hadith book logo

বৈধ ও অবৈধ অসীলা

লেখকঃ ডক্টর আব্দুস সালাম বারজাস আল আব্দুল করীম • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

দ্বিতীয়ত: দো‘আর ক্ষেত্রে বৈধ অসীলা হলো :

কোনো মুসলিম তার কৃত সৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য করবে। এর বহু দলীল রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে:

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

যারা বলে, হে আমাদের প্রতিপালক, আমরা তোমার প্রতি ঈমান এনেছি, কাজেই তুমি আমাদের পাপসমুহকে ক্ষমা করে দাও এবং জাহান্নামের আগুনের শাস্তি থেকে আমাদেরকে বাঁচাও। [সূরা আল ইমরান/৩৬]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:

(হে আমাদের প্রতিপালক, তুমি যা অবতীর্ণ করেছ তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং রাসূলের অনুসরণ করছি। অত:এব, আমাদেরকে সাক্ষিদের সাথে লিপিবদ্ধ কর।) [সূরা আল ইমরান/ ৫৩]

তিনি আরো বলেন:

(হে আমাদের প্রভু, নিশ্চয়ই আমরা একজন আহ্বানকারীকে ঈমানের জন্য আহ্বান করতে শুনেছি যে, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি ঈমান আনয়ন কর, তাতেই আমরা ঈমান আনলাম, হে আমাদের প্রভু, আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা কর ও আমাদের অমঙ্গলসমূহ আবৃত কর এবং পূণ্যবানদের সহিত আমাদিগকে মৃত্যু দান কর।) [সূরা আল ইমরান/ ১৯৩]

তিনি আরো বলেন:

(আমার বান্দাদের মধ্যে একদল লোক ছিল যারা বলতো: হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা ঈমান এনেছি, সুতরাং তুমি আমাদিগকে ক্ষমা করে দাও এবং আমাদিগকে অনুগ্রহ কর, তুমিতো অনুগ্রহশীলদের শ্রেষ্ঠ অনুগ্রহশীল।) [সূরা মুমিনূন/ ১০৯]

মুসনাদ এবং সুনানে আবু দাউদে বুরাইদাহ ইবন হুসাইব হতে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন:

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ أَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللَّهُ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ، الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ، وَلَمْ يُولَدْ، وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ، فَقَالَ : «لَقَدْ سَأَلْتَ اللَّهَ بِالِاسْمِ الَّذِي إِذَا سُئِلَ بِهِ أَعْطَى، وَإِذَا دُعِيَ بِهِ أَجَابَ» .

(হে আল্লাহ! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহ, তুমি ব্যতীত কোনো যোগ্য উপাসক নেই, তুমি একক, ভরসাস্থল, যিনি জনক নন এবং জাতকও নন এবং যার সমকক্ষ কেউ নেই, এ অসীলায় আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি।) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (সে আল্লাহর নিকট তার সব চেয়ে বড় নামের মাধ্যমে চেয়েছে, যার দ্বারা চাইলে তিনি দিয়ে থাকেন এবং দো‘আ করলে তিনি কবুল করে থাকেন [আবু দাউদ, ১৪৯৩।]।

এই ব্যক্তি সৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য চেয়েছে, আর সেটি হচ্ছে: ইখলাসের সাক্ষ্য প্রদান করা। এবং সে কথা, কাজ এবং বিশ্বাসে ইখলাসের উপর থাকার কারণে।

অনুরূপ এর উদাহরণ গুহার অধিবাসীদের ঘটনা, যা আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, সেটি হলো: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

" انْطَلَقَ ثَلاَثَةُ رَهْطٍ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ حَتَّى أَوَوْا المَبِيتَ إِلَى غَارٍ، فَدَخَلُوهُ فَانْحَدَرَتْ صَخْرَةٌ مِنَ الجَبَلِ، فَسَدَّتْ عَلَيْهِمُ الغَارَ، فَقَالُوا : إِنَّهُ لاَ يُنْجِيكُمْ مِنْ هَذِهِ الصَّخْرَةِ إِلَّا أَنْ تَدْعُوا اللَّهَ بِصَالِحِ أَعْمَالِكُمْ، فَقَالَ رَجُلٌ مِنْهُمْ : اللَّهُمَّ كَانَ لِي أَبَوَانِ شَيْخَانِ كَبِيرَانِ، وَكُنْتُ لاَ أَغْبِقُ قَبْلَهُمَا أَهْلًا، وَلاَ مَالًا فَنَأَى بِي فِي طَلَبِ شَيْءٍ يَوْمًا، فَلَمْ أُرِحْ عَلَيْهِمَا حَتَّى نَامَا، فَحَلَبْتُ لَهُمَا غَبُوقَهُمَا، فَوَجَدْتُهُمَا نَائِمَيْنِ وَكَرِهْتُ أَنْ أَغْبِقَ قَبْلَهُمَا أَهْلًا أَوْ مَالًا، فَلَبِثْتُ وَالقَدَحُ عَلَى يَدَيَّ، أَنْتَظِرُ اسْتِيقَاظَهُمَا حَتَّى بَرَقَ الفَجْرُ، فَاسْتَيْقَظَا، فَشَرِبَا غَبُوقَهُمَا، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتُ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ، فَفَرِّجْ عَنَّا مَا نَحْنُ فِيهِ مِنْ هَذِهِ الصَّخْرَةِ، فَانْفَرَجَتْ شَيْئًا لاَ يَسْتَطِيعُونَ الخُرُوجَ " ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " وَقَالَ الآخَرُ : اللَّهُمَّ كَانَتْ لِي بِنْتُ عَمٍّ، كَانَتْ أَحَبَّ النَّاسِ إِلَيَّ، فَأَرَدْتُهَا عَنْ نَفْسِهَا، فَامْتَنَعَتْ مِنِّي حَتَّى أَلَمَّتْ بِهَا سَنَةٌ مِنَ السِّنِينَ، فَجَاءَتْنِي، فَأَعْطَيْتُهَا عِشْرِينَ وَمِائَةَ دِينَارٍ عَلَى أَنْ تُخَلِّيَ بَيْنِي وَبَيْنَ نَفْسِهَا، فَفَعَلَتْ حَتَّى إِذَا قَدَرْتُ عَلَيْهَا، قَالَتْ : لاَ أُحِلُّ لَكَ أَنْ تَفُضَّ الخَاتَمَ إِلَّا بِحَقِّهِ، فَتَحَرَّجْتُ مِنَ الوُقُوعِ عَلَيْهَا، فَانْصَرَفْتُ عَنْهَا وَهِيَ أَحَبُّ النَّاسِ إِلَيَّ، وَتَرَكْتُ الذَّهَبَ الَّذِي أَعْطَيْتُهَا، اللَّهُمَّ إِنْ كُنْتُ فَعَلْتُ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ، فَافْرُجْ عَنَّا مَا نَحْنُ فِيهِ، فَانْفَرَجَتِ الصَّخْرَةُ غَيْرَ أَنَّهُمْ لاَ يَسْتَطِيعُونَ الخُرُوجَ مِنْهَا " ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : " وَقَالَ الثَّالِثُ : اللَّهُمَّ إِنِّي اسْتَأْجَرْتُ أُجَرَاءَ، فَأَعْطَيْتُهُمْ أَجْرَهُمْ غَيْرَ رَجُلٍ وَاحِدٍ تَرَكَ الَّذِي لَهُ وَذَهَبَ، فَثَمَّرْتُ أَجْرَهُ حَتَّى كَثُرَتْ مِنْهُ الأَمْوَالُ، فَجَاءَنِي بَعْدَ حِينٍ فَقَالَ : يَا عَبْدَ اللَّهِ أَدِّ إِلَيَّ أَجْرِي، فَقُلْتُ لَهُ : كُلُّ مَا تَرَى مِنْ أَجْرِكَ مِنَ الإِبِلِ وَالبَقَرِ وَالغَنَمِ وَالرَّقِيقِ، فَقَالَ : يَا عَبْدَ اللَّهِ لاَ تَسْتَهْزِئُ بِي، فَقُلْتُ : إِنِّي لاَ أَسْتَهْزِئُ بِكَ، فَأَخَذَهُ كُلَّهُ، فَاسْتَاقَهُ، فَلَمْ يَتْرُكْ مِنْهُ شَيْئًا، اللَّهُمَّ فَإِنْ كُنْتُ فَعَلْتُ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ وَجْهِكَ، فَافْرُجْ عَنَّا مَا نَحْنُ فِيهِ، فَانْفَرَجَتِ الصَّخْرَةُ، فَخَرَجُوا يَمْشُونَ "

