hadith book logo

আল্লাহর পথের অভিযাত্রী

লেখকঃ ড. লুতফুল্লাহ ইবন মোল্লা আব্দুল আযীম খাজা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

দুই. তাওবা ও ইস্তিগফার:

তাওবা ইস্তিগফার ব্যতীত কোনো ব্যক্তিই জান্নাতে প্রবেশের সৌভাগ্য অর্জন করতে পারে না। কারণ পাপ-পঙ্কিলতা প্রতিটি মানুষকে চারিদিক থেকে পরিবেষ্টন করার অপেক্ষায় থাকে। পাপ থেকে নিরাপদ নয় কেউই। পাপ নেই এমন মানুষও পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং মানুষ যদি তাওবা ইস্তিগফারের মাধ্যমে নিজ পাপ (জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে) নিঃশেষ করতে না পারে, তাহলে পাপ তাকে চারিদিক থেকে বেষ্টন করে নিবে। আর বাধ্য হয়েই তাকে জাহান্নামে যেতে হবে, এ যাওয়া কেউ রোধ করতে পারবে না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿بَلَىٰۚ مَن كَسَبَ سَيِّئَةٗ وَأَحَٰطَتۡ بِهِۦ خَطِيٓ‍َٔتُهُۥ فَأُوْلَٰٓئِكَ أَصۡحَٰبُ ٱلنَّارِۖ هُمۡ فِيهَا خَٰلِدُونَ ٨١ ﴾ [ البقرة : ٨١ ]

“হ্যাঁ, যে মন্দ উপার্জন করবে এবং তার পাপ তাকে বেষ্টন করে নেবে, তারাই আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে হবে স্থায়ী।” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ৮১]

কিন্তু তাওবা-ইস্তিগফার পাপের বন্ধন খুলে দেয়, ভেঙ্গে ফেলে তার বেষ্টনি-বেড়ি। যাতে করে মুমিন তার রবের সন্তুষ্টি পানে পৌঁছতে পারে। তাঁর রেযামন্দি অর্জনে যেন আর কোনো বাধা না থাকে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَٰحِشَةً أَوۡ ظَلَمُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ ذَكَرُواْ ٱللَّهَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ لِذُنُوبِهِمۡ وَمَن يَغۡفِرُ ٱلذُّنُوبَ إِلَّا ٱللَّهُ وَلَمۡ يُصِرُّواْ عَلَىٰ مَا فَعَلُواْ وَهُمۡ يَعۡلَمُونَ ١٣٥ أُوْلَٰٓئِكَ جَزَآؤُهُم مَّغۡفِرَةٞ مِّن رَّبِّهِمۡ وَجَنَّٰتٞ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ وَنِعۡمَ أَجۡرُ ٱلۡعَٰمِلِينَ ١٣٦﴾ [ ال عمران : ١٣٥، ١٣٦ ]

“আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করলে অথবা নিজদের প্রতি যুলম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে, অতঃপর তাদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আর আল্লাহ ছাড়া কে গুনাহ ক্ষমা করবে? আর তারা যা করেছে, জেনে শুনে তা তারা বার বার করে না। এরাই তারা, যাদের প্রতিদান তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও জান্নাতসমূহ, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর আমলকারীদের প্রতিদান কতই না উত্তম!” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৫-১৩৬]

তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে হজে ‘আরাফার ময়দানে অবস্থান।

-‘আরাফার ময়দানে অবস্থান মূলত: মহান মাওলার দরবারে ক্ষমা, মার্জনা ও মাফি প্রার্থনার অবস্থান। লোকেরা পূর্ণ দিন ও রাতের কিয়দাংশ এ দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করে মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমার জন্য ফরিয়াদ করে। তাঁর নি‘আমত ও করুণা প্রার্থনা করে। অতীত জীবনে হয়ে যাওয়া অন্যায় অপরাধের কারণে যেন শাস্তি না দেওয়া হয় সে আরজি পেশ করে কান্না ভরা কণ্ঠে মহান মা‘বূদকে ডাকাডাকিতে ব্যস্ত থাকে। আর আল্লাহ তাদের সে সব ডাকে সাড়া প্রদান করে থাকেন, ক্ষমার ঘোষণা দেন অতীতে কৃত যাবতীয় অন্যায়ের। গর্বভরে ফিরিশতাদের বলে থাকেন,

