hadith book logo

নবীর সুন্নতকে আঁকড়ে ধরা ও তার প্রভাব

লেখকঃ শাইখ মুহাম্মদ সালিহ আল-‘উসাইমীন রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৯

দশম প্রশ্ন: কতিপয় বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম বলেন যে, কুরআনের মাজায না থাকার সবচেয়ে বড় দলিল হলো: মাজাযের নফী করা জায়েয। কিন্তু কুরআনে এমন কিছু নাই যা নফী করা যায়।

আমার কাছে আর একটি বিষয় খটকা লাগে যে, কুরআনে অনেক খবর বা সংবাদ আছে, আর খবর বলা হয় যার বাহককে সত্যবাদি বা মিথ্যাবাদি বলা যায়। অথচ কুরআনে এমন কিছু নেই যা মিথ্যা প্রতিপন্ন করা যায়। দয়া করে জানাবেন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

জবাব: খবরের ব্যাখ্যায় উলামা কিরামদের কথার অর্থ হলো: সংবাদদাতাকে একথা বলা যাবে যে, সে সত্যবাদি বা মিথ্যাবাদি, তাদের কথার উদ্দেশ্য হলো, খবরদাতার দিকে না তাকিয়ে স্বয়ং খবরটা। অর্থাৎ সংবাদদাতার দিকে বিবেচনা না করে শুধু সংবাদকে বিবেচনা করেই তা বলা হয়ে থাকে। অর্থাৎ খবরপ্রদানকারীর ব্যাপারে এটা বলা যাবে না যে, সে সত্যবাদি কিংবা মিথ্যাবাদি। সংবাদের দিক থেকে; এর সংবাদদাতার হিসেবে নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আল্লাহ তা‘আলা প্রদত্ত খবরের ক্ষেত্রে এ কথা বলা যাবে না যে, এতে মিথ্যার সম্ভাবনা রয়েছে। অপরদিকে মুসাইলামাতুল কাযযাব, যে নিজেকে নবী দাবী করেছিল তাঁর কথাকে বলা যাবে না যে, এতে সত্যের সম্ভাবনা রয়েছে।

আর কুরআনে বা অন্য ক্ষেত্রে মাজাযের ব্যাপারে বলব: এটা আলেমগণের মতানৈক্যের স্থান। এ ব্যাপারে তাদের অনেক মতবিরোধ আছে। তবে আমাদের একথা জানা উচিত যে, শব্দের নানা অর্থ আছে। সিয়াক্ব তথা কথার পূর্বাপর ধরণই অর্থ নির্ধারণ করে। একটি শব্দ এক স্থানে এক অর্থ প্রদান করে, কিন্তু সেটি আবার পূর্বাপর ধরণের কারণে অন্যত্র আরেক অর্থ প্রদান করে।

যখন আমরা বলব: এটা শব্দের হাক্বিকত তথা মূল অর্থ, তখন আমাদের অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। কেননা কুরআনে বর্ণিত ٱلۡقَرۡيَةِۖ আল-ক্বারইয়া শব্দটি গ্রামের অধিবাসী ও জনপদ দু অর্থেই ব্যবহৃত হয়। অতএব, আল্লাহর বাণী:

﴿ إِنَّا مُهۡلِكُوٓاْ أَهۡلِ هَٰذِهِ ٱلۡقَرۡيَةِۖ ٣١ ﴾ [ العنكبوت : ٣١ ]

“নিশ্চয় আমরা এ জনপদের অধিবাসীদেরকে ধ্বংস করব”, [সূরা ‘আনকাবূত: ৩১] এখানে ٱلۡقَرۡيَةِۖ দ্বারা জনপদকে বুঝানো হয়েছে। আবার কুরআনে আরেক জায়গায় বলা হয়েছে:

﴿ وَسۡ‍َٔلِ ٱلۡقَرۡيَةَ ٱلَّتِي كُنَّا فِيهَا ٨٢ ﴾ [ يوسف : ٨٢ ]

