hadith book logo

মোরা বড় হতে চাই

লেখকঃ আহসান হাবীব ইমরোজ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২০

মনোযোগ-সংযোগ

মনোযোগ-সংযোগ

“আমেরিকার একটি শহরে উচ্চতর বিজ্ঞান কেন্দ্রে স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইনকে একটি চমৎকার বাড়ি দেওয়া হয়েছিল। একদিন নিকটবর্তী প্রিন্সটন কলেজে ফোন করে এক ভদ্রলোক একজন ডীনকে চাইলেন। ডীন ঘরে নেই শুনে তিনি তার সেক্রেটারির কাছে আইনস্টাইনের বাসার ঠিকানাটি জানতে চাইলেন। সেক্রেটারি সবিনয়ে জানালেন, দয়াকরে আমাকে মাফ করবেন, ড: আইনস্টাইন একটু নিরিবিলি থাকতে চান বলে ঠিকানা কাউকে দেয়া বারণ আছে। টেলিফোনের অপরপ্রান্তের ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ থেকে ফিসফিসিয়ে বললেন, মাফ করবেন! আমি স্বয়ং আইনস্টাইন বলছি, বাসা থেকে একটু বেড়াতে বের হয়েছিলাম। এখন আমার বাসার ঠিকানাটি একদম ভুলে গেছি।

চলো আরেকটি গল্প পড়ি-

আজ থেকে প্রায় একশত পাঁচ বৎসর আগে ১৮৯৫ সালে সৈয়দ আব্দুস সামাদ জন্মগ্রহণ করেন। সামাদের আরেকটি ঘটনা রূপকথাকেও যেন হার মানায়। খোদ ফুটবলের জন্মস্থান বৃটেনের লন্ডন স্টেডিয়ামে তিনি খেলছেন বৃটিশদের বিরুদ্ধে। বেশ দূর থেকে সামাদের একটি শট করা বল বৃটিশ পক্ষের গোলবারে লেগে ফিরে আসলো। কিন্তু সামাদ রেফারীর কাছে চ্যালেঞ্জ করে বসলো যে তোমাদের গোলপোস্ট অবশ্যই কিছুটা নিচু আছে, তাই আমি গোল দাবি করছি। প্রথমে রেফারী তার কথা হেসেই উড়িয়ে দিল, কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। অবশেষে অনেক তর্কবিতর্কের পর রেফারী তাচ্ছিল্যের সাথে মেপে দেখলো। কিন্তু একি অবাক কান্ড! দেখা যাচ্ছে সামাদের কথাই ঠিক। গোলবারটি প্রায় দেড় ইঞ্চি নিচু। এমতাবস্থায় বাতিল হওয়া গোলটি হিসাবে ধরা হলো। কিন্তু এই ঘটনা তৎকালীন ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করলো। এত সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম হিসাব কিভাবে সম্ভব? বিশ্ব ফুটবলারের ইতিহাসে এমন নির্ভুল শট এবং চ্যালেঞ্জ করার মতো ফুটবলার আজও জন্মায়নি। পাক্কা ছয় ফুট লম্বা এই ফুটবলের যাদুকর সম্পর্কে অনেক কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে। সেই ছোট্টবেলা থেকেই তিনি নাকি একটি টেনিস বল নিয়ে ড্রিবলিং করতে করতে সর্বত্র, মাঠে-ঘাটে যেতেন। এমনকি এমতাবস্থায় বাজার থেকেও ঘুরে আসতেন। এভাবেই বলের উপর তার চুম্বকের মতো প্রভাব তৈরি হয়েছিল। বল যেন তার পায়ে আঠার মতোই লেগে থাকতো। তিনি যেন সেই ইংরেজি প্রবাদটিই নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করেছিলেন Practice makes a man perfect .আইনস্টাইনের কৌতুক থেকে আমরা শিক্ষা পাই একজন মেধাবী লোকও যদি একটি সাধারণ বিষয়কে গুরুত্ব না দেয় তবে সেটি তার মনে নাও থাকতে পারে অপরদিকে ফুটবলের যাদুকর সামাদের জীবন থেকে আমরা শিক্ষা পাই একটি জটিল বিষয়কেও যদি খুব গুরুত্ব দেওয়া হয়, বারবার চর্চা করা হয় তবে তা জলবৎ তরলং হয়ে যায়। এ দুটি বিষয়কে সামনে রাখলে আমরা মূলত: একটি বিষয়ের গুরুত্বকেই খুঁজে পাই সেটি হচ্ছে “ মনোযোগ” ।

