hadith book logo

সমুদ্র নি‘আমতের অফুরান ভাণ্ডার

লেখকঃ আলী হাসান তৈয়ব • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

সাগরে কুরআনের বিস্ময়

আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে বিজ্ঞানীগণ গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করেছেন, দুই সমুদ্রের পানি পরস্পর সম্মিলিত হয় না। যেমন রোম সাগর ও আটলান্টিক মহাসাগরের পানি একটি অপরটির সঙ্গে একীভুত হতে পারে না। সেখানে রয়েছে বিস্ময়কর এক অদৃশ্য অন্তরায়। অথচ যে যুগে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানোর কোনো যন্ত্রসামগ্রী ছিল না, ১৪ শ বছর আগে এমন যুগেই কুরআন বলে দিয়েছে:

﴿مَرَجَ ٱلۡبَحۡرَيۡنِ يَلۡتَقِيَانِ ١٩ بَيۡنَهُمَا بَرۡزَخٞ لَّا يَبۡغِيَانِ ٢٠ فَبِأَيِّ ءَالَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ٢١ يَخۡرُجُ مِنۡهُمَا ٱللُّؤۡلُؤُ وَٱلۡمَرۡجَانُ ٢٢ فَبِأَيِّ ءَالَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ٢٣ وَلَهُ ٱلۡجَوَارِ ٱلۡمُنشَ‍َٔاتُ فِي ٱلۡبَحۡرِ كَٱلۡأَعۡلَٰمِ ٢٤ فَبِأَيِّ ءَالَآءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ ٢٥﴾ [ الرحمن : ١٩، ٢٥ ]

“তিনি পাশাপাশি দুই দরিয়া প্রবাহিত করেছেন। উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক অন্তরায়, যা তারা অতিক্রম করে না। সুতরাং তোমাদের রবের কোন্ নিআমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? উভয় সমুদ্র থেকে উৎপন্ন হয় মণিমুক্তা ও প্রবাল। সুতরাং তোমাদের রবের কোন নি‘আমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? আর সমুদ্রে চলমান পাহাড়সম জাহাজসমূহ তাঁরই। সুতরাং তোমাদের রবের কোন নি‘আমতকে তোমরা উভয়ে অস্বীকার করবে? [সূরা আর-রাহমান, আয়াত: ১৯-২৫]

দুই সমুদ্র বলতে মিঠা ও লোনা সমুদ্র বুঝানো হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবীতে উভয় প্রকার দরিয়া সৃষ্টি করেছেন। কোনো কোনো স্থানে উভয় দরিয়া একত্রে মিলিত হয়ে যায়, যার নজির পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডে পরিদৃষ্ট হয়। কিন্তু যে স্থানে মিঠা ও লোনা উভয় প্রকার দরিয়া পাশাপাশি প্রবাহিত হয় সেখানে বেশ দূর পর্যন্ত উভয়ের পানি আলাদা ও স্বতন্ত্র থাকে। একদিকে থাকে মিঠা পানি, অপরদিকে লোনা পানি। কোথাও কোথাও এ মিঠা ও লোনা পানি উপরে নীচেও প্রবাহিত হয়। পানি তরল ও সূক্ষ্ম পদার্থ হওয়া সত্ত্বেও পরস্পরে মিশ্রিত হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

﴿أَمَّن جَعَلَ ٱلۡأَرۡضَ قَرَارٗا وَجَعَلَ خِلَٰلَهَآ أَنۡهَٰرٗا وَجَعَلَ لَهَا رَوَٰسِيَ وَجَعَلَ بَيۡنَ ٱلۡبَحۡرَيۡنِ حَاجِزًاۗ أَءِلَٰهٞ مَّعَ ٱللَّهِۚ بَلۡ أَكۡثَرُهُمۡ لَا يَعۡلَمُونَ ٦١﴾ [ النمل : ٦١ ]

“বল তো কে পৃথিবীকে বাসপযোগী করেছেন এবং তার মাঝে মাঝে নদ-নদী প্রবাহিত করেছেন এবং তাকে স্থির রাখার জন্য পর্বত স্থাপন করেছেন এবং দুই সমুদ্রের মাঝখানে অন্তরায় রেখেছেন? অতএব, আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ৬১]

অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে:

﴿وَهُوَ ٱلَّذِي مَرَجَ ٱلۡبَحۡرَيۡنِ هَٰذَا عَذۡبٞ فُرَاتٞ وَهَٰذَا مِلۡحٌ أُجَاجٞ وَجَعَلَ بَيۡنَهُمَا بَرۡزَخٗا وَحِجۡرٗا مَّحۡجُورٗا ٥٣﴾ [ الفرقان : ٥٢ ]

“তিনি সমান্তরাল দুই সমুদ্র প্রবাহিত করেছেন একটি মিষ্টি, তৃষ্ণা নিবারক ও একটি লোনা, বিস্বাদ। আর উভয়ের মাঝে রেখে দেন একটি অন্তরায়, একটি দুর্ভেদ্য আড়াল।” [সূরা আল-ফুরকান, আয়াত: ৫৩]

জ্যাক ভি. কোস্টা নামের এক ফরাসি বিজ্ঞানী সমুদ্রের ভেতরস্থ পানি গবেষণা বিষয়ে প্রসিদ্ধ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন রোম সাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগর রাসায়নিক দিক থেকে একটি অন্যটির চেয়ে ভিন্ন রকম। তিনি এ বাস্তব সত্যটি অনুধাবন করার জন্য জিব্রাল্টার দুই সমুদ্রের মিলন কেন্দ্রের কাছাকাছি সমুদ্রের তলদেশে গবেষণা চালান, সেখান থেকে তথ্য পান যে জিব্রাল্টার উত্তর তীর (মারুকেশ) আর দক্ষিণ তীর (স্পেন) থেকে আশাতীতভাবে একটি মিষ্টি পানির ঝর্ণা উথলে ওঠে। এ বড় ঝর্ণাটি উভয় সমুদ্রের মধ্য দিয়ে ৪৫ সূক্ষ্ম কোণে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়ে চিরুনির দাঁতের আকৃতি ধারণ করে বাঁধের ন্যায় কাজ করে। এ ক্রিয়াকলাপের ফলে রোম সাগর এবং আটলান্টিক মহাসাগর একটি আরেকটির সঙ্গে মিশতে পারে না। দু’টি সমুদ্রের মিলনস্থলে যে পৃথকীকরণ বা পর্দা রয়েছে তা খালি চোখে বুঝার উপায় নেই। কেননা বাহ্যত সব সাগর একই রূপের মনে হয়।

শুধু তিনি নন; বরং অনেক মেরিন বিজ্ঞানীই এই রহস্য ভেদ করতে ব্যর্থ হন। ১৯৪২ সালে শতাধিক মেরিন স্টেশন বসিয়ে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়, কোন জিনিস দুই সাগরের মিলন কেন্দ্রে বাঁধা সৃষ্টি করে আছে? তারা সেখানে আলো পরীক্ষা করেন, বাতাস পরীক্ষা করেন এবং মাটি পরীক্ষা করে এর মধ্যে কোনো বাধা বা পর্দা সৃষ্টি করার কারণ খুঁজে পান নি। এখানে পানির একটি হালকা, একটি ঘন রং পরিলক্ষিত হয়। যা খালি চোখে প্রত্যক্ষ করা সম্ভব নয়। এমনকি বিজ্ঞানীরা আরো গভীরভাবে বিষয়টি উপলব্ধির জন্য এবং আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের দূরে থেকে অনুধাবনের পদ্ধতির মাধ্যমে বা এর মাধ্যমে ছবি ধারণ করেন। ভূমধ্য সাগরের পানি গাঢ় নীল এবং আটলান্টিক সাগরের পানি হালকা নীল, আর জিবরাল্টার সেল যা পাহাড়াকৃতির এবং তার রং হল খয়েরি। ঘনত্ব-উষ্ণতা এবং লবণাক্ততার দিক থেকে ভূমধ্য সাগরের পানি আটলান্টিকের তুলনায় অনেক বেশি। আরো মজার ব্যাপার হলো, ভূমধ্য সাগরের পানি জিব্রাল্টার সেল বা সাগর তলের উঁচু ভূমির উপর দিয়ে আটলান্টিক সাগরের মধ্যে শতাধিক কিলোমিটার প্রবেশ করেছে এবং তা ১০০০ হাজার মিটার গভীরে পৌঁছার পরেও তার উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যের ও রঙ্গের কোনো পরিবর্তন সাধিত হয়নি। যদিও এতদুভয়ের মাঝে রয়েছে প্রচণ্ড ঢেউ, প্রবল খরস্রোত এবং উত্তাল তরঙ্গ তথাপিও পরস্পর মিশ্রিত হয় না এবং একে অন্যকে অতিক্রম করতে পারে না। যেহেতু উভয়ের মাঝে রয়েছে একটি পর্দা। যেমন বলা হয়েছে পবিত্র কুরআনে প্রাগুক্ত আয়াতে। সাগরের এ বিস্ময়কর সৃষ্টিরহস্য উদ্ঘাটন করতে গিয়ে অনেক গবেষক কুরআনের প্রাগুক্ত আয়াতে এর অলৌকিকতার সন্ধান পেয়েছেন। তাদের কেউ কেউ এ সূত্রে সত্য ইসলামও গ্রহণ করেছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়। ফ্রান্সের সমুদ্রবিজ্ঞানী ড. কোস্টাও ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। [সূত্র : ইন্টরনেটে প্রাপ্ত বিভিন্ন গবেষণামূলক লেখা।]