hadith book logo

ইখলাস কেন ও কীভাবে

লেখকঃ গবেষণা পরিষদ আল-মুনতাদা আল-ইসলামী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৪

৯. ইখলাসপূর্ণ নিয়তের মাধ্যমে পরিপূর্ণ আমলের সাওয়াব অর্জন:

কোনো কোনো সময় ইখলাস ও বিশুদ্ধ নিয়তে কাজ করতে উদ্যোগী হয়, কিন্তু তার সম্পদের সীমাবদ্ধতা, শারীরিক দুর্বলতা-ইত্যাদি কারণে কাজটি সমাধা করতে পারে না। কখনো দেখা যায়, উক্ত ভালো কাজটি করার জন্য সে প্রবল প্রচেষ্টা চালিয়েছিল, কিন্তু কোনো কারণে কাজটি আঞ্জাম দিতে পারে নি। এমতাবস্থায় সে কাজটি সম্পন্ন করার সাওয়াব পেয়ে যাবে এবং তার ইখলাসের কারণে কাজটি যারা করতে পেরেছে তাদের সমমর্যাদা লাভ করবে।

যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«إِنَّ أَقْوَامًا بِالْمَدِينَةِ خَلْفَنَا، مَا سَلَكْنَا شِعْبًا وَلاَ وَادِيًا إِلَّا وَهُمْ مَعَنَا فِيهِ، حَبَسَهُمُ العُذْرُ»

“আমরা কয়েকটি দলকে মদীনায় রেখে এসেছি। আমরা যে পাহাড়ই অতিক্রম করি আর যে উপত্যকাই মাড়াই না কেন, তারা সেখানেই আমাদের সাথে রয়েছেন; কারণ ওযরই কেবল তাদেরকে আটকে রেখেছে।” [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৩৯।]

হাদীসে বর্ণিত সাহাবীগণ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে অভিযানে অংশ নিতে পারেন নি কোনো অসুবিধার কারণে; কিন্তু তাদের বিশুদ্ধ নিয়ত ও ইখলাস ছিল অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য। তাই তারা অংশ গ্রহণ না করেও অংশগ্রহণকারীদের সমমর্যাদার অধিকারী হলেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:

«مَنْ أَتَى فِرَاشَهُ وَهُوَ يَنْوِي أَنْ يَقُومَ يُصَلِّي مِنَ اللَّيْلِ فَغَلَبَتْهُ عَيْنَاهُ حَتَّى أَصْبَحَ كُتِبَ لَهُ مَا نَوَى وَكَانَ نَوْمُهُ صَدَقَةً عَلَيْهِ مِنْ رَبِّهِ عَزَّ وَجَلَّ»

“যে ব্যক্তি শেষ রাতে তাহাজ্জুদ আদায় করবে -এ নিয়তে শুয়ে পড়ল। অবশেষে নিদ্রা তাকে কাবু করে ফেলল এবং সকাল হওয়ার আগে জাগতে পারল না। এমতাবস্থায় সে যা নিয়ত করেছিল তা তার জন্য লেখা হয়ে যাবে এবং এ নিদ্রা তার রবের পক্ষ থেকে তার ওপর দান হিসেবে ধরা হবে।” [নাসাঈ, হাদীস নং ১৭৮৭।]

তাহাজ্জুদের নিয়ত করেও এ ব্যক্তি তাহাজ্জুদ পড়তে পারল না বটে কিন্তু ইখলাস ও বিশুদ্ধ নিয়তের কারণে সে তাহাজ্জুদের পূর্ণ সাওয়াব পাবে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন:

«مَنْ سَأَلَ اللهَ الشَّهَادَةَ بِصِدْقٍ، بَلَّغَهُ اللهُ مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ، وَإِنْ مَاتَ عَلَى فِرَاشِهِ»

“যে বিশুদ্ধ মনে জিহাদে শরীক হয়ে আল্লাহর কাছে শহীদ হওয়া কামনা করবে, আল্লাহ তাকে শহীদের মর্যাদা দান করবেন যদিও সে বিছানায় মৃত্যুবরণ করে।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯০৯।]