‍“চেয়ে দেখ আমার বান্দাদের দিকে, আলু-থালু কেশে ধূলোয় ধূসরিত হয়ে তারা আমার নিকট এসেছে, সাক্ষী থেকো, আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম।”

-‌‌‌‌‌‌ আরাফাতে অবস্থানই হচ্ছে হজ, মর্মে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ আরাফাতে অবস্থান করা হজের প্রধান রুকন। এটি যার ছুটে যাবে তার হজ হবে না। আর তাওবা ইস্তিগফারের অবিদ্যমানতায় আল্লাহর প্রতিদান ও সন্তুষ্টি ছুটে যায় এবং তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি আরোপিত হয়। আল্লাহ বলেন,

﴿ وَإِذَا قِيلَ لَهُمۡ تَعَالَوۡاْ يَسۡتَغۡفِرۡ لَكُمۡ رَسُولُ ٱللَّهِ لَوَّوۡاْ رُءُوسَهُمۡ وَرَأَيۡتَهُمۡ يَصُدُّونَ وَهُم مُّسۡتَكۡبِرُونَ ٥ ﴾ [ المنافقون : ٥ ]

“আর তাদেরকে যখন বলা হয় এসো, আল্লাহর রাসূল তোমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, তখন তারা তাদের মাথা নাড়ে। আর তুমি তাদেরকে দেখতে পাবে, অহঙ্কারবশত বিমুখ হয়ে চলে যেতে।” [সূরা আল-মুনাফিকূন, আয়াত: ৫]

ধ্বংসপ্রাপ্ত সেসব মুনাফিকদের ধ্বংসের একমাত্র কারণ অহঙ্কারবশত তাওবা-ইস্তিগফার থেকে বিমুখ হওয়া।

﴿وَلَوۡ أَنَّهُمۡ إِذ ظَّلَمُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ جَآءُوكَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ ٱللَّهَ وَٱسۡتَغۡفَرَ لَهُمُ ٱلرَّسُولُ لَوَجَدُواْ ٱللَّهَ تَوَّابٗا رَّحِيمٗا﴾ [ النساء : ٦٤ ]

“আর যদি তারা- যখন নিজদের প্রতি যুলুম করেছিল তখন তোমার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইত তাহলে অবশ্যই তারা আল্লাহকে তাওবা কবুলকারী, দয়ালু পেত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৬৪]

﴿وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمۡ وَأَنتَ فِيهِمۡۚ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ مُعَذِّبَهُمۡ وَهُمۡ يَسۡتَغۡفِرُونَ ٣٣﴾ [ الانفال : ٣٣ ]

“আর আল্লাহ এমন নন যে, তাদেরকে ‘আযাব দিবেন এ অবস্থায় যে, তুমি তাদের মাঝে বিদ্যমান এবং আল্লাহ তাদেরকে আযাবদানকারী নন এমতাবস্থায় যে, তারা ক্ষমা প্রার্থনা করছে।” [সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৩৩]

নিয়মিত ইস্তিগফারকারীদেরকে ‘আযাব না দেওয়ার কারণ হচ্ছে তাদের ইস্তিগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা।

আব্দুল্লাহ ইবন জাদ‌‘আনকে শাস্তি প্রদান ও জাহান্নামে প্রবেশের কারণ হিসাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেছেন, সে শত বছরের মাঝে একটি বারের জন্যও বলে নি, হে আল্লাহ প্রতিদান দিবসে তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও।

মোটকথা: ‘আরাফার অবস্থান সার্বক্ষণিক তাওবা-ইস্তিগফারকে স্মরণ করিয়ে দেয়। আরো স্মরণ করিয়ে দেয় রহমত ও সন্তুষ্টির দার উন্মোচন এবং বে-ইজ্জতি ও ক্রোধ উঠিয়ে নেয়া অবদি দরজায় বসে থাকার আবশ্যিকতাকে।

যারা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত কড়া নাড়া নাড়ি করে, দরজা মূলতঃ তাদের তরেই খোলা হয়। কল্যাণ সেই পায় যে ধৈর্য্য ধারণ করে...।

ক্ষমা, মার্জনা, মাফি চেয়ে হাজি সাহেব দিবা-রাত্রির দীর্ঘ সময় কষ্ট ও অপেক্ষার ধৈর্য্য ধারণ করেন, অনুরূপভাবে ধৈর্য্য ধারণ করে থাকে আল্লাহর নৈকট্য ও করুণা প্রার্থী আখিরাতের মুসাফির।