জেনে মন্তব্য করেন তাদের আল্লাহ তা‘আলা কঠিন হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَلَا تَقۡفُ مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٌۚ إِنَّ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡبَصَرَ وَٱلۡفُؤَادَ كُلُّ أُوْلَٰٓئِكَ كَانَ عَنۡهُ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٦﴾ [ الاسراء : ٣٦ ]

“আর যে বিষয়ে তোমার জানা নেই তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তঃকরণ-এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে”। [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬]

এছাড়াও আল্লাহ রাসূলের নির্দেশিত বিষয়সমূহের প্রতি হুবহু ঈমান না এনে তার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ খুঁজে বেড়ায় এবং যুক্তির ঘোড়া দোড়ায় তাদের বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَأَمَّا ٱلَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمۡ زَيۡغٞ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَٰبَهَ مِنۡهُ ٱبۡتِغَآءَ ٱلۡفِتۡنَةِ وَٱبۡتِغَآءَ تَأۡوِيلِهِۦۖ وَمَا يَعۡلَمُ تَأۡوِيلَهُۥٓ إِلَّا ٱللَّهُۗ وَٱلرَّٰسِخُونَ فِي ٱلۡعِلۡمِ يَقُولُونَ ءَامَنَّا بِهِۦ كُلّٞ مِّنۡ عِندِ رَبِّنَاۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّآ أُوْلُواْ ٱلۡأَلۡبَٰبِ ٧ ﴾ [ ال عمران : ٧ ]

“ফলে যাদের অন্তরে রয়েছে সত্য-বিমুখ প্রবণতা, তারা ফিতনার উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর পেছনে লেগে থাকে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ব, তারা বলে, আমরা এ গুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর বিবেক সম্পন্নরাই উপদেশ গ্রহণ করে”। [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ৭]