hadith book logo

ইসলামী আইন না মানার বিধান কিছু প্রশ্ন ও তার উত্তর

লেখকঃ ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

প্রথমত: যারা ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম জানে না, তারা দু ভাগে বিভক্ত:

ক) তাদের অনেকেই ইসলাম যে একটি পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা, সে সম্পর্কেই অজ্ঞ। তাদের অনেকেই জানে না ইসলামে যাবতীয় বিষয়ের সমাধান আছে। মনে করে ইসলাম শুধুমাত্র কলেমার মৌখিক উচ্চারণ, সালাত, সাওম, যাকাত ও হজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কালেমার অর্থই তারা জানে না, জানতে চেষ্টা করে না। কেননা কালেমার অর্থই হলো: আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই, হক কোনো মা‘বুদ নেই। আর মা‘বুদ শব্দের অর্থ হলো: নির্দ্বিধায় যার ইবাদাত করা হয়, যার কথা মানা হয়, যার হুকুম-আহকাম তথা বিধি-বিধান বাস্তবায়িত হয়, যার কথা ও নির্দেশ অন্য সব কিছুর ওপর প্রাধান্য পায়।

এ সমস্ত লোকদের জন্য প্রয়োজন দীন সম্পর্কে সঠিক দিক নির্দেশনা লাভ করা, প্রচুর পরিমাণে দীনি বই-পত্র পাঠ করা। কুরআন অধ্যয়ন করা, হাদীস অধ্যয়ন করা, সিরাতে-রাসূলের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) চর্চা করা, সাহাবায়ে কেরামের জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। আর তখনই তারা জানতে পারবে যে, যাকে তারা রব বা পালনকর্তা হিসেবে মানে তাঁর রবুবিয়্যাতের শর্ত হলো, তিনি তাঁর ‘মারবুব’ বা যাদেরকে পালন করবেন তাদেরকে শুধু সৃষ্টি করার দ্বারাই রবুবিয়্যাতের দায়িত্ব শেষ করে দেন নি, বরং দুনিয়ার বুকে তাদেরকে লালন-পালনের পাশাপাশি দুনিয়াতে তারা কীভাবে নিজেদের মধ্যকার যাবতীয়

কাজ তাঁর সন্তুষ্টি বিধানে পরিচালিত হবে, কীভাবে তাদের মধ্যকার সৃষ্ট অপরাধসমূহের প্রতিকার হবে তারও সুবন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। সুতরাং রবুবিয়্যাত বা পালনকর্তা হিসেবে তাঁর কাজ হলো বান্দাকে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর নীতি অনুসারে চলতে দেওয়া এবং সে অনুযায়ী আইন ও বিধানাবলি দেওয়া। তাই সে আইনের বিরোধিতা করে চললে আল্লাহকে রব মানার ক্ষেত্রে ছেদ পড়ে। তাঁকে রব বা পালনকর্তা হিসেবে মানা হয় না। আল্লাহ তা‘আলা তাই বলেন, إِنِ الْحُكْمُ إِلاَّ لِلّهِ “হুকুম বা বিধান দানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর”। [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০, ৬৭]

কেননা তিনিই তো রব, সুতরাং আইনও দিবেন সেই রবই, অন্য কাউকে যদি আইন প্রদানের মালিক মনে করা হয় তবে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকেই রব মানা হয়; যা প্রকাশ্য বড় শির্ক। আর এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলা যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো আইন মানবে তাদের সম্পর্কে বলেছেন:

﴿أَفَحُكۡمَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ يَبۡغُونَۚ وَمَنۡ أَحۡسَنُ مِنَ ٱللَّهِ حُكۡمٗا لِّقَوۡمٖ يُوقِنُونَ ٥٠﴾ [ المائ‍دة : ٥٠ ]

“তারা কি জাহেলিয়াতের আইন চায়? দৃঢ়বিশ্বাসীগণের জন্য আল্লাহর চেয়ে উত্তম হুকুম-বিধান দাতা আর কে হতে পারে?” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫০]