তোমাদের পূর্বে তিন ব্যক্তি কোথাও যাচ্ছিল, একটি গুহার নিকটে রাত্রি হয়ে গেলে তারা তাতে প্রবেশ করল, অতঃপর পাহাড় থেকে একটি পাথর এসে গুহার উপর পড়লে তারা তাতে আটকা পড়ে গেল, অতঃপর তারা পরস্পর বলতে লাগল এ পাথর সরিয়ে আমরা কখনো মুক্তি পাবনা, কিন্তু যদি তোমাদের সৎ আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট দো‘আ কর। তাদের মধ্যে একজন বলল: হে আল্লাহ, আমার বৃদ্ধ পিতা-মাতা ছিল, আমি আমার পরিবারকে এবং দাস দাসীকে তাদের পূর্বে কখনো দুধ পান করাতামনা, একদা ঘাসের তালাশে বহু দূর চলে গেলাম, তাদের ঘুমের পূর্বে ফিরে আসতে পারিনি, অতঃপর আমি ছাগলের দুধ দহন করে এসে দেখি তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন, এমতাবস্থায় আমি তাদেরকে জাগাতে পছন্দ করলামনা এবং তাদের পূর্বে আমার পরিবার এবং দাস দাসীকে দুধ পান করানো ভাল মনে করলাম না, অতঃপর আমি পেয়ালা হাতে নিয়ে তাদের ঘুম থেকে জাগার অপেক্ষা করছি, অপেক্ষা করতে করতে ফজর উদিত হয়ে গেল, আর আমার ছোট ছোট বাচ্চারা আমার পায়ের নিকট ক্ষুধার তাড়নায় চিৎকার করছে, তারপর তারা ঘুম থেকে জাগলে তাদের দুধটুকু পান করলেন।

হে আল্লাহ! এ কাজ যদি আমি তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি তবে আমাদের থেকে এ পাথরের বিপদকে দূর করে দাও। অতঃপর পাথরটি সামান্য সরে গেল কিন্তু তারা বের হতে পারল না।

অন্যজন বলল: হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল, সে আমার নিকট সকলের চেয়ে প্রিয় ছিল, অতঃপর আমি তাকে একদিন কুপ্রস্তাব দিলে সে রাজি হয়নি, কোনো এক বৎসর সে অভাবে পড়ে আমার নিকট আসলে আমি তাকে একশত বিশটি দিনার দিলাম এই শর্তে যে, সে নিজেকে আমার নিকট সপে দিবে, তাতে সে রাজি হল, আমি তাকে আমার আয়ত্বে নিয়ে আসলাম, অন্য বর্ণনায়: যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম তখন সে বলল : তুমি আল্লাহকে ভয় কর! সতীত্বের হক আদায় ব্যতীত তা তুমি নষ্ট করো না। অতঃপর তার নিকট থেকে ফিরে এলাম অথচ সে আমার নিকট সকলের চেয়ে প্রিয় এবং তাকে দেওয়া স্বর্ণ মুদ্রাও ছেড়ে দিলাম।

হে আল্লাহ ! এ কাজ যদি আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি তবে আমাদেরকে এ বিপদ থেকে রক্ষা কর।

