hadith book logo

সহজ হজ্জ ও ওমরাহ্‌ নির্দেশিকা

লেখকঃ শাইখ আখতারুল আমান • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

ঈদুল আযহার কতিপয় বিধান ও উহার সংবিধিবদ্ধ কারণঃ

আল্লাহ তাআলা কুরবানীকে সংবিধিবদ্ধ করেছেন তার এই বাণী দিয়েঃ فصل لربك وانحر অর্থ: ঞ্ছতুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য ছালাত আদায় কর এবং ক্বুরবানী কর।ঞ্জ (আল কাওসারঃ২) এবং এ বাণী দিয়ে: والبدن جعلناها لكم من شعائر الله ঞ্ছআর কুরবানীর পশুকে আমি করেছি তোমাদের জন্য আল্লাহর নিদর্শনাবলীর মধ্যে অন্যতমঞ্জ। (সূরা হজ্জঃ৩৬)

* কুরবানী দেয়া সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ। সামর্থ থাকার পরেও উহা পরিত্যাগ করা মাকরূহ। কারণ ইমাম বুখারী ও মুসলিম আনাস (রাযিয়াআল্লাহ আনহু) হতে বর্ণনা করছেন, ঞ্ছনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুটি চিত ফুটে ও শিং ওয়ালা ভেড়া কুরবানী দিয়েছেন। জ্ঞবিসমিল্লাহি আল্লাহ আকবারঞ্চ বলে নিজ হাতে সে দুটিকে যবেহ করেছিলেন।ঞ্জ

* কোন ধরণের পশু দিয়ে কুরবানী হবে?

কুরবানী শুধু মাত্র উট, গরু ও ছাগল (ভেড়া-দুম্বা)দিয়েই শুদ্ধ হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

ليذكروا اسم الله علي ما رزقهم من بهيمة الأنعام

ঞ্ছযাতে করে আল্লাহ তাদেরকে যে চতুস্পদ জন্তু দিয়েছেন তা যবেহ করার সময় তার উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।ঞ্জ (সূরা হজ্জঃ৩৬)

কুরআনীর পশুর শর্ত হল, তা সব ধরণের দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত হওয়া। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলা্‌ইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ঞ্ছচার ধরণের পশু কুরবানীতে চলবে না, সুস্পষ্ট অন্ধ, সুস্পষ্ট ব্যাধি গ্রস্থ, সুস্পষ্ট খোঁড়া, সুস্পষ্ট স্বাস্থহীন (পাতলা)।ঞ্জ (তিরমিযী

ভাগে কুরবানীঃ

গরুতে সাত জন এবং উটে দশ জন শরীক হওয়া জায়েয আছে। (সুনান গ্রন্থ) (সুনান গ্রন্থ) অবশ্য ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, খাশিতে এভাবে শরীক হওয়া চলেনা। তবে গোটা পরিবারের পক্ষ থেকে একটি পশুই (গরু, ছাগল, দুম্বা ভেড়া যাই হোক না কেন) যথেষ্ট। (মুসলিম, তিরমীযী প্রভৃতি।)

যবহে করার সময়ঃ

ঈদরে নামাযের পর থেকেই যবহে করার সময় শুরু হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলছেনে: যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতরে পূর্বে যবেহ করবে সেটা তার নিজের জন্যই যবহে করবে, আর যে ছালাত ও খুৎবার পর যবহে করবে সে তার কুরবানী ঠিকমত সম্পন্ন করবে এবং সুন্নাতরে পাবন্দ করবে।ঞ্চ (বুখারী ও মুসলমি)