ইখলাস বা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার লক্ষ্যে যে শহীদ হওয়ার আকাঙ্খা করবে, সে শহীদ না হতে পারলেও আল্লাহ তাকে তার ইখলাসের করণে শহীদের মর্যাদা দান করবেন। আরেকটি হাদীসে উল্লেখ করা যেতে পারে। তা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«قَالَ رَجُلٌ لَأَتَصَدَّقَنَّ اللَّيْلَةَ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدِ زَانِيَةٍ، فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ اللَّيْلَةَ عَلَى زَانِيَةٍ، قَالَ : اللهُمَّ، لَكَ الْحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ، لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدِ غَنِيٍّ، فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ : تُصُدِّقَ عَلَى غَنِيٍّ، قَالَ : اللهُمَّ، لَكَ الْحَمْدُ عَلَى غَنِيٍّ، لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ، فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدِ سَارِقٍ، فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ : تُصُدِّقَ عَلَى سَارِقٍ، فَقَالَ : اللهُمَّ، لَكَ الْحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ، وَعَلَى غَنِيٍّ، وَعَلَى سَارِقٍ، فَأُتِيَ فَقِيلَ لَهُ : أَمَّا صَدَقَتُكَ فَقَدْ قُبِلَتْ، أَمَّا الزَّانِيَةُ فَلَعَلَّهَا تَسْتَعِفُّ بِهَا عَنْ زِنَاهَا، وَلَعَلَّ الْغَنِيَّ يَعْتَبِرُ فَيُنْفِقُ مِمَّا أَعْطَاهُ اللهُ، وَلَعَلَّ السَّارِقَ يَسْتَعِفُّ بِهَا عَنْ سَرِقَتِهِ»

“এক ব্যক্তি নিয়ত করল যে, আমি রাতে কিছু সাদাকা (দান) করব। যখন রাত এল সে সাদাকা করল। কিন্তু সাদকা পড়ল এক ব্যভিচারী মহিলার হাতে। সকাল হলে লোকজন বলতে শুরু করল, গত রাতে জনৈক ব্যক্তি এক ব্যভিচারীকে সাদাকা দিয়েছে। এ কথা শুনে দানকারী বলল, হে আল্লাহ! ব্যভিচারীকে সাদাকা দেওয়ার ব্যাপারে তোমারই প্রশংসা। আমি রাতে আবার একটি সাদাকা করব। পরের রাতে যখন সে সাদাকা করল, তা পড়ল একজন ধনীর হাতে। যখন সকাল হলো তখন লোকজন বলাবলি শুরু করল গত রাতে জনৈক ব্যক্তি এক ধনীকে সাদাকা দিয়েছে। এ কথা শুনে দানকারী বলল, হে আল্লাহ! ধনীকে সাদাকা দেওয়ার ব্যাপারে তোমারই প্রশংসা। আমি রাতে আবার একটি সাদাকা করব। যখন পরের রাতে সে সাদাকা করল, তা পড়ল একজন চোরের হাতে। যখন সকাল হলো তখন লোকজন বলতে শুরু করল, গত রাতে এক ব্যক্তি এক চোরকে সাদাকা দিয়েছে। এ কথা শুনে দানকারী বলল, হে আল্লাহ! ব্যভিচারী, ধনী ও চোরকে সাদাকা দেওয়ার ব্যাপারে তোমারই প্রশংসা। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে তাকে বলা হলো, তোমার সকল সাদাকাহ (দান)-ই কবুল করা হয়েছে। সম্ভবত তোমার সাদাকার কারণে ব্যভিচারী মহিলা তার পতিতাবৃত্তি থেকে ফিরে আসবে। ধনী ব্যক্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করতে উৎসাহী হবে। চোর তার চুরি কর্ম থেকে ফিরে আসবে।” [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৪২১; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১০২২।]

দেখুন, এ ব্যক্তি তার সাদাকা বা দান করার ব্যাপারে এতটাই ইখলাস (আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার নিয়ত) গ্রহণ করেছিল যে, সাদাকা প্রদানে তার অতি গোপনীয়তা কাউকেই বিষয়টি সম্পর্কে জানতে দেয় নি। এ গোপনীয়তা রক্ষার কারণে বার বার এ সাদাকা অনাকাংখিত হাতে পড়লেও সে তার ইখলাস থেকে সরে আসে নি। ইখলাস অবলম্বনে ছিল অটল। ফলে তার কোনো সাদাকা ব্যর্থ হয় নি।

ইবন হাজার রহ. বলেন, এ হাদীস দ্বারা বুঝে আসে দানকারী নিয়ত বিশুদ্ধ থাকলে তার দান অনাকাংখিত স্থানে পড়লেও তার দান বা সাদাকা আল্লাহর কাছে কবুল হবে। [ফাতহুল বারী: ইবন হাজার।]