hadith book logo

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদার সংক্ষিপ্ত মূলনীতি

লেখকঃ ড. নাসের ইবন আবদুল করীম আল-আকল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

সপ্তম অধ্যায়: আল জামা‘আত ও আল ইমামত (সংঘবদ্ধ জীবন ও নেতৃত্ব)

১. এখানে জামা‘আত বলতে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন এবং কিয়ামত পর্যন্ত তাদের অনুসারীদের বুঝান হয়েছে এবং এই দলই হলো পরিত্রাণপ্রাপ্ত দল, যে ব্যক্তি তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে ব্যক্তিও ঐ জামা‘আতের অন্তর্ভুক্ত, যদিও কোনো ছোট-খাট বিষয়ে ভুল-ত্রুটি করে।

২. দীনের মধ্যে বিভেদ বা দলাদলি ও মুসলিমদের মধ্যে ফিতনা সৃষ্টি করা জায়েয নয়। কোনো বিষয়ে মতানৈক্য দেখা দিলে কুরআন, সুন্নাহ ও আমাদের সালাফে সালেহীন তথা সঠিক পথের পূর্বসূরীদের মতের দিকে প্রত্যাবর্তন করা কর্তব্য।

৩. জামা‘আত থেকে বেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিকে সৎ পরামর্শ দেওয়া এবং এর প্রতি আহ্বান করা উচিৎ। এছাড়া তাঁর সাথে সুন্দর পন্থায় বুঝাপড়া করা এবং কুরআন হাদীসের দলীল প্রমাণ পেশ করার মাধ্যমে তা প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত করে দায়িত্বমুক্ত হওয়া কর্তব্য। এরপর তাওবা করে ফিরে আসলে তো ভালোই নচেৎ শরী‘আতের বিধানে যে শাস্তি ভোগ করা দরকার তাই করবে।

৪. কুরআন, হাদীস ও সুষ্পষ্ট ইজমা‘র ভিত্তিতে সাব্যস্ত বিষয়াদিতেই কেবল মানুষদের চলতে বাধ্য করতে হবে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে তাত্বিক ও সূক্ষ্ম বিষয়াদি দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত করা অবৈধ।

৫. সকল মুসলিমের ব্যাপারে মূল কথা হচ্ছে যে, তারা সঠিক উদ্দেশ্য ও বিশ্বাসে রয়েছেন। যতক্ষণ না তাদের থেকে এর বিপরীত কোনো কাজ পরিলক্ষিত না হয়। অনুরূপভাবে সকল সাধারণ মানুষের কথার ব্যাপারে মূল কথা হচ্ছে, তাদের কথাকে উত্তম অর্থে গ্রহণ করা। কিন্তু ইসলাম সম্পর্কে যার অবাধ্যতা ও অসৎ উদ্দেশ্য প্রকাশিত হয়ে যাবে, তা ধামা-চাপা দেওয়ার জন্য অপব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করা যাবে না।

৬. কিবলার অনুসারী কিন্তু কুরআন-সুন্নাহ’র পরিপন্থী সকল ফির্কা বা দলই ধ্বংস ও জাহান্নামের শাস্তির হুমকিপ্রাপ্ত। তাদের ও অন্যান্য শাস্তির সংবাদপ্রাপ্তদের একই হুকুম। তবে কোনো ব্যক্তি যদি বাহ্যিকভাবে মুসলিম কিন্তু ভেতরগতভাবে কুফুরী করে তাহলে তার হুকুম ভিন্ন।

আর ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাওয়া সকল ফির্কা সার্বিকভাবে কাফির, তাদের ও ধর্ম-ত্যাগী মুরতাদদের বিধান একই।

৭. জুমু‘আর সালাত এবং জামা‘আতের সাথে সালাত আদায় ইসলামের প্রকাশ্য বড় নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।

কোনো মুসলিমের ব্যক্তিগত অবস্থা না জেনে তার পেছনে সালাত আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে এবং কারো ব্যক্তিগত অবস্থা না জানার দোহাই দিয়ে তার পেছনে সালাত আদায় করা থেকে বিরত থাকা বিদ‘আত।

৮. কোনো ব্যক্তির বিদ‘আত বা অপকর্ম প্রকাশ হয়ে পড়লে এবং এমতাবস্থায় অন্য কারো পেছনে সালাত আদায় করার সুযোগ থাকলে ঐ ব্যক্তির পেছনে সালাত আদায় করা অনুচিত, তবে যদি সালাত আদায় করে ফেলা হয় তাহলে সালাত হয়ে যাবে, কিন্তু মুক্তাদী এ কারণে গুণাহগার হবে। তবে যদি বড় ধরনের কোনো ফিতনা ঠেকাবার উদ্দেশ্যে এ কাজ করে, সেটা ভিন্ন কথা। আর যদি অন্য ইমামও এই বিদ‘আতী ইমামের অনুরূপ হয় অথবা তার চাইতে আরো খারাপ হয়, তবে ঐ ইমামের পেছনে সালাত আদায় করা জায়েয হবে এবং এ অজুহাতে জামা‘আত ত্যাগ করা যাবে না। কিন্তু কোনো ব্যক্তির ওপর কুফুরীর হুকুম দেওয়া হলে কোনো অবস্থাতেই তার পেছনে সালাত আদায় করা যাবে না।

৯. রাষ্ট্র প্রধানের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হবে উম্মতের ঐক্যের ভিত্তিতে অথবা দেশের ভাঙ্গা-গড়ার ক্ষমতা রাখেন এমন গ্রহণযোগ্য (প্রধান প্রধান আলিম ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য দায়িত্ববান) ব্যক্তিদের বাই‘আত গ্রহণ করার মাধ্যমে। যদি কেউ জোর করে ক্ষমতা দখল করে, এরপর জনগণ যদি তার শাসন মেনে নেয় তাহলে সৎভাবে তার আনুগত্য করা, তাকে সৎ উপদেশ দেওয়া সকলের ওপর ওয়াজিব এবং তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম। একমাত্র তখনই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে যখন তার থেকে সুষ্পষ্ট কোনো কুফুরী পরিলক্ষিত হবে, যে কুফুরীর ব্যাপারে তোমাদের নিকট প্রমাণ রয়েছে।

১০. মুসলিমদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিরা অন্যায়মূলক কোনো আচরণ করলেও তাদের পেছনে সালাত আদায় করা বা তাদের সাথে হজ করা এবং তাদের নেতৃত্বে জিহাদ করা কর্তব্য।

১১. পার্থিব বিষয়াদি নিয়ে মুসলিমদের পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ করা হারাম। মূর্খতামূলক জেদা-জেদি করে একে অন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া কবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। শুধুমাত্র যুদ্ধ করা জায়েয বিদ‘আতী, সীমালঙ্ঘনকারী এবং এদের মতো অন্যান্যদের সাথে, যদিও যুদ্ধ ছাড়া এর থেকে স্বল্প কিছু দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়। আবার কখনও কখনও অবস্থা ও স্বার্থ পর্যালোচনা করার পর এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কর্তব্যও হয়ে যাবে।

১২. সাহাবায়ে কেরাম প্রত্যেকেই ন্যায়পরায়ণ এবং মুসলিম উম্মার সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিবর্গ, সাহাবায়ে কেরামের ঈমান ও ফযীলতের স্বাক্ষ্য দেওয়া একটি অকাট্য মূলনীতি ও দীনের অত্যাবশ্যকীয় কাজ। আর তাদেরকে মহব্বত করা দীন ও ঈমানের দাবী। তাদের সাথে শত্রুতা করা কুফুরী ও মুনাফেকী। তাদের মাঝে যে সমস্ত বিষয় নিয়ে মতবিরোধ বা বিবাদ হয়েছে তা নিয়ে বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়া উচিৎ নয়। তাদের সম্মানের ক্ষতিকর বিষয় আলোচনা পরিত্যাগ করা বাঞ্চনীয়।

তাদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম যথাক্রমে আবূ বকর, উমার, উসমান ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং এই চার জনকেই বলা হয় খোলাফায়ে রাশেদা, ক্রমানুসারে তাদের খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

১৩. প্রত্যেক মুসলিমের নিকট দীনের অন্যতম আরো একটি দাবী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবার পরিজনকে ভালোবাসা এবং তাদেরকে আপন মনে করা এবং তাদের স্ত্রীদের সম্মান ও তাদের মর্যাদা অনুধাবন করা। দীনের আরো দাবী সমস্ত সাহাবী, তাবে‘ঈ ও রাসূলের সুন্নাতের অনুসারী সকল আলিমদের ভালোবাসা এবং বিদ‘আতী ও বুপ্রবৃত্তির অনুসারী ব্যক্তিদের সঙ্গ ত্যাগ করা।

১৪. আল্লাহর পথে জিহাদ করা ইসলামের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ। আর কিয়ামত পর্যন্ত আল্লাহর পথে জিহাদ চলতেই থাকবে।

১৫. সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ ইসলামের অন্যতম একটি নিদর্শন এবং ইসলামী জামা‘আতকে টিকিয়ে রাখার এটি একটি উত্তম হাতিয়ার, সমর্থ অনুযায়ী এ কাজ করা সকল মুসলিমের ওপর কর্তব্য এবং স্বার্থ ও অবস্থার আলোকে এ দায়িত্বকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।