যে ব্যক্তি ভালভাবে যবেহ করতে জানে তার জন্য সুন্নাত হল, কুরবানীর পশু নিজ হাতে যবহে করা। যবহে কালীন এ দুআ বলবেঃ بسم الله والله أكبر، اللهم هذا عن فلان অর্থঃ আল্লাহর নাম শুরু করছি হে আল্লাহ! ইহা উমুকরে পক্ষ থেকে (এখান সে নিজের নাম অথবা যে তাকে অছীয়ত করছে তার নাম উল্লখে করতে পারে।) কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটি ভেড়া যবহে করত যেয়ে বলেছেলিনে: জ্ঞবিসমিল্লাহে ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহুম্মা হাযা আন্নী ওয়া মান লাম য়ুযাহহী মিন উম্মাতী।ঞ্চ (আবুদাউদ, তিরমিযী) আর যে ব্যক্তি ভালভাব যবেহ করতে জানেনা সে যবেহ কালিন উপসি'ত থাকবে।

* মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানীঃ

মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে ক্বুরবানী তিনভাগে বিভক্ত:

১) পরক্ষ ভাবে মৃত ব্যক্তিদের পক্ষ হতে ক্বুরবানী করাঃ যেমন, কোন ব্যক্তি ক্বুরবানী দিল নিজের পক্ষ থেকে ও তার পরিবার পরিজনের পক্ষ থেকে এবং নিয়াতে পরিবারর জীবিত, মৃত সকলকে শামিল করবে। (ইহা বৈধ)এর মূল হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিজ ও স্বীয় পরিবারের পক্ষ থেকে ক্বুরবানী।

২) মৃতদের পক্ষ থেকে ক্বরবানী করার ওছিয়ত করা হলে তাদের পক্ষ থেকে ক্বুরবানী করা। ইহা জায়েয আছে। (দ্রঃ বাক্বারা: ১৮১)

৩) মৃতদের পক্ষ থেকে সতন্ত্র ভাবে ছাদকা স্বরূপ ক্বুরবানী করা। ইহা বিতর্কিত বিষয়। আল্লামা ইবনু উসাইমীন এধরণের ক্বুরবানী বৈধ বলেছেন। তবে এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) থেকে কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না যে, নিকটাত্মীয় কোন মৃত ব্যক্তির নামে তাঁরা কখনো কুরবানী করেছেন। অথচ তাঁদের সবারই সন্তান, স্ত্রীসহ অনেক নিকাটাত্মীয় ছিল এবং তাঁদের অনেকে আগেই মৃত্যু বরণ করেন। কিন' তাদের করো নামে তাঁরা কুরবানী করেন নি।

* কুরবানীর মাংস বন্টনঃ

কুরবানী দাতার জন্য সুন্নাত হল, কুরবানীর মাংস ভক্ষণ করা, পরিবার পরিজন ও প্রতিবেশীকে হাদিয়া দেয়া, ফকীর-মিসকীনদেরকে ছাদকা করা। মহান আল্লাহ বলেনঃ ( فَكُلوُا منها وأطعموا البائس الفقير ) জ্ঞতোমরা উহার মাংস ভক্ষণ করবে এবং বিপন্ন অভাব গ্রস'দিগকে খেতে দিবে।ঞ্চ (সূরা হজ্জঃ২৮)

মহান আল্লাহ বলেন: ( فَكُلوُا منها وأطعموا القانع والمعتر ) জ্ঞতোমরা নিজে কুরবানীর মাংস ভক্ষণ করবে এবং যে যাচ্ঞা করে তাকে ও যারা যাঞ্চা কারে না তাকেও খাওয়াবে।ঞ্চ (সূরা হজ্জঃ৩৬)

কতিপয় সালাফে ছালেহীন কুরবানীর মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করা পছন্দ করতেন, একভাগ নিজের জন্য রাখতেন, আরেক ভাগ ধনীদের জন্য হাদিয়া স্বরূপ দিতেন এবং অপরভাগ ফক্বীরদেরকে ছাদকাহ করতেন। বিনিময় স্বরূপ কসাইকে তারা কিছুই দান করতেন না। তবে কুরবানীর মাংসকে তিন ভাগে ভাগ করাটা আবশ্যক নয়।

