১
কাশ্ফুশ্ শুবহাত (সংশয় নিরসন)
লেখকঃ শাইখ মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহ্হাব রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪
তৃতীয় অধ্যায়: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর প্রকৃত তাৎপর্যই হচ্ছে তাওহীদুল ইবাদাহ বা ইবাদতে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা
[লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর প্রকৃত তাৎপর্য হচ্ছে তাওহীদে ইবাদত। বর্তমান যুগে ইসলামের দাবীদারগণের তুলনায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সময়ের কাফেরগণ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু-এর অর্থ বেশী ভাল জানতো। বক্ষমাণ অধ্যায়ে এ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা হচ্ছে।]
কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ ও তাৎপর্য বলতে যা বুঝায় তাই হচেছ তাওহীদে ইবাদত। আর বর্তমান যুগে ইসলামের দাবীদারগণের তুলনায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সময়ের কাফেরগণ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু-এর অর্থ বেশী ভাল জানতো। আর যখন তুমি বল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বা আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, তখন এ তাওহীদই তোমার কথার উদ্দেশ্য। কেননা, তাদের [রাসূলের যুগের আরবের মুশরিকদের নিকট।] নিকট ‘ইলাহ’ হচ্ছেন সেই সত্তা যাকে এ সকল কাজে (বিপদাপদ, নযর নিয়ায, যবেহ, আশ্রয় ইত্যাদিতে) উদ্দেশ্য নেয়া হয়। চাই তা ফেরেশতা, নবী, ওলী, বৃক্ষ, কবর, জিন যা-ই হোক না কেন [অর্থাৎ ফেরেশতা, নবী, ওলী, বৃক্ষ, কবর, জিন যাদেরকেই ঐ সকল কাজে আহ্বান জানানো হয়, তারাই ‘ইলাহ’ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। এটা রাসূলের সময়কার আরবের মুশরিকরা ভালোভাবেই জানত।]। তখনকার কাফেরগণ এ (কালেমা দ্বারা) কখনও এটা উদ্দেশ্য নিত না যে, ইলাহ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা, আহার দাতা, সব কিছুর ব্যাবস্থাপক বা পরিচালক। কেননা কাফেররা এটা জানত এবং স্বীকার করত যে, এই সব গুণাবলী অর্থাৎ সৃষ্টি করা, আহার দান এবং ব্যবস্থাপনা একমাত্র একক আল্লাহর জন্যই সুনির্দিষ্ট, আর কারোরই তা করবার ক্ষমতা নেই (এ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা আমরা পূর্বেই করেছি)। বরং আরবের তৎকালীন [রাসূলের যুগের।] মুশরিকরা “ইলাহ” এর সেই অর্থই বুঝত যা আজ কালের মুশরিকগণ “সাইয়েদ” “মুর্শিদ” ইত্যাদি শব্দ দ্বারা বুঝে থাকে। এ ধরণের বিশ্বাসের সময়ই নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নিকটে কালেমায়ে তাওহীদের আহ্বান নিয়ে আগমন করেছিলেন, সেটা হচ্ছে “লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ”। আর এই কালেমার অর্থই হচ্ছে এর আসল উদ্দেশ্য, শুধুমাত্র এর শব্দগুলি উদ্দেশ্য নয়।
রাসূলের সময়ের অজ্ঞ কাফেররাও এ কথা জানত যে, এই কালেমা থেকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য ছিল: যাবতীয় সৃষ্ট বস্তু থেকে সম্পর্কচ্যুত হয়ে কেবলমাত্র আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরী করা। (কোনো সৃষ্টজীবের ইবাদত থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা) তাঁকে ছেড়ে আর যাকে বা যে বস্তুকে উপাসনা করা হয় তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা এবং তা থেকে বিমুক্ত থাকা। কেননা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা বল: “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”— ‘আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো হক্ক মা‘বুদ নেই’, তখন তারা বলে উঠল,
﴿ أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ ٥ ﴾ [ص: ٥ ]
“এই লোকটি কি বহু উপাস্যকে এক উপাস্যে পরিণত করছে? এ তো ভারী এক আশচর্য্য ব্যাপার !” (সূরা সাদ : ৫)
যখন তুমি জানতে পারলে যে, অজ্ঞ-মূর্খ কাফেরগণও কালেমার অর্থ বুঝে নিয়েছিল, তখন এটা কত বড় আশ্চর্য্যের বিষয় যে, অজ্ঞ-মূর্খ কাফেরগণও কালেমার যে অর্থ বুঝতে পেরেছিল, ইসলামের (বর্তমান) দাবীদারগণ তাও বুঝে উঠতে সক্ষম হচ্ছে না ! বরং এরা মনে করছে কালেমার আক্ষরিক উচ্চারণই যথেষ্ট, তার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে অন্তর দিয়ে প্রত্যয় পোষণ করার প্রয়োজন নেই।
