hadith book logo

কুরআন ও সুন্নাহ্‌র আলোকে জান্নাত ও জাহান্নাম

লেখকঃ আব্দুর রহমান বিন সাঈদ বিন আলী বিন ওহাফ আল-কাহতানী রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

প্রথম অধ্যায়: জান্নাত ও জাহান্নামের পরিচিতি এবং নামসমূহের আলোচনা প্রথম পরিচ্ছেদ: জান্নাতের পরিচিতি ও জান্নাতের নামসমূহ:

জান্নাত: জান্নাত শব্দের আভিধানিক অর্থ বাগান। এ শব্দ থেকেই জিনান বলা হয়ে থাকে। আর আরবরা খেজুর গাছকেও জান্নাত বলে আখ্যায়িত করত( [. মুহাম্মদ বিন আবু বকর আর রাযি, মুখতারুস সিহাহ পৃ: ৪৮ [দেখুন: আল্লামা ইবন মানজুর, লিসানুল আরব, পৃ: ১৩/৯৯ এবং আল্লামা আছফাহানী, মুফরাদাতুল কুরআন, পৃ: ২০৪।])।

মুখতার আল-কামুসে জান্নাত শব্দের অর্থ: জান্নাত অর্থ- খেজুর গাছ, বিভিন্ন ধরনের গাছ বিশিষ্ট বাগান। এর বহুবচন জিনানুন( [. আহমদ তাহের আযযাবী, মুখতারুল কামুস, পৃ: ১১৭।])।

পরিভাষায় জান্নাতের সংজ্ঞা: এটি সেই ঘরের একটি ব্যাপক নাম [যে ঘরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার অনুসারীদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন] যাতে রয়েছে অফুরন্ত ও অসংখ্য নেয়ামত, অনাবিল আনন্দ ও প্রশান্তি, অন্তহীন খুশি, আনন্দ ও চিরস্থায়ী শান্তি ( [. এ শব্দটি মূলত: নির্গত হয়েছে ‘সতর’ ও ‘তাগতিয়া’ শব্দদ্বয় হতে। এ কারণেই গর্বজাত সন্তানকে জানিন বলা হয়ে থাকে। কারণ, সে মায়ের পেটে অদৃশ্য ও গোপন থাকে। এবং এ কারণেই বাগানকে জান্নাত বলা হয়ে থাকে, কারণ, তার অভ্যন্তর গাছ গাছালী দ্বারা আবৃত বা গোপন থাকে। আর এ শব্দটি শুধু মাত্র যেখানে অধিক পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের গাছ থাকে সে বাগানের ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। দেখুন: আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. এর ‘হাদিয়ুল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ’ পৃ: ১১১।])।

জান্নাতের নামসমূহ:

জান্নাতের নাম, অর্থ ও শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন, জান্নাতের সিফাতসমূহের বিবেচনায় জান্নাতের নাম একাধিক, কিন্তু জান্নাত একাধিক নয় জান্নাত একটিই। সুতরাং, এ দিকটির বিবেচনায় একাধিক নামের অর্থ অভিন্ন আর জান্নাতের সিফাতসমূহের দিক বিবেচনায় প্রতিটি নামের অর্থ ভিন্ন। অনুরূপভাবে আল্লাহর নাম, আল্লাহর কিতাবের নাম, আল্লাহর রাসূলদের নাম, আখিরাতের নাম ও জাহান্নামের নাম ইত্যাদি( [. আল্লামা ইবনুল কাইয়েম, হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১১।])। [এগুলো সবই এক, কিন্তু সিফাত একাধিক হওয়ার কারণে এগুলোর নাম একাধিক]

জান্নাতের নামসমূহ:

১- জান্নাত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ٱدۡخُلُواْ ٱلۡجَنَّةَ بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ ٣٢﴾ [ النحل : ٣٢ ]

“জান্নাতে প্রবেশ কর, যে আমল তোমরা করতে তার কারণে” [. সূরা আন-নাহাল আয়াত: ৩২]।

২- দারুস-সালাম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿وَٱللَّهُ يَدۡعُوٓاْ إِلَىٰ دَارِ ٱلسَّلَٰمِ وَيَهۡدِي مَن يَشَآءُ إِلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ ٢٥﴾ [ يونس : ٢٥ ]