অনেকের ধারণা কুরবানীর মাংস তিন দিনের বেশী রাখা ও খাওয়া জায়েয নয়। এটি একটি ভূল ধারণা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে প্রমাণিত আছে, তিনি বলেনঃ জ্ঞকিছু সংখ্যক অভাবী লোকের আগমনের কারণে ইতি পূর্বে আমি তোমাদেরকে কুরবানীর মাংস তিন দিনের বেশী রাখতে নিষেধ করেছিলাম। এখন তোমরা উহা ইচ্ছামত খাও, জমা রাখ এবং ছাদকা কর।ঞ্চ (মুসলিম প্রভৃতি)

* যে ব্যক্তি কুরবানী দিবে তার জন্য যা থেকে বিরত থাকা উচিতঃ

যে ব্যক্তি কুরবানী দিতে ইচ্ছুক তার জন্য যুলহজ্জ মাসের চাঁদ উঠার পর কুরবানী করা পর্যন- চুল, নখ, চামড়া ইত্যাদি কাটা হারাম। উম্মু সালামা হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরশাদ করেছেন: জ্ঞযদি যিলহজ্জের প্রথম দশ তারিখ প্রবেশ করে এবং তোমাদের কেউ ক্বুরবানী দিতে ইচ্ছা করে তবে সে যেন নখ ও চুল কাটা হতে বিরত থাকে।ঞ্চ (আহমাদ, মুসলিম) অন্য বর্ণনায় এসেছে, তাহলে সে যেন তার চুল ও চামড়ার কোন কিছুই কর্তন না করে। আর যদি যুলহজ্জের প্রথম দশক শুরু হওয়ার পর ক্বুরবানী দেয়ার নিয়ত করে, তবে ঐ সময় থেকেই চুল, নখ ইত্যাদি কাটা থেকে বিরত হবে। নিয়তের পূর্বে কোন কিছু কাটলে কোন পাপ হবে না।

কুরবানী দাতার পরিবারের জন্য যিলহজ্জের প্রথম দশকে নখ, চুল ইত্যাদি কাটা অবৈধ নয়। কুরবানী দিতে ইচ্ছুক ব্যক্তি এই দশ দিনের মধ্যে চুল, নখ, চামড়া হতে কিছু কর্তন করে ফেললে তাকে তাওবা করতে হবে, এবং এর পুণারাবৃত্তি করবে না। তবে এজন্য তাকে কাফফারা দিতে হবে না এবং ইহা তার কুরবানীতে কোন বাধা সৃষ্টি করবে না। অবশ্য যদি সে উহা ভুল অথবা অজ্ঞতা বশত: করে থাকে কিম্বা অনিচ্ছায় চুল পড়ে যায় তবে তার কোন গুনাহ হবে না। যদি কোন প্রয়োজন দেখা দেয় যেমন: নখ ভেঙ্গে কষ্ট হওয়ার কারণে তা তুলে ফেরতে হয়, কিংবা দু চোখের উপর চুল বড় হয়ে যাওয়ার কারণে তা কাটা আবশ্যক হয়ে যায়, অথবা ক্ষতস্থান প্রভৃতিতে ঔষধ দেয়ার জন্য চুল কাটতে হয় তবে সে এসব কারণে তা করতে পারে, এতে কোন গুনাহ হবে না।

* পরিশেষেঃ

হে মুসলিম ভ্রাতা! আপনি নেকী এবং কল্যাণ মুখী কাজ তথা: আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায়, নিকটাত্মীয়দেরকে যিয়ারত করা, পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ, তাচ্ছিল্য প্রদর্শন ইত্যাদি পরিত্যাগ করত: উহা থেকে অন-রকে পবিত্র রাখা। ফকীর, মিসকীন, এতীমদের প্রতি দয়া প্রদর্শন। তাদেরকে সহযোগিতা করা, তাদের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো -ইত্যাদি কাজ করার প্রতি অনুপ্রাণিত হতে ভুলবেন না।

আল্লাহর কাছে কামনা, তিনি যেন আমাদেরকে তাওফীক দেন এমন কাজ সম্পাদনের যা তিনি ভালবাসেন ও তাতে সন্তোষ থাকেন। আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সমস্থ ছাহাবীদের প্রতি রহমত ও শান্তির ধারা বর্ষণ করুন।