এখানে জাহেলিয়্যাতের আইন বলতে আল্লাহ কর্তৃক প্রণীত আইন ছাড়া যাবতীয় আইনকেই বুঝানো হয়েছে। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক প্রণীত আইনের বাইরে যত প্রকার মানব রচিত আইন রয়েছে, তার সবই জাহেলী আইন, যেমন ইংরেজদের রেখে যাওয়া আইন, রোমান আইন ইত্যাদি।

খ) আরেক ধরনের লোক আছে যারা জানে যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা, কিন্তু তারা জানে না যে, ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম কী? তাদের অনেকেই মনে করে যে, ইসলামী আইন গতানুগতিক আইনের মত। এর বাস্তবায়নের বিরোধিতা করলে তাদের ঈমানের কোনো ক্ষতি হবে না। তারা ইসলামকে নিছক কিছু কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করে থাকে।

এ সমস্ত লোকদের জন্য যা প্রয়োজন তা হলো, ইসলামী আইনের বাস্তবায়নের হুকুম সম্পর্কে অবগত হওয়া। কেননা তাদের অনেকেই জানেনা যে, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন না করা কুফুরী, যা ঈমান নষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡكَٰفِرُونَ ٤٤﴾ [ المائ‍دة : ٤٤ ]

“আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য সম্পাদন করে না, তারা কাফির। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৪৪]

তিনি আরও বলেন,

﴿وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّٰلِمُونَ ٤٥﴾ [ المائ‍دة : ٤٥ ]

“আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য সম্পাদন করে না, তারা যালিম।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৪৫]

আরও বলেন,

﴿وَمَن لَّمۡ يَحۡكُم بِمَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ فَأُوْلَٰٓئِكَ هُمُ ٱلۡفَٰسِقُونَ ٤٧﴾ [ المائ‍دة : ٤٧ ]

“আর যারা আল্লাহর অবতীর্ণ আইন অনুসারে বিচারকার্য সম্পাদন করে না, তারা ফাসেক।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৪৭]

মূলত আল্লাহর আইন অনুসারে না চলার কয়েকটি পর্যায় হতে পারে:

১) আল্লাহর আইন ছাড়া অন্য কোনো আইনে বিচার-ফয়সালা পরিচালনা জায়েয মনে করা।

২) আল্লাহর আইন ব্যতীত অন্য কোনো আইন দ্বারা শাসন কার্য পরিচালনা উত্তম মনে করা।

৩) আল্লাহর আইন ও অন্য কোনো আইন শাসনকার্য ও বিচার ফয়সালার ক্ষেত্রে সমপর্যায়ের মনে করা।

৪) আল্লাহর আইন পরিবর্তন করে তদস্থলে অন্য কোনো আইন প্রতিষ্ঠা করা।

উপরোক্ত যে কোনো একটি কেউ বিশ্বাস করলে সে সর্বসম্মতভাবে কাফির হয়ে যাবে। [এর জন্য দেখুন: শাইখ মুহাম্মাদ ইবন ইবরাহীম আল-শাইখ প্রণিত গ্রন্থ ‘তাহকীমুল কাওয়ানীন’। তবে এ সাধারণ বিধান কোন ব্যক্তির ওপর প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ সুনির্দিষ্টভাবে কাউকে কাফির বলা যাবে না। কারণ, কাউকে সুনির্দিষ্টভাবে কাফির বলার ব্যাপারেও ইসলাম কয়েকটি শর্ত দিয়েছে। সেগুলো হচ্ছে, এক. যে কথা, কাজ বা কোনো কাজ পরিত্যাগ করা কুফুরী বলা হচ্ছে তা কুফুরী হওয়ার ব্যাপারটি কুরআন ও সুন্নাহর দলীল দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে।দুই. ব্যক্তির সাথে সে বিষয়টি সম্পৃক্ত হতে হবে। তিন. সে ব্যক্তির কাছে প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। চার. সে ব্যক্তিকে কাফের বলার বাধাসমূহ অপসারিত হতে হবে। উপরোক্ত শর্তসমূহ সম্পূর্ণভাবে প্রাপ্ত হওয়া এবং যাবতীয় বাধা দূরিভূত হওয়ার পরই কেবল কাউকে কাফির বলা যাবে। সুতরাং আমরা যেন তড়িঘড়ি করে কাউকে কাফির বলার চেষ্টা না করি।]