hadith book logo

প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য যা জানা একান্ত কর্তব্য

লেখকঃ শাইখ আব্দুল্লাহ ইবন ইবরাহীম আল-কার‘আওয়ী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

তাওহীদের বিপরীত হলো শির্ক

(একত্ববাদের বিপরীতে অংশীদারিত্ব)

শির্ক তিন প্রকার: ১। বড় শির্ক, ২। ছোট শির্ক, ৩। গোপন শির্ক।

১। বড় শির্ক: যা আল্লাহ কখনো ক্ষমা করবেন না। এ শির্ক এর সাথে অনুষ্ঠিত কোনো সৎকাজ আল্লাহ তা‘আলা কবুল করেন না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ ضَلَّ ضَلَٰلَۢا بَعِيدًا ١١٦﴾ [ النساء : ١١٦ ]

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করবেন না, তবে শির্ক ব্যতীত (শির্কের চেয়ে নিচু পর্যায়ের) যত গুনাহ আছে তা তিনি যাকে ইচ্ছা করেন ক্ষমা করে দেবেন। আর যে আল্লাহর সাথে শির্ক করলো সে পথভ্রষ্টতায় অনেকদূর এগিয়ে গেল (বেশী বিপথগামী হলো)।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১১৬]

তিনি আরও বলেন:

﴿لَقَدۡ كَفَرَ ٱلَّذِينَ قَالُوٓاْ إِنَّ ٱللَّهَ هُوَ ٱلۡمَسِيحُ ٱبۡنُ مَرۡيَمَۖ وَقَالَ ٱلۡمَسِيحُ يَٰبَنِيٓ إِسۡرَٰٓءِيلَ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمۡۖ إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ ٧٢﴾ [ المائ‍دة : ٧٢ ]

“অথচ মসীহ (ঈসা আলাইহিস সালাম) বলেছেন: হে ইসরাঈলের বংশধরগণ! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, যিনি আমার প্রভু, তোমাদের প্রভু, নিশ্চয় যদি কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করে পরিণামে আল্লাহ তার ওপর জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন, তার আস্তানা হবে জাহান্নাম, আর অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই”। [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৭২]

তিনি আরও বলেন:

﴿وَقَدِمۡنَآ إِلَىٰ مَا عَمِلُواْ مِنۡ عَمَلٖ فَجَعَلۡنَٰهُ هَبَآءٗ مَّنثُورًا ٢٣﴾ [ الفرقان : ٢٢ ]

“আর আমি তারা যা আমল করেছে সেগুলোর দিকে ধাবিত হয়ে সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় রূপান্তরিত করে দিয়েছি”। [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ২৩]

তিনি আরও বলেন:

﴿لَئِنۡ أَشۡرَكۡتَ لَيَحۡبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ ٱلۡخَٰسِرِينَ﴾ [ الزمر : ٦٥ ]

“আপনি যদি শির্ক করেন তবে অবশ্যই আপনার আমলকে নষ্ট করে দেব এবং নিশ্চয় আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৫]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَلَوۡ أَشۡرَكُواْ لَحَبِطَ عَنۡهُم مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ﴾ [ الانعام : ٨٨ ]

“যদি তারা শির্ক করে তবে অবশ্যই তারা যা আমল করেছে তা নষ্ট হয়ে যাবে।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৮৮]

বড় শির্ক-এর প্রকারাদি

বড় শির্ক চার প্রকার:

এক: দো‘আয় শির্ক করা: এর দলীল আল্লাহর বাণী:

﴿فَإِذَا رَكِبُواْ فِي ٱلۡفُلۡكِ دَعَوُاْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ فَلَمَّا نَجَّىٰهُمۡ إِلَى ٱلۡبَرِّ إِذَا هُمۡ يُشۡرِكُونَ ٦٥﴾ [ العنكبوت : ٦٥ ]

“অতঃপর যখন তারা নৌকায় চড়ে তখন দীনকে নিষ্ঠা সহকারে একমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করে তাঁকে ডাকতে থাকে কিন্তু যখন তিনি তাদেরকে ডাঙ্গায় নিয়ে পরিত্রাণ দেন তখনই তারা তার সাথে শির্ক (অংশীদার) করে।” [সূরা আল-‘আনকাবূত, আয়াত: ৬৫]

দুই: নিয়্যাত ও সংকল্পে শির্ক করা : এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী:

﴿مَن كَانَ يُرِيدُ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيۡهِمۡ أَعۡمَٰلَهُمۡ فِيهَا وَهُمۡ فِيهَا لَا يُبۡخَسُونَ ١٥ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَيۡسَ لَهُمۡ فِي ٱلۡأٓخِرَةِ إِلَّا ٱلنَّارُۖ وَحَبِطَ مَا صَنَعُواْ فِيهَا وَبَٰطِلٞ مَّا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ١٦﴾ [ هود : ١٥، ١٦ ]