“আর আল্লাহ শান্তির আবাসের দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন সরল পথের দিকে”( [. সূরা ইউনুস, আয়াত: ২৫]) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও এরশাদ করেন,

﴿۞لَهُمۡ دَارُ ٱلسَّلَٰمِ عِندَ رَبِّهِمۡۖ وَهُوَ وَلِيُّهُم بِمَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ١٢٧ ﴾ [ الانعام : ١٢٧ ]

“তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে শান্তির আবাস এবং তারা যে আমল করত, তার কারণে তিনি তাদের অভিভাবক”।( [. সূরা আল-আনয়াম, আয়াত: ১২৭]) [যাবতীয় সকল বিপদ আপদ হতে এটি একটি শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর( [. হাদিয়ুল আরহওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ পৃ: ১১৩]).।]

৩- দারুল খুলুদ ( [. এ বলে নামকরণ করার কারণ হল, জান্নাতীরা কখনোই তা হতে বের হবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ﴿عَطَآءً غَيۡرَ مَجۡذُوذٖ ١٠٨﴾ [ هود : ١٠٨ ] ‘অব্যাহত প্রতিদানস্বরুপ’। সূরা হুদ, আয়াত: ১০৮। আল্লাহ আরও বলেন, ﴿ إِنَّ هَٰذَا لَرِزۡقُنَا مَا لَهُۥ مِن نَّفَادٍ ٥٤﴾ [ص: ٥٤ ] ‘নিশ্চয় এটি আমার দেয়া রিযিক, যা নি:শেষ হওয়ার নয়’। সূরা সাদ, আয়াত: ৫৪। আল্লাহ আরও বলেন, ﴿وَمَا هُم مِّنۡهَا بِمُخۡرَجِينَ ٤٨ ﴾ [ الحجر : ٤٨ ] ‘তবে তারা তা হতে বের হবে না’। সূরা আল-হিজর আয়াত: ৪৮।]): আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ ٱدۡخُلُوهَا بِسَلَٰمٖۖ ذَٰلِكَ يَوۡمُ ٱلۡخُلُودِ ٣٤ ﴾ [ق: ٣٤ ]

“তোমরা তাতে শান্তির সাথে প্রবেশ কর। এটাই স্থায়িত্বের দিন” [. সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৪।]।

৪- দারুল মুকামাহ: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿ ٱلَّذِيٓ أَحَلَّنَا دَارَ ٱلۡمُقَامَةِ مِن فَضۡلِهِۦ لَا يَمَسُّنَا فِيهَا نَصَبٞ وَلَا يَمَسُّنَا فِيهَا لُغُوبٞ ٣٥ ﴾ [ فاطر : ٣٥ ]

‘যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে স্থায়ী নিবাসে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোন কষ্ট আমাদেরকে স্পর্শ করে না এবং যেখানে কোন ক্লান্তিও আমাদেরকে স্পর্শ করে না [. সূরা ফাতের, আয়াত: ৩৫।].’।

৫- জান্নাতুল মাওয়া: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿عِندَهَا جَنَّةُ ٱلۡمَأۡوَىٰٓ ١٥﴾ [ النجم : ١٥ ]

“যার কাছে জান্নাতুল মা’ওয়া অবস্থিত” [. সূরা আন-নজম, আয়াত: ১৫।] ।

৬- জান্নাতু আদন [. জান্নাতে আদন: অর্থাৎ স্থায়ী ও চিরঞ্জীব জান্নাত। প্রবাদে বলা হয়ে থাকে, عَدَن المكان যখন তা নিয়ে দাঁড়ায়। সুতরাং এ হল, জান্নাত যাকে প্রতিষ্ঠিত করা হল, হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৪।]: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন,

﴿جَنَّٰتِ عَدۡنٍ ٱلَّتِي وَعَدَ ٱلرَّحۡمَٰنُ عِبَادَهُۥ بِٱلۡغَيۡبِۚ إِنَّهُۥ كَانَ وَعۡدُهُۥ مَأۡتِيّٗا ٦١﴾ [ مريم : ٦١ ] .

