hadith book logo

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকীদার সংক্ষিপ্ত মূলনীতি

লেখকঃ ড. নাসের ইবন আবদুল করীম আল-আকল • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১২

আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের প্রধান প্রধান বৈশিষ্ট্য ও তার পরিচয়

আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতকে পরিত্রাণপ্রাপ্ত ও সাহায্যপ্রাপ্ত দলও বলা হয়। এ জামা‘আতের লোকদের পরস্পরের মধ্যে কিছুটা পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিকভাবে তাদের কিছু নিদর্শন আছে যা দিয়ে তাদেরকে চিহ্নিত করা যায়। নিম্নে তা বর্ণিত হলো:

১. আল্লাহর কিতাবের ব্যাপারে গুরুত্ব প্রদান: তারা কুরআন তিলাওয়াত, অধ্যয়ন ও গবেষণার মধ্যদিয়ে এটির গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসকে জেনে-বুঝে এবং সহীহ হাদীসকে দুর্বল হাদীস থেকে চিহ্নিত করে হাদীসের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। (এর কারণ হলো, কুরআন ও সুন্নাহই তাদের জ্ঞানের মুল উৎস) এছাড়া তারা জ্ঞান অর্জন করে তা আমলে পরিণত করেন।

২. পরিপূর্ণভাবে দীনের মধ্যে প্রবেশ করা: পুরো কু্রআনের ওপর বিশ্বাস করা। সুতরাং তারা কুরআনে আলোচিত ভালো ওয়াদা সম্পর্কিত আয়াতসমূহ এবং শাস্তির হুমকি সংক্রান্ত আয়াতসমূহের ওপর ঈমান আনে। যেমনিভাবে তারা আল্লাহর গুণাগুণ সাব্যস্ত আয়াতসমূহে ঈমান ও যে সমস্ত গুণাগুণ থেকে আল্লাহ পবিত্র সেগুলো যেসব আয়াতে বর্ণিত হয়েছে তাতেও ঈমান রাখেন। আর তারা তারা সমন্বয় সাধন করেন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত তাকদীরে ঈমান আনয়নের পাশাপাশি বান্দার জন্য ইচ্ছা, চাওয়া ও কার্যক্ষমতা সাব্যস্ত করেন। অনুরূপভাবে তারা সমন্বয় বজায় রাখেন ইলম ও ইবাদতে, শক্তি ও রহমতে, উপায় অবলম্বন করে কাজ করা ও পরহেযগারী করে দুনিয়া বিমুখতায়।

৩. অনুসরণ করা ও বিদ‘আত পরিত্যাগ করা: তারা অনুসরণ করেন এবং বিদ‘আতকে পরিহার করেন, সংঘবদ্ধ জীবন যাপন করেন এবং দীনের মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী সকল পথ বর্জন করেন।

৪. হিদায়াতের ন্যায়পরায়ণ ইমামদের অনুকরণ, অনুসরণ: তারা হিদায়াত পাওয়ার জন্য সাহাবায়ে কেরাম এবং যারা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন, যারা ছিলেন ইলম, আমল ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব এমন হিদায়াতের ধারক ও বাহক ইমামদের পথ অনুসরণ করেন এবং যারা উক্ত ইমামদের বিরোধিতা করে তাদেরকে পরিহার করেন।

৫. তারা মধ্যম পন্থা অবলম্বনকারী: অর্থাৎ আকীদা সংক্রান্ত বিষয়ে না তারা অতিরঞ্জিতকারীদের মতো, না এ বিষয়কে তুচ্ছ ও অবজ্ঞা পোষণকারীদের মতো। এভাবে সমস্ত কাজকর্ম এবং আচার ব্যবহারে তারা বাড়াবাড়ি ও কমতি এ দু’য়ের মধ্যমপন্থা অবলম্বনকারী।

৬. সব সময় তারা মুসলিমদের সত্য পথে একত্রিত করতে সচেষ্ট থাকে। আর তারা (আল্লাহর) তাওহীদ ও (রাসূলের) অনুসরণের ওপর মুসলিমদের সকল কাতার একত্রিত করার জন্য এবং তাদের মাঝে অনৈক্যসৃষ্টিকারী সকল কিছুকে দূরীভূত করার জন্য সচেষ্ট থাকেন।

কাজেই দীনের মৌলিক বিষয়গুলোতে মুসলিম উম্মার মধ্যে তাদের বৈশিষ্ট্য শুধু সুন্নাত ও সংঘবদ্ধ জীবন যাপনের মাধ্যমে। আর তারা শুধুমাত্র ইসলাম ও সুন্নাতের ভিত্তিতেই শত্রুতা বা বন্ধুত্ব করেন।

৭. তাদের আরো বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করেন, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করেন। আল্লাহর পথে জিহাদ করেন। দীনকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য জন্য রাসূলের সুন্নাতকে জীবিত করেন, বিদ‘আতকে দূর করেন। আর তারা ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ সকল পর্যায়ে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন।

৮. ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা: তারা ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠিস্বার্থের চাইতে আল্লাহর অধিকারকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। তারা না কারো ভালোবাসায় অতিরঞ্জিত করেন এবং না কারো শত্রুতায় সীমালঙ্গন করতঃ তাদের সাথে অশুভ আচরণ করেন এবং না কোনো মহৎ ব্যক্তির মহত্বকে অস্বীকার করেন।

৯. জ্ঞান আহরণের মূল উৎস কুরআন সুন্নাহ হওয়ার কারণে তাদের চিন্তা-চেতনা এবং প্রত্যেক অবস্থানের মধ্যে সামঞ্জস্যতা থাকে, যদিও তাদের যুগ বা ভূখণ্ড ভিন্ন হোক।

১০. সকল মানুষের সাথে অনুগ্রহ, দয়া এবং উত্তম আচরণ করা তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

১১. আল্লাহ, তাঁর কিতাব আল-কুরআন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, মুসলিমদের নেতাগণ এবং সাধারণ মুসলিমদের জন্য নসীহত [আল্লাহর জন্য নসীহতের অর্থ হলো, তাঁর জন্য শির্ক মুক্ত ইবাদত করা, তাঁর নাম ও গুণবাচক নামসমূহের ওপর বিশ্বাস রাখা, কুরআনের জন্য নসীহতের অর্থ কুরআনের পথ ধরে চলা, রাসূলের জন্য নসীহতের অর্থ- তাঁর রিসালাতকে স্বীকার করে নিয়ে তাঁর দেওয়া সুন্নাত অনুযায়ী জীবন গঠন করা।] করাও তাদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য।

১২. মুসলিমদের সমস্যাদির গুরুত্ব দেওয়া এবং তাদেরকে সাহায্য করা এবং তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা এবং তাদেরকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকাও তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

পরিশেষে সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যার অশেষ মেহেরবাণীতে এই ক্ষুদ্র কাজটি সমাপ্ত হলো।