“যারা পার্থিব জীবন ও তার চাকচিক্য পেতে চায় আমি তাদেরকে তাদের কার্যাদির প্রতিফল তাতেই (পার্থিব জীবনেই) পরিপূর্ণভাবে দিয়ে দেব, তাদের এতে কম দেওয়া হবেনা, তাদের জন্য পরকালে জাহান্নাম ছাড়া আর কিছুই থাকবে না, তারা দুনিয়ায় যা করেছে তা নষ্ট হয়ে গেছে, আর যে সমস্ত (নেক) কার্যাদি তারা করেছে তা বাতিল হয়ে যাবে।” [সূরা হূদ, আয়াত: ১৫-১৬]

তিন: আদেশ, নিষেধ প্রতিপালন বা বশ্যতায় শির্ক করা: এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী:

﴿ٱتَّخَذُوٓاْ أَحۡبَارَهُمۡ وَرُهۡبَٰنَهُمۡ أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِ وَٱلۡمَسِيحَ ٱبۡنَ مَرۡيَمَ وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُوٓاْ إِلَٰهٗا وَٰحِدٗاۖ لَّآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَۚ سُبۡحَٰنَهُۥ عَمَّا يُشۡرِكُونَ ٣١﴾ [ التوبة : ٣١ ]

“তারা আল্লাহ ছাড়া তাদের ‘আরবাব’ তথা আলিম, ‘আহবার’ তথা আবিদদের (পীর-দরবেশদের)-কে তাদের জন্য হালাল হারামকারী বানিয়ে নিয়েছে এবং মারইয়াম পুত্র মসীহকেও, অথচ তাদেরকে শুধু এক মা‘বুদ-এর ইবাদত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি ব্যতীত আর কোনো হক মা‘বুদ নেই। তার সাথে যাদের শরীক করছে তাদের থেকে তিনি কতইনা পবিত্র!” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৩১]

“আরবাব” শব্দের তাফসীর বা ব্যাখ্যা হলো আলেমদেরকে পাপ কাজে অনুসরণ করা, এর অর্থ তাদেরকে ডাকা নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রখ্যাত সাহাবী ‘আদি ইবন হাতিম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর প্রশ্নের উত্তরে এ প্রকার ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি যখন বললেন: আমরা তাদের ইবাদত (উপাসনা) করি না, উত্তরে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তাদের উপাসনা হলো পাপ কাজে তাদের আদেশ নিষেধ মান্য করা।” [সুনান তিরমিযি, হাদীস নং ৩০৯৪। হাদীসটি হাসান।]

চার: ভালোবাসায় শির্ক করা: এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী:

﴿وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادٗا يُحِبُّونَهُمۡ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ﴾ [ البقرة : ١٦٥ ]

“আর মানুষের মাঝে এমনও আছে যারা আল্লাহ ছাড়া তার অনেক সমকক্ষ (সমপর্যায়ের ভালোবাসা পাওয়ার অধিকারী, ভালোবাসার পাত্র) নির্ধারণ করে সেগুলোকে আল্লাহর ন্যায় ভালোবাসে, অথচ যারা ইমানদার তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালোবাসে।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৬৫]

২। ছোট শির্ক: আর তা হলো (সামান্য) লোক দেখানোর নিয়তে নেক কাজ করা।

এর প্রমাণ আল্লাহর বাণী:

﴿فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا﴾ [ الكهف : ١١٠ ]

“সুতরাং যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের আশা রাখে সে যেন নেক কাজ করে এবং তাঁর প্রভুর ইবাদতের সাথে অন্য কাউকে শরীক না করে।” [সূরা আল-কাহাফ, আয়াত: ১১০]

৩। গোপন (সূক্ষ্ম) শির্ক: এর প্রমাণ হলো রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী:

«الشرك في هذه الأمة أخفى من دبيب النملة السوداء على صفاة سوداء في ظلمة الليل» .

“এ (মুসলিম) জাতির মধ্যে শির্ক অন্ধকার রাত্রিতে কালো পাথরের উপর কালো পিপড়ার বেয়ে উঠার মতোই সূক্ষ্ম বা গোপন।” [হাদীসটি ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে। সনদটি হাসান।]

শির্ক থেকে বাঁচার দো‘আ:

নিম্নের দো‘আ (অর্থ বুঝে বিশ্বাস-সহকারে) পাঠ করলে শির্ক গুনাহের কাফফারা হয়ে থাকে।

«اللَّهُمَّ إنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ شَيْئاً وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ مِنَ الذَّنْبِ الَّذِيْ لا أَعْلَمُ» .

“হে আল্লাহ আমি জেনে-শুনে তোমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, আর আমার অজ্ঞাত গুনাহরাজি থেকে আমি ক্ষমা চাচ্ছি।” [হাদীসটি ইমাম আহমাদ তার মুসনাদে (১/৭৬) বিশুদ্ধ সনদে বর্ণনা করেছেন।]