অতঃপর পাথরটি সামান্য সরে গেল কিন্তু তারা বের হতে পারল না।

তৃতীয় ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহ! আমি কিছু কর্মচারী নিয়োগ করেছিলাম এবং সকলকেই পারিশ্রমিক দিয়েছি কিন্তু এক ব্যক্তি তার পারিশ্রমিক না নিয়ে চলে গেল, অতঃপর আমি তার পারিশ্রমিককে বাড়িয়েছি, বাড়তে বাড়তে বহু সম্পদ হয়ে গিয়েছে। বহু দিন পর সে এসে বলল: আব্দুল্লাহ, আমার পারিশ্রমিক দাও। আমি বললাম: এখানে তুমি যা দেখছ উট, গরু, ছাগল এবং কর্মচারী সবই তোমার, সে বলল: আব্দুল্লাহ ! তুমি আমার সহিত ঠাট্টা করো না ! বললাম : আরে আমি তোমার সহিত ঠাট্টা করছি না। অতঃপর সে সব কিছু নিয়ে গেল, কোনো কিছু ছেড়ে যায়নি।

হে আল্লাহ, আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করে থাকি তবে আমাদের বিপদকে দূর করে দাও।

অতঃপর পাথরটি সরে গেল এবং তারা সেখান থেকে বের হয়ে চলে গেল। [বুখারী ও মুসলিম] [বুখারী, ২২৭২, মুসলিম, ২৭৪৩।]।

সৎ আমলের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করার ব্যাপারে এটি একটি জলন্ত প্রমাণ, কারণ এই তিনজন লোকই কঠিন অবস্থায় সৎ আমলকে আল্লাহ তা‘আলার নিকট অসীলা করেছে।

প্রথম ব্যক্তি পিতা-মাতার সহিত সদ্যবহার, তাদের সহিত নম্রভাব এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করাকে অসীলা করেছে, আর এটি আল্লাহর নির্দেশের মধ্যে একটি আমল যা করার জন্য উৎসাহ প্রদান করেছে। তিনি বলেন: (এবং তোমরা পিতা-মাতার প্রতি ইহসান কর।)

দ্বিতীয় ব্যক্তি এক মহিলার প্রেমে আশক্ত হয়ে তার সহিত ব্যভিচার করার সুযোগ পেয়েও তা থেকে বিরত থাকাকে অসীলা করেছে। এটিও একটি ভাল আমল। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৎকর্ম পরায়ন বান্দাদের সম্পর্কে বলেন: (এবং তারা ব্যভিচার করেনা।)

তৃতীয় ব্যক্তি আমানতকে সংরক্ষণ এবং তা আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার নিকট অসীলা করেছে। আর তা একজন চাকরের হক্বকে যথাযথ সংরক্ষণ করে তা তাকে পুরোপুরি ফিরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নিকট অসীলা করেছে। তিনি বলেন: (হে মুমিনগণ তোমরা তোমাদের অঙ্গিকারগুলো আদায় কর।)

যখন তারা এগুলো করল, আল্লাহ তাদের বিপদকে দূর করে দিলেন এবং তাদের উপর পতিত কঠিন অবস্থাকে দূরিভূত করে দিলেন।

এখানে সৎ আমলের অসীলা করে আল্লাহর নিকট দো‘আ করার উপকারিতার উপর একটি নির্দেশনা রয়েছে এতে, সেটি হলো : এর মাধ্যমে দো‘আ কুবল হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

এমনি ভাবে আল্লাহর সুন্দর সুন্দর নাম এবং সমুন্নত গুণাবলীর দ্বারা তাঁর নিকট দো‘আ। কেননা, দো‘আ কুবল হওয়ার কারণসমূহের মধ্যে তা একটি। এজন্যে যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তিকে বলতে শুনেছেন যে, (হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি, হে এক ও অদ্বিতীয়, ভরসাস্থল আল্লাহ, যিনি জনক নন জাতক ও নন এবং যাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, তুমি আমার পাপসমুহকে ক্ষমা করে দাও . . .।) তিঁনি বললেন: তাকে ক্ষমা করা হয়েছে। কথাটি তিনি তিনবার বললেন।