‘আর যে জনপদে আমরা ছিলাম তাকে জিজ্ঞাসা করুন” [সূরা ইউসূফ: ৮২] এখানে ٱلۡقَرۡيَةِۖ দ্বারা জনপদের অধিবাসীকে বুঝানো হয়েছে। সুতরাং দেখুন একই শব্দ এক স্থানে অর্থ হলো জনপদ, আর অন্য স্থানে অর্থ হলো অধিবাসী।

কোনো বিবেকবানের পক্ষে একথা বলা সমীচীন হবে না যে, ইয়াকুব আলাইহিস সালামের সন্তানেরা তাদের পিতার সাথে কথা:

﴿ وَسۡ‍َٔلِ ٱلۡقَرۡيَةَ ٱلَّتِي كُنَّا فِيهَا ٨٢ ﴾ [ يوسف : ٨٢ ]

“আর যে জনপদে আমরা ছিলাম তাকে জিজ্ঞাসা করুন” [সূরা ইউসূফ: ৮২] এখানে ٱلۡقَرۡيَةِۖ দ্বারা একথা বুঝানো সম্ভব নয় যে, ইয়াকুব আলাইহিস সালাম জনপদে গিয়ে সেখানকার দেয়ালের কাছে জিজ্ঞেস করবে, এটা কখনও উদ্দেশ্য হতে পারে না।

ইবন তাইমিয়া রহ. এর মত হচ্ছে যে, আরবি ভাষা ও কুরআনে মাজায নেই। কেননা শব্দের অর্থ তার সিয়াক্ব তথা পূর্বাপর ধরণ বুঝে অর্থ নির্ধারিত হয়। যখন পূর্বাপর ধরণ (সিয়াক্ব) দ্বারা অর্থ নির্ধারিত হবে তখন হাক্বিকতই উদ্দেশ্য হবে, ফলে আর কোনো দ্বিধা থাকে না।

যারা বলেন যে, কুরআনে মাজায আছে তারা নিম্নোক্ত আল্লাহর বাণী দ্বারা দলিল দেন,

﴿ فَوَجَدَا فِيهَا جِدَارٗا يُرِيدُ أَن يَنقَضَّ ٧٧ ﴾ [ الكهف : ٧٧ ]

“অতঃপর তারা সেখানে একটি প্রাচীর দেখতে পেল, যা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।” [সূরা আল-কাহফ: ৭৭]

তারা বলেন, ইরাদা শুধু যাদের অনুভূতি আছে তাদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। দেয়ালের কোনো অনুভূতি নেই। এটা তাদের মত।

কিন্তু আমরা বলব: দেয়ালের ইরাদা আছে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদ পাহাড়কে বলেছেন:

«هَذَا جُبَيْلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ»

“এ পাহাড়টি আমাদেরকে ভালবাসে, আমরাও তাকে ভালবাসি।” [বুখারী, হাদীস নং ১৪৪১।] মুহাব্বত ইরাদার চেয়েও খাস বা বেশি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। সুতরাং কে বলবে দেয়ালের ইচ্ছাশক্তি নাই, অথচ আল্লাহ বলেছেন,

﴿ يُرِيدُ أَن يَنقَضَّ ٧٧ ﴾ [ الكهف : ٧٧ ]

“সেটি পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।” [সূরা আল-কাহফ: ৭৭], হ্যাঁ কিছু লোক শুধু তাদের নিজেদের বুঝ অনুযায়ী সেটা বলতে পারেন। তারা বলেন, ইরাদা শুধু যাদের অনুভূতি আছে তাদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়। অথচ হাদীসে এসেছে,

«هَذَا جُبَيْلٌ يُحِبُّنَا وَنُحِبُّهُ»

“এ পাহাড়টি আমাদেরকে ভালবাসে, আমরাও তাকে ভালবাসি।” এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যে, পাহাড়ের ভালবাসা আছে।

কেউ যদি জিজ্ঞেস করেন: কিভাবে বুঝব যে, দেয়ালের পড়ে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, তবে আমরা বলব: সেটি হেলে যাওয়া বা ফেটে যাওয়ার দ্বারা বুঝা যাবে যে দেয়ালের ইচ্ছা শক্তি আছে।