“তা চিরস্থায়ী জান্নাত, যার ওয়াদা পরম করুণাময় তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন গায়েবের সাথে। নিশ্চয় তাঁর ওয়াদা-কৃত বিষয় অবশ্যম্ভাবী” [. সূরা মারয়াম, আয়াত: ৬১।]।

৭- আল ফিরদাউস: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ كَانَتۡ لَهُمۡ جَنَّٰتُ ٱلۡفِرۡدَوۡسِ نُزُلًا ١٠٧﴾ [ الكهف : ١٠٧ ]

“নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস” [. সূরা কাহাফ, আয়াত: ১০৭।], [.ফিরদাউস: এমন বাগান যাতে রয়েছে সব ধরনের গাছ গাছালি এবং বিভিন্ন বাগানে যা থাকে তা সবই এক জায়গায় অর্থাৎ ঐ বাগানে পাওয়া যায়, তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। দেখুন: আল্লামা ইবনে হাজরের ফতহুল বারী ১৩/৬, কামুসুল মুহিত পৃ: ৭২৫। ফিরদাউস: এমন জান্নাত যা সব জান্নাতের বিষয়ে ব্যবহার করা যায় অথবা সর্বত্তোম ও সর্ব উৎকৃষ্ট জান্নাতকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে, এ জান্নাতটি অন্যান্য জান্নাতের তুলনায় এ নামে নাম করণ করা বিষয়ে অধিক উপযুক্ত। [হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ১১৬] আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন, জান্নাত হল, গোলাকার গম্বুজের মত। সর্বোৎকৃষ্ট, প্রশস্ত ও সর্বোত্তম জান্নাত হল, জান্নাতুল ফিরদাউস। আর এ জান্নাতের ছাদ হল, আল্লাহর আরশ। যেমন, সহীহ হাদিসে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, « إذا سألتم الله فاسألوه الفردوس؛ فإنه أوسط الجنة، وأعلى الجنة، وفوقه عرش الرحمن، ومنه تفجَّر أنهار الجنة » “তোমরা যখন আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করবে। কারণ, তা হল, উৎকৃষ্ট জান্নাত ও উন্নত জান্নাত। এ জান্নাতের উপর রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ। তা হতে জান্নাতের নহর সমূহ প্রবাহিত হয়”। [বুখারি ২৭৯০, ৭৪২৩] হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ৮৪।] ।

৮- জান্নাতুন নাঈম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ لَهُمۡ جَنَّٰتُ ٱلنَّعِيمِ ٨﴾ [ لقمان : ٨ ]

“নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে নিআমতপূর্ণ জান্নাত;”

৯- আল মাকামুল আমীন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন, ﴿إِنَّ ٱلۡمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٖ ٥١﴾ [ الدخان : ٥١ ] ( [.সূরা দুখান, আয়াত: ৫১।]) ( [.মাকাম শব্দের অর্থ: অবস্থানের জায়গা। আর আল আমীন অর্থ সব ধরনের খারাবী ও বিপদ-আপদ হতে নিরাপদ হওয়া। এটি ঐ জান্নাতকে বলা হয়, যে জান্নাত সব ধরনের নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভূক্ত করে। [হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৬]]). “নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে”,

১০- মাকয়াদু সিদকীন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন,

﴿فِي مَقۡعَدِ صِدۡقٍ عِندَ مَلِيكٖ مُّقۡتَدِرِۢ ٥٥﴾ [ القمر : ٥٥ ]

“যথাযোগ্য আসনে, সর্বশক্তিমান মহা অধিপতির নিকটে”( [.মাকয়াদে সিদক: এটি একটি জান্নাতের নাম। এ জান্নাতকে এ নামে নাম করণ করার, এ জান্নাতে যত সুন্দর সুন্দর আসন ও বসার স্থান চাওয়া হয়, সবই পাওয়া যায়। যেমন বলা হয় ‘সত্যিকার মহব্বত’ যখন তার মধ্যে সত্যিকার ও পরিপূর্ণরূপে মহব্বত পাওয়া যায়। [হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৭]]).।