hadith book logo

হজ্জের মর্মার্থ ও শিক্ষা

লেখকঃ ড. মোহাম্মদ মানজুরে ইলাহী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

প্রথমতঃ মহান আল্লাহর দেয়া শরীয়তের প্রতি নিরংকুশ সমর্থন ও আত্মসমর্পণ

আমাদের বুদ্ধি-বিবেক, চিন্তা-চেতনা ও আমলকে আল্লাহমুখী করা ও আল্লাহর নিরংকুশ আনুগত্যে সমৃদ্ধ করা আমাদের ঈমানী চেতনার এক অনিবার্য দাবী। এদিকেই ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ রাববুল আলামীন ঘোষণা করেন,

﴿ فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا ٦٥ ﴾ [ النساء : ٦٥ ]

‘‘তোমার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তারা তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করবে, তারপর তুমি যে ফয়সালা দেবে সে ব্যাপারে নিজেদের অন্তরে কোন দ্বিধা অনুভব করবে না এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেবে।’’ [সূরা আন্-নিসা : ৬৫]

দ্বিধাহীন আনুগত্যের সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ হল হজ্জ। পবিত্র স্থানসমূহের মধ্যে হাজীদের বিচরণ, বায়তুল্লায় তাদের তাওয়াফ, হাজারে আসওয়াদে চুম্বন ও জামারাতে কংকর নিক্ষেপ ইত্যাদিসহ হজ্জের সকল কর্মকান্ডেই সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে শরীয়তের প্রতি প্রবল আনুগত্য, আত্মসমর্পণ ও সর্বান্তকরণে শরীয়তের সকল বিধি-বিধান মেনে নেয়ার জীবন্ত উদাহরণ।

হজ্জের এ পবিত্র ভূমিতে এসেই আল্লাহর নবী ইবরাহীম ও ইসমাঈল আ. তাদের নিজেদের জন্য ও অনাগত প্রজন্মের সন্তানদের জন্য অনুগত মুসলিম হওয়ার দো‘আ করেছিলেন এভাবে,

﴿رَبَّنَا وَٱجۡعَلۡنَا مُسۡلِمَيۡنِ لَكَ وَمِن ذُرِّيَّتِنَآ أُمَّةٗ مُّسۡلِمَةٗ لَّكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبۡ عَلَيۡنَآۖ إِنَّكَ أَنتَ ٱلتَّوَّابُ ٱلرَّحِيمُ ١٢٨ ﴾ [ البقرة : ١٢٨ ]

‘‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে আপনার অনুগত করুন এবং আমাদের বংশধরদের মধ্য থেকে আপনার অনুগত জাতি বানান। আর আমাদেরকে আমাদের ইবাদাতের বিধি-বিধান দেখিয়ে দিন এবং আমাদেরকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয় আপনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু।’’ [সুরা আল-বাকারাহ : ১২৮]

হজ্জের সেই পবিত্রভূমিসমূহে আজো তাই সম্মানিত হাজীগণের আগমন ঘটে নিরংকুশ আনুগত্যের সে মহড়া দেয়ার জন্যই। আমীরুল মুমিনীন উমার ইবনুল খাত্তাব রা. হাজারে আসওয়াদকে চুম্বন দিতে গিয়ে এ দৃষ্টিভঙ্গিরই সার্থক প্রতিধ্বনি করেছেন এ কথা বলে যে,

«إِنِّي أَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ لَا تَضُرُّ وَلَا تَنْفَعُ وَلَوْلَا أَنِّي رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُقَبِّلُكَ مَا قَبَّلْتُكَ»

‘‘নিশ্চয়ই আমি জানি তুমি একটি পাথর, তুমি কোন ক্ষতি করতে পার না এবং কোন উপকারও করতে পার না, রাসূল সা. তোমাকে চুম্বন করেছেন - এটা যদি আমি না দেখতাম, তাহলে তোমাকে চুম্বন করতাম না।’’ [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪৯৪]

হাফিয ইবন হাজার রাহেমাহুল্লাহ বলেন, ‘‘উমার রা. এর এ উক্তির মধ্য দিয়ে দ্বীনী ব্যাপারে শরীয়তের দ্বিধাহীন আনুগত্য এবং মর্ম ও নিগুঢ় তত্ত্ব বোধগম্য হচ্ছে না এমন বিষয়ে শরীয়তের সুন্দর অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হল। রাসূল সা. যা করেছেন যদি তার অন্তর্নিহিত মর্ম ও হিকমাত বোঝা নাও যায় তবু তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণের অপরিহার্যতার ক্ষেত্রে এটাই হচ্ছে শরীয়তের মহান মূলনীতি।’’ [ফাতহুল বারী ৩/৪৬৩]

ইমাম ইবনুল কাইয়েম রাহেমাহুল্লাহু বলেন, ‘‘আল্লাহর ইবাদাত ও গোলামী এবং তাঁর প্রতি, তাঁর গ্রন্থসমূহ ও রাসূলগণের প্রতি ঈমানের ভিত্তি হল তা দ্বিধাহীনভাবে মেনে নেয়া এবং শরীয়তের আদেশ-নিষেধ ও বিধি-বিধানের হিকমাত বিষয়ে সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম প্রশ্ন উত্থাপন না করা। এজন্য যে নবীর উম্মাত তাঁকে সত্যায়ন করেছে এবং তাঁর আনীত সত্য বিধানের প্রতি ঈমান এনেছে সে নবীর উম্মাতের বিষয়ে আল্লাহ সুবহানাহু একথা বলেননি যে, তারা আদেশ, নিষেধ ও প্রচারিত সত্যের বিস্তারিত হিকমাত ও যৌক্তিকতা তুলে তাঁকে প্রশ্নবানে বিদ্ধ করেছে; বরং তারা আনুগত্য পোষণ করেছে, মেনে নিয়েছে, ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে এবং যে হিকমাতসমূহ জানার মত তা জেনেছে আর যেগুলো গোপন ও অজানা থেকে গেছে সেগুলো জেনে নেয়ার উপর নির্ভর করে তাদের ঈমান, আনুগত্য ও আত্মসমর্পণ স্থগিত হয়ে যায়নি।..... যেমন ইঞ্জিলে বলা হয়েছে, ‘‘ হে বনী ইসরাঈল, তোমরা বলো না : কেন আমাদের রব এ নির্দেশ দিয়েছেন? বরং তোমরা বল, আমাদের রব কি নির্দেশ দিয়েছেন?’’ এজন্যই এ মুসলিম উম্মাহ বুদ্ধি, বিবেক ও জ্ঞানে সবচেয়ে বেশী পরিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ, তাদের নবীকে তারা জিজ্ঞাসা করেনি, কেন আল্লাহ এ নির্দেশ দিয়েছেন? আর কেন ওটা থেকে নিষেধ করেছেন? কারণ তারা জানে, এ প্রশ্ন ঈমান ও আত্মসমর্পণ বিরোধী এবং ইসলামের বৈশিষ্ট্যই হল শুধু মেনে নেয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত।’’ [আস-সাওয়া‘য়ে ‌‌ ক আল-মুরসালা ৪/১৫৬০-১৫৬১]