বর্তমানকালের মুসলিম নামধারীদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান (বুদ্ধিজীবী কিংবা দার্শনিক) বলে পরিচিত, তারা এ কালেমার অর্থ করে থাকে যে, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই, কোনো রুযীদাতা নেই এবং একমাত্র তিনিই সব কিছুর পরিচালক, তিনিই সব বিষয়ের ব্যবস্থাপক। (অথচ এ অর্থটি এ কালেমার সঠিক অর্থ নয়) তাহলে এটা সাব্যস্ত হচ্ছে যে এমন মুসলিম নামধারী লোকের মধ্যে কোনো মঙ্গল নেই যার চেয়ে (তৎকালীন আরবের) অজ্ঞ-মূর্খ কাফেরও কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র এর অর্থ বেশী জানত।
কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর অর্থ ও তাৎপর্য বলতে যা বুঝায় তাই হচেছ তাওহীদে ইবাদত। আর বর্তমান যুগে ইসলামের দাবীদারগণের তুলনায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সময়ের কাফেরগণ লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু-এর অর্থ বেশী ভাল জানতো। আর যখন তুমি বল, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বা আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই, তখন এ তাওহীদই তোমার কথার উদ্দেশ্য। কেননা, তাদের [রাসূলের যুগের আরবের মুশরিকদের নিকট।] নিকট ‘ইলাহ’ হচ্ছেন সেই সত্তা যাকে এ সকল কাজে (বিপদাপদ, নযর নিয়ায, যবেহ, আশ্রয় ইত্যাদিতে) উদ্দেশ্য নেয়া হয়। চাই তা ফেরেশতা, নবী, ওলী, বৃক্ষ, কবর, জিন যা-ই হোক না কেন [অর্থাৎ ফেরেশতা, নবী, ওলী, বৃক্ষ, কবর, জিন যাদেরকেই ঐ সকল কাজে আহ্বান জানানো হয়, তারাই ‘ইলাহ’ হিসেবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। এটা রাসূলের সময়কার আরবের মুশরিকরা ভালোভাবেই জানত।]। তখনকার কাফেরগণ এ (কালেমা দ্বারা) কখনও এটা উদ্দেশ্য নিত না যে, ইলাহ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা, আহার দাতা, সব কিছুর ব্যাবস্থাপক বা পরিচালক। কেননা কাফেররা এটা জানত এবং স্বীকার করত যে, এই সব গুণাবলী অর্থাৎ সৃষ্টি করা, আহার দান এবং ব্যবস্থাপনা একমাত্র একক আল্লাহর জন্যই সুনির্দিষ্ট, আর কারোরই তা করবার ক্ষমতা নেই (এ সম্পর্কে বিশদ আলোচনা আমরা পূর্বেই করেছি)। বরং আরবের তৎকালীন [রাসূলের যুগের।] মুশরিকরা “ইলাহ” এর সেই অর্থই বুঝত যা আজ কালের মুশরিকগণ “সাইয়েদ” “মুর্শিদ” ইত্যাদি শব্দ দ্বারা বুঝে থাকে। এ ধরণের বিশ্বাসের সময়ই নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নিকটে কালেমায়ে তাওহীদের আহ্বান নিয়ে আগমন করেছিলেন, সেটা হচ্ছে “লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ”। আর এই কালেমার অর্থই হচ্ছে এর আসল উদ্দেশ্য, শুধুমাত্র এর শব্দগুলি উদ্দেশ্য নয়।
রাসূলের সময়ের অজ্ঞ কাফেররাও এ কথা জানত যে, এই কালেমা থেকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উদ্দেশ্য ছিল: যাবতীয় সৃষ্ট বস্তু থেকে সম্পর্কচ্যুত হয়ে কেবলমাত্র আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরী করা। (কোনো সৃষ্টজীবের ইবাদত থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করা) তাঁকে ছেড়ে আর যাকে বা যে বস্তুকে উপাসনা করা হয় তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা এবং তা থেকে বিমুক্ত থাকা। কেননা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফেরদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা বল: “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ”— ‘আল্লাহ্ ব্যতীত কোনো হক্ক মা‘বুদ নেই’, তখন তারা বলে উঠল,
﴿ أَجَعَلَ ٱلۡأٓلِهَةَ إِلَٰهٗا وَٰحِدًاۖ إِنَّ هَٰذَا لَشَيۡءٌ عُجَابٞ ٥ ﴾ [ص: ٥ ]
“এই লোকটি কি বহু উপাস্যকে এক উপাস্যে পরিণত করছে? এ তো ভারী এক আশচর্য্য ব্যাপার !” (সূরা সাদ : ৫)
যখন তুমি জানতে পারলে যে, অজ্ঞ-মূর্খ কাফেরগণও কালেমার অর্থ বুঝে নিয়েছিল, তখন এটা কত বড় আশ্চর্য্যের বিষয় যে, অজ্ঞ-মূর্খ কাফেরগণও কালেমার যে অর্থ বুঝতে পেরেছিল, ইসলামের (বর্তমান) দাবীদারগণ তাও বুঝে উঠতে সক্ষম হচ্ছে না ! বরং এরা মনে করছে কালেমার আক্ষরিক উচ্চারণই যথেষ্ট, তার প্রকৃত অর্থ ও তাৎপর্য উপলব্ধি করে অন্তর দিয়ে প্রত্যয় পোষণ করার প্রয়োজন নেই।
বর্তমানকালের মুসলিম নামধারীদের মধ্যে যারা বুদ্ধিমান (বুদ্ধিজীবী কিংবা দার্শনিক) বলে পরিচিত, তারা এ কালেমার অর্থ করে থাকে যে, এর অর্থ হচ্ছে আল্লাহ ছাড়া কোনো সৃষ্টিকর্তা নেই, কোনো রুযীদাতা নেই এবং একমাত্র তিনিই সব কিছুর পরিচালক, তিনিই সব বিষয়ের ব্যবস্থাপক। (অথচ এ অর্থটি এ কালেমার সঠিক অর্থ নয়) তাহলে এটা সাব্যস্ত হচ্ছে যে এমন মুসলিম নামধারী লোকের মধ্যে কোনো মঙ্গল নেই যার চেয়ে (তৎকালীন আরবের) অজ্ঞ-মূর্খ কাফেরও কালেমা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’র এর অর্থ বেশী জানত।