hadith book logo

আল্লাহর পথের অভিযাত্রী

লেখকঃ ড. লুতফুল্লাহ ইবন মোল্লা আব্দুল আযীম খাজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২

বায়তুল্লাহর অভিযাত্রী: আল্লাহ পানে সফরকারী

জীবন একটি সফর। আর মানুষ সম্পাদনকারী মুসাফির। গন্তব্য একটিই; পরকাল। তবে আবাস দুটি; চিরস্থায়ী জান্নাত, জাহান্নামের অগ্নি। মানুষ মাত্রই পরকালের যাত্রী। এতে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই। এ যাত্রা পথের অভিযাত্রী না হয়ে কারো উপায় নেই। হ্যাঁ, পথ গ্রহণের স্বাধীনতা আছে বৈকি। কেউ জান্নাতের পথ গ্রহণ করে তাতে পৌঁছবার যাবতীয় শর্ত, সহায়ক নীতি ও সফল হবার উপায়-উপকরণ মেনে চলে। আবার কেউ কেউ জাহান্নামের রাস্তা এখতিয়ার করে তাতে পৌঁছানোর সহায়ক সব পথ-পদ্ধতি গ্রহণ করে। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡإِنسَٰنُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَىٰ رَبِّكَ كَدۡحٗا فَمُلَٰقِيهِ ٦ فَأَمَّا مَنۡ أُوتِيَ كِتَٰبَهُۥ بِيَمِينِهِۦ ٧ فَسَوۡفَ يُحَاسَبُ حِسَابٗا يَسِيرٗا ٨ وَيَنقَلِبُ إِلَىٰٓ أَهۡلِهِۦ مَسۡرُورٗا ٩ وَأَمَّا مَنۡ أُوتِيَ كِتَٰبَهُۥ وَرَآءَ ظَهۡرِهِۦ ١٠ فَسَوۡفَ يَدۡعُواْ ثُبُورٗا ١١ وَيَصۡلَىٰ سَعِيرًا ١٢ إِنَّهُۥ كَانَ فِيٓ أَهۡلِهِۦ مَسۡرُورًا ١٣ إِنَّهُۥ ظَنَّ أَن لَّن يَحُورَ ١٤ بَلَىٰٓۚ إِنَّ رَبَّهُۥ كَانَ بِهِۦ بَصِيرٗا ١٥﴾ [ الانشقاق : ٦، ١٥ ]

“হে মানুষ, তোমার রব পর্যন্ত (পৌঁছতে) অবশ্যই তোমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। অতঃপর তুমি তাঁর সাক্ষাৎ পাবে। অতঃপর যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে, অত্যন্ত সহজভাবেই তার হিসাব-নিকাশ করা হবে। সে তার পরিবার-পরিজনের কাছে আনন্দিত হয়ে ফিরে যাবে। আর যাকে তার আমলনামা পিঠের পেছনে দেওয়া হবে, অতঃপর সে ধ্বংস আহ্বান করতে থাকবে। আর জ্বলন্ত আগুনে প্রবেশ করবে। নিশ্চয় সে তার পরিবার-পরিজনদের মধ্যে আনন্দে ছিল। নিশ্চয় সে মনে করত যে, সে কখনো ফিরে যাবে না। হ্যাঁ, নিশ্চয় তার রব তার প্রতি সম্যক দৃষ্টি দানকারী।” [সূরা আল-ইনশিকাক, আয়াত: ৬-১৫]

উদাসীনতা ও অমনোযোগিতার ব্যাধি মানব প্রকৃতির সাথে যেন মিশে একাকার হয়ে আছে। প্রতিটি মানুষের মাঝেই এ রোগ বিদ্যমান। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বিবৃতি হচ্ছে,

﴿ ٱقۡتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمۡ وَهُمۡ فِي غَفۡلَةٖ مُّعۡرِضُونَ ١ مَا يَأۡتِيهِم مِّن ذِكۡرٖ مِّن رَّبِّهِم مُّحۡدَثٍ إِلَّا ٱسۡتَمَعُوهُ وَهُمۡ يَلۡعَبُونَ ٢ لَاهِيَةٗ قُلُوبُهُمۡۗ ٣ ﴾ [ الانبياء : ١، ٣ ]

“মানুষের হিসাব-নিকাশের সময় আসন্ন, অথচ তারা উদাসীনতায় মুখ ফিরিয়ে রয়েছে। যখনই তাদের রবের পক্ষ থেকে তাদের নিকট কোনো নতুন উপদেশ আসে তখন তারা তা কৌতুকভরে শ্রবণ করে। তাদের অন্তর থাকে অমনোযোগী...”। [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১-৩]

তাইতো মানুষ তাদের চিরন্তন এ সফরকে স্মরণ করে না। চিন্তা করে না তাদের শেষ পরিণতি ও ঠিকানা সম্বন্ধে। মরদেহ প্রত্যক্ষ করে ঠিকই, কিন্তু অন্তর তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করে বলে মনে হয় না। অবচেতন অন্তর পরকাল বিষয়ে চৈতন্য ফিরে পেয়েছে বলে অনুভূত হয় না।

মহান আল্লাহ নিজ বান্দাদের প্রতি অতিশয় দয়ালু। তাই তিনি সে সফর সম্বন্ধে তাদেরকে বার বার সজাগ করে দেন নানাভাবে। স্মরণ করিয়ে দেন শাশ্বত সে আবাসনের কথা। উদ্দেশ্য, তারা তাকওয়া অবলম্বন করবে, আল্লাহর নীতি-বিধান মেনে চলবে...।

সে লক্ষ্যে তিনি স্থাপন করেছেন নানা স্মারক ও নিদর্শন, যা তাদের উদাসীনতা ও বিঃস্মৃতিকে দূরে ঠেলে, পাথেয় গ্রহণে উজ্জিবিত করবে প্রতিনিয়ত। স্মরণ করবে তারা চিরন্তন সে যাত্রাকে। যা চলছে আর চলছে। লাগাতার-বিরামহীনভাবে চলছে। বছরের পর বছর গণনা করছে আর একটি একটি করে বিয়োগ করছে। এ চলা কখনো ক্ষান্ত হবে না, হবে না পরিশ্রান্ত। সেসব নিদর্শনের একটি হলো হজ।

হজের রয়েছে নির্ধারিত কিছু রোকন, কতিপয় ওয়াজিব ও অনেকগুলো সুন্নত। ইহরাম, উকূফে ‘আরাফা, তাওয়াফে যিয়ারত হচ্ছে রুকন। জমহুর ফিকহবিদ আবশ্য হজের সা‘ঈকেও রুকনের অন্তর্ভুক্ত করেছেন।

উল্লিখিত রুকনগুলো পুরো বা আংশিক অনাদায়ি থাকলে হজ সহীহ হবে না।

-ইহরাম ছাড়া হজের কার্যক্রম শুরু করা সার্বিক বিচারেই অগ্রহণযোগ্য।

-‘আরাফায় অবস্থান ব্যতীত হজের সাথে সম্পৃক্ততা প্রমাণ করা যাবে না কোনোভাবেই। এমতাবস্থায় হাদি জবাই ও ওমরাহ সম্পাদন করে হালাল হয়ে যেতে হবে এবং পরবর্তী বছর পুণরায় হজ করতে হবে।

-তাওয়াফে যিয়ারত ব্যতীত হজ সম্পূর্ণ হবে না এবং এ কারণে (দ্বিতীয় তাহাললুল বা) চূড়ান্ত পর্যায়ের হালাল হওয়া ঝুলে থাকবে। তাওয়াফ সমাপন অবধি স্ত্রী সম্ভোগ বৈধ হবে না।

-জমহুর আলেমদের মতে সা‘ঈ সম্পাদন করা ব্যতীত হজ অসম্পূর্ণ থাকবে। যতক্ষণ তা অনাদায়ি থাকবে, হজও তার জিম্মায় বাকি থেকে যাবে।

হজের সফর একটি ক্ষুদ্র সফর; পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে আখেরাত পানে বড় সফরের দৃষ্টান্ত বিশেষ। তবে এটি জান্নাতের পথ ধারণকারী মু’মিনের সফর, জাহান্নাম অভিমুখে অগ্রসরমানের সফর নয়।

হজের এ সফর সম্পন্ন হতে হলে যেমনি করে উপরিউক্ত রুকনের বাস্তবায়ন জরুরি। একইভাবে (জান্নাতে প্রবেশের) মহান আল্লাহ পানে বড় সফরটিও অনুরূপ চারটি রুকন বাস্তবায়ন ব্যতীত সম্পন্ন হবে না।