তোমরা জান কি স্মরণশক্তি বা মেধা নামক গুপ্তধনের গোপন চাবিটি কি? একটু চোখ বন্ধ করে ধ্যান করেই বলোনা,কী পারছো না, চিচিং…..ফাক? আরে সেতো আলী বাবা আর চল্লিশ চোরের ঘটনা। আসলে বিষয়টি কিন্তু আমরা একটু আগেই বলে দিয়েছি, কি এখন ধরতে পেরেছো? হ্যাঁ সেটি হচ্ছে -মনোযোগ। ‘ইউজ ইউর মেমোরী ‘নামক গ্রন্থে লেখক বলেছেন “ মানব মস্তিস্ক তথ্যে ভারাক্রান্ত হওয়া অসম্ভব, মানব মস্তিস্ক প্রতি সেকেন্ডে দশটির উপর ভিন্ন ভিন্ন আইটেম ধারণে সক্ষম।” তা সত্ত্বেও আমাদের স্মৃতি বিভ্রাটের কারণ কি, কেন মনে থাকেনা? এর কারণ হচ্ছে হয়তো গুরুত্বহীনভাবে আমরা তথ্যগুলি গ্রহণ করেছি। হয়তো সে সময় আমরা অন্যমনস্ক ছিলাম বা অন্যকোন কাজে ব্যস্ত ছিলাম অথবা তড়িৎ গতিতে কাজটি করা হয়েছে। সে জন্য তথ্যগুলি মস্তিস্কের তথ্যব্যাংকে ঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি। উপরোক্ত গ্রন্থে আরো বলা হয়েছে “ ব্যতিক্রমী দু ’একজন ছাড়া বাকী সবার স্মৃতিশক্তি প্রায় একই।” একটি মজার কথা বলছি। তোমরা এক্কেবারে থ বনে যাবে না তো? তাহলে বলছি শোন, তোমাদের স্মৃতিশক্তি আইনস্টাইন,নিউটন,আর সক্রেটিসের তুলনায় কোন অংশেই কম নয়। তোমরা ভাবছো বেচারার মাথাটাই শেষতক তালগোল পাকিয়ে গেল কিনা? সত্যি বলছি, আমার মাথাটি একদম ঠিক আছে, আর কথাটি ঐ বিখ্যাত বই “ ইউজ ইউর মেমোরী ‘এর বক্তব্য।। আসল ঘটনা হচ্ছে সবই মনোযোগের খেলা। আইনস্টাইন নিজের বাসার নাম্বারটিও মনে রাখতে পারেননি প্রয়োজনীয় গুরুত্ব ও মনোযোগ দেননি বলে। তেমনি আমরা যা পারি না তা এই মনোযোগের অভাবের কারণেই। এই মনোযোগ কাকে বলে? সাধারন অর্থে ‘কোন বিশেষ বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে মনোনিবেশ করাই মনোযোগ ’। যেমন আমাদের প্রিয় খেলা ক্রিকেটের কথাই ধরা যাক। যখন ওয়াসিম আকরাম বল করছে তখন আমাদের নজর থাকে শুধুমাত্র তার দিকেই, এরপর হয়তো প্রতিপক্ষের টেন্ডুলকারের ব্যাটের দিকে ‘অতঃপর বলটি যেদিকে ছুটে যায় সেদিকে। তখন কিন্তু অন্যান্য খেলোয়াড়দের প্রতি আমাদের তেমন নজর থাকে না যার ফলে ঠিক তখন তারা কে কি করছে আমরা বলতে পারবো না। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী গিলফোর্ড বলেন, “ মানুষ যা প্রত্যক্ষ করতে চলেছে তা নির্বাচন করার প্রক্রিয়াকেই মনোযোগ বলা হয়।” তোমাদের কী সেইসব গোপন ফর্মূলা বলে দেব যার মাধ্যমে তোমরা তোমাদের সেই কাংখিত স্মরনশক্তির গুপ্তধনকে উদ্ধার করতে পারবে? কি বলবো? হ্যাঁ বলতে পারি, তবে তার আগে কথা দিতে হবে এ ফর্মূলায় লেখাপড়া করে যদি তোমাদের রেজাল্ট ভাল হয় তবে কিন্তু আমাকে ফুলপেট মিষ্টি খাওয়াতে হবে। কি ঠিক তো? তাহলে এক এক করে বলছি শোন।

১. উজ্জ্বলতা : সাধারণের ভিতর একটি উজ্জ্বল জিনিস আমাদের মনোযোগ কাড়ে। সুতরাং আমাদের উচিত বই বা নোটের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সমূহ রঙিন মার্কার দিয়ে দাগিয়ে পড়া।

২. বিচ্ছিন্নতা : অনেক মানুষের ভীড়ে আলাদা একজনের প্রতি নজর পড়ে। ঠিক তদ্রুপ কোন নোটের মৌলিক পয়েন্টগুলি আলাদা করে ডান পাশে লিখলে সহজেই মনোযোগ আকর্ষণ করে।

৩. ব্যবহার : একটি বিষয় ব্যবহার করলে তা সহজেই মনে থাকে। যেমন একটি মটর গাড়ির ইঞ্জিনিয়ারের চাইতে একজন সার্টিফিকেট ছাড়া মেকার মটরগাড়ির মেরামতের কাজ ভাল বুঝে। সুতরাং পড়া একটি বিষয়কে বারবার চর্চা এবং লেখার মাধ্যমে প্রয়োগ করলে তা সহজেই মনে থাকে।