hadith book logo

প্রকৃতি ও শরীয়ত স্বীকৃত অধিকার

লেখকঃ শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ আল উসাইমিন রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

আট : প্রতিবেশীর অধিকার

তোমার বাসস্থানের নিকটতম ব্যক্তিই তোমার প্রতিবেশী। তোমার ওপর তার অনেক অধিকার রয়েছে। যদি সে তোমার রক্ত সম্বন্ধের দিক দিয়ে কাছাকাছি লোক হয় এবং মুসলিম হয় তা হলে তোমার ওপর তার তিনটি অধিকার রয়েছে। আর সে তিনটি অধিকার হচ্ছে- প্রতিবেশীর অধিকার, নিকট আত্মীয়ের অধিকার এবং ইসলামের অধিকার। আর যদি সে শুধু মুসলিম হয় এবং বংশ সুত্রে কোন নিকট আত্মীয় না হয় তা হলে তার জন্য দু’টি অধিকার রয়েছে- প্রতিবেশী হিসেবে অধিকার এবং মুসলিম হিসেবে অধিকার। আর এমনিভাবেই যদি সে নিকটতম ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয় এবং মুসলিম না হয় তা হলেও তার দু’টি অধিকার রয়েছে একটি হচ্ছে প্রতিবেশীর অধিকার এবং অন্যটি হচ্ছে আত্মীয়তার অধিকার। আ যদি সে কোন আত্মীয় না হয় অর্থাৎ অনাত্মীয় এবং মুসলিমও নয় তা হলে তার জন্য একটি অধিকার রয়েছে- আর তা হচ্ছে প্রতিবেশীর অধিকার। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন:

﴿وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا وَبِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡجَارِ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡجَارِ ٱلۡجُنُبِ﴾ [ النساء : ٣٦ ]

‘পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার কর, আর সদ্ব্যবহার কর নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম-মিসকিন, নিকটতম প্রতিবেশী ও দূরের প্রতিবেশীর সাথে।’ [সূরা আন-নিসা: ৩৬]

তাছাড়া রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

«مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ، حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ»

‘জিবরাইল সব সময় আমাকে প্রতিবেশী সম্বন্ধে উপদেশ দিয়ে আসছেন, যার ফলে আমার এ ধারণা হলো যে, হয়তো শীঘ্রই তাকে উত্তরাধিকারী রূপেও গণ্য করা হবে [বুখারী, ৬০১৫; মুসলিম, ২৬২৫।]। (বুখারী ও মুসলিম)।’

একজন প্রতিবেশীর ওপর তার অপর প্রতিবেশীর অধিকার হচ্ছে এই যে, উক্ত প্রতিবেশী যেন তার সাধ্যানুসারে তার ধন-সম্পদ এবং মর্যাদা ও কল্যাণকারিতার মাধ্যমে তার সাথে সদ্ব্যবহার করে। ‘রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«َخَيْرُ الجِيرَانِ عِنْدَ اللَّهِ خَيْرُهُمْ لِجَارِهِ»

‘আল্লাহর নিকট সে সব প্রতিবেশীই উত্তম বলে বিবেচিত যারা তার প্রতিবেশীর নিকট উত্তম বলে গণ্য [তিরমিযী, ১৯৪৪।]।’

তিনি আরো বলেছেন :

«مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُحْسِنْ إِلَى جَارِهِ »

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং আখেরাতের ওপর বিশ্বাসী সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করে [মুসলিম, ৪৮।]।’

তিনি আরো বলেছেন :

«إِذَا طَبَخْتَ مَرَقَةً، فَأَكْثِرْ مَاءَهَا، وَتَعَاهَدْ جِيرَانَكَ»

‘তুমি যখন তরকারী রান্না কর, তখন তাতে বেশী করে পানি দাও (ঝোল বাড়িয়ে দাও) এবং তোমার প্রতিবেশীর মধ্যে তা হাদিয়া হিসেবে প্রেরণ কর [মুসলিম, ২৬২৫।]।’

এছাড়া প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহারের আরেকটি দিক হচ্ছে এই যে, তার সাথে সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার জন্য বেশী বেশী করে উপহার উপঢৌকন প্রদান করবে। কেননা উপহার উপঢৌকন দ্বারা একদিকে যেমন বন্ধুত্ব গাঢ় হয়, অন্যদিকে শত্রুতাও নিরসন হয়ে যায়।

একজন প্রতিবেশীর ওপর আরেকজন প্রতিবেশীর অধিকার এই যে, তাকে কথা ও কাজে কোন প্রকার কষ্ট দেওয়া থেকে সে নিজেকে বিরত রাখবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ، وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ» قِيلَ : وَمَنْ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ : «الَّذِي لاَ يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»

‘আল্লাহ্‌র কসম ! সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহ্‌র কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়, আল্লাহ্‌র কসম সে ব্যক্তি মুমিন নয়। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করলেন, কে সে ব্যক্তি হে আল্লাহর রাসূল ! তিনি বললেন : যার অত্যাচার থেকে তার প্রতিবেশী মুক্ত নয় [বুখারী, ৬০১৬; মুসলিম, ৪৬।]।’

অন্য একটি বর্ণনায় আছে,

«لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لَا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ»

‘যার প্রতিবেশী তার অত্যাচার থেকে মাহফুজ নয় সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না [মুসলিম, ৪৬।]।’

অতএব, যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীর কুকর্ম ও অন্যায় আচরণ থেকে মুক্ত নয় সে প্রতিবেশী মুমিন হতে পারে না। অতএব সে জান্নাতেও প্রবেশ করতে পারবে না।

(অনুতাপের বিষয় যে) বর্তমানে অনেক লোকই প্রতিবেশীর অধিকারগুলোকে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যত্নবান নয়, এমনকি তাদের প্রতিবেশীগণ তাদের অন্যায় আচরণের কারণে শান্তিতে বসবাসও করতে পারছে না। অতএব, তুমি দেখতে পাবে যে, তারা সব সময়ই ঝগড়া-ফাসাদে লিপ্ত রয়েছে এবং প্রতিবেশীকে কথা ও কাজে ব্যথা দিচ্ছে। আর এরূপ আচরণ নিসন্দেহে আল্লাহ এবং তার রাসূলের হুকুমের পরিপন্থী, আর মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছেদ, তাদের অন্তরের দূরত্ব এবং একে অন্যের সম্মান বিনষ্ট করণের জন্য এতটাই হচ্ছে বