hadith book logo

মুসলিম নারীর অধিকার ও দায়িত্ব ইসলামের ইশতিহার ও সনদ

লেখকঃ ফায়সাল বিন খালেদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬

চতুর্থত : নির্দেশনা ১. মুসলিম উম্মাহ ও মুসলিম সমাজ

ক. মুসলিম সমাজ যেন কোন ভাবেই, সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে, আল্লাহর শরীয়ত থেকে বিচ্যুত না হয়ে পড়ে। ইসলামী নৈতিকতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা যেন আমাদের মাঝে তৈরি না হয়। এই সম্পর্কে সর্বাত্মক সতর্ক থাকতে হবে। অন্যথায় মুসলমানদেরকে বৈষয়িক এবং পারলৌাকিক মাশুল দিতে হবে। কারণ এটা এক ধরনের মানসিক ও সাংস্কৃতিক পরাজয়, যা আমাদেরকে আমাদের শত্রুদের সামনে অপদস্থ-অবনত করে রাখে এবং তাদেরকে আমাদের উপর শক্তিশালী করে তোলে। এবং আল্লাহ তায়ালা এর জন্য ইহলৌকিক ও পারোকালিক শাস্তির কথা বলেছেন। তিনি এরশাদ করেছেন :

(আরবি)

অর্থাৎ ‘যারা তার নির্দেশের অন্যথা করে তারা যেন সতর্ক থাকে, তাদেরকে ফিৎনা-বিপর্যয় বা যন্ত্রণাকর শাস্তি আক্রান্ত করবে,- সূরা নূর (৬৩)। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন :

إن الله يغار وغيرة الله أن يأتي المؤمن ما حرم الله

অর্থাৎ ‘আল্লাহ তায়ালার গায়রাত আছে। তিনি যা হারাম করেছেন মোমেন যখন তা করে তখন তার গায়রাত এর প্রকাশ ঘটে’- বোখারী।

খ. নৈতিকতা ও চরিত্র সংরক্ষণ। নৈতিকতা ও চরিত্র সংরক্ষণের জন্য মুসলিম সমাজের শিক্ষা ও পেশা তৎপরতা এবং প্রচার মাধ্যম, বিনোদন ও সংস্কৃতি ইত্যাদির অভিমুখকে সঠিক পথে রাখতে হবে। উদাহরণত শিক্ষা ও পেশা এই দুই এলাকায় নারী-পুরুষের সহাবস্থান রোধ করাই হচ্ছে সমাজের নৈতিকতা ও চরিত্র সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। এই থেকে আমরা বুঝতে পারব কি কারণে সম্ভ্রমবিরোধীরা জাতিসংঘের ‘নারী-পুরুষে সকল প্রকার পার্থক্য মূলউৎপাটন’ বিষয়ক অঙ্গীকারের পক্ষে আদাজল খেয়ে লেগে যায়। সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সহাবস্থানের কথা বলে।

মূলত প্রচার সংস্থা ও মঞ্চ এবং পর্যটন সংস্থার বিজ্ঞাপনসমূহের লক্ষ্য নিছক বাণিজ্য ও মুনাফা। এই ক্ষেত্রে তারা ধর্ম ও নৈতিকতার কোন পরওয়া করে না। এই বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা পদ্ধতি সমাজের চরিত্র নৈতিকতার জন্য খুবই বিপদজনক। মুসলিম সমাজকে এই সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। সমাজের চিন্তাশীল, সচেতন সদস্য, সাধারণ ধার্মিক সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এগুলো প্রতিরোধ করতে হবে।

গ. শিক্ষা, সংস্কৃতি ও মিডিয়ার এলাকায়, ইসলামের শত্রুদের খুশী করার জন্য কিংবা তাদের মনোহর রূপে মুগ্ধ-আক্রান্ত হয়ে যে সব নির্বোধরা নারীর শরীয়তপ্রদত্ব অধিকার বিরোধী কাজ করছে বা এমন তৎপরতা চালাচ্ছে যা পরিণতিতে নারীর ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ করে, সামাজিক ও রাষ্ট্রিয় কতৃপক্ষের দায়িত্ব হচ্ছে তাদের প্রতিরোধ করা। এই ধরনের ধ্বংসাত্মক তৎপরতা থেকে বিরত রাখা। সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন :

ولتأخذن علي يد الظالم ولتأطرنه علي الحق أطرا

অর্থাৎ ‘জালেমের হাত ধরে তাকে হক্বের উপরে ঝুকিয়ে দিবে’- আবু দাউদ।

ঘ. সমাজের জ্ঞানী ও চিন্তাশীল ব্যক্তিদের কর্তব্য হচ্ছে, নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত জীবন এবং পরিবার সমাজের নৈতিকতা ও ধার্মিকতা সংরক্ষণে তাদের যে দায়িত্ব সে ক্ষেত্রে কোন ধরনের অবহেলা না করা। যত ক্ষুদ্রই মনে হোক যে ক্ষেত্রেই তাদের এই দায়িত্ব পালনের প্রশ্ন আসবে তাদের কর্তব্য হবে, দ্বীন ও তার প্রতীকগুলো এবং তার মর্যাদা ও গুরুত্ব রক্ষায়, ছাওয়াবের নিয়তে, সে দায়িত্ব পালন করা। নিশ্চই রাজনীতি ও কুটনীতি থেকে দ্বীন অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন :

(আরবি)

অর্থাৎ ‘তোমাদের মাঝে যেন এমন একটি দল থাকে, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে বারন করবে। আর তারাই সফল’- সূরা আলে ইমরান (১০৪)।

ঙ. এলম গোপন করা বা প্রয়োজনের সময় না বলার যে বিপদ সে বিষয়ে জোর তাগিদ করা। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন :

(আরবি)

অর্থাৎ ‘স্মরণ করুন সেই সময়কে, যখন আল্লাহ কিতাবিদের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিলেন যে, তোমার তা মানুষের নিকট বয়ান করবে এবং গোপন করবে না। তারা তা তাদের পিছনে ফেলে রাখল এবং স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করল। তাদের এই বেচাবিক্রি কতইনা নিকৃষ্ট’- সূরা আলে ইমরান (১৮৭)। বিশেষত যখন ধর্মের মূল-মৌলিক বিষয়গুলো এবং সমাজের নৈতিকতা ও মানুষের অধিকার আক্রান্ত হয় তখন সে সম্পর্কে বক্তব্য না দেওয়া এবং এলম গোপন করা মারত্মক অপরাধ। তার চেয়েও ভয়াবহ কোন কিছুর লোভে বা ভয়ে বা কাল্পনিক ভ্রান্ত কোন কল্যাণের আশায় শরীয়তের পরিবর্তীত-বিকৃত বিষয়গুলোর ন্যায্যতা দানের জন্য শরীয়তের মূল ভাষ্য মূলনীতিগুলোর ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া।

চ. এই ব্যাপারটি অনুধাবন করা যে, সমাজ-সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও অধিকার ইত্যাদি ক্ষেত্রে পশ্চিমা মূল্যবোধগুলো যে বিশ্বব্যাপী আধিপত্য করছে তার কারণ শক্তি ও ক্ষমতা। তার কারণ এই নয় যে, পশ্চিমা মূল্যবোধগুলো নির্ভুল সঠিক, মানুষের মূল স্বভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। এই মূল্যবোধগুলো পশ্চিমেরই সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার, তার উৎপাদন। তার মাঝে জনকের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান আছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা মানুষের ফিতরাত মূল-স্বভাবের সাথে সংঘাতপূর্ণ। তাহলে পশ্চিমের মূল্যবোধ ও মূল্যনীতিগুলো বৈশ্বিকভাবে- সব অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে- গ্রহণযোগ্য সফলভাবে বাস্তবায়নযোগ্য হতে পারে না। তার উপর ভিত্তি করে যে কোন সমাজ ও সংস্কৃতির মানুষের অধিকার নির্ধারণ করা উচিৎ হবে না - এই ব্যাপারে নতুন করে ভাবা উচিৎ এবং আমরা জোরের সাথে বলছি, এই সব ক্ষেত্রে মানুষের মূল স্বভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ মূলনীতি কি হতে পারে, গুরুত্বের সাথে তা পুনরায় ভাবা উচিৎ। তাহলে দেখা যাবে ইসলামী মূলনীতিগুলো মানুষের মৌল স্বভাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং একমাত্র এই মূলনীতিগুলোই হতে পারে বৈশ্বিক মূল্যনীতি-বোধ, বিশ্বের ও ইতিহাসের সকল মানুষের অধিকার নির্ধারণের সঠিক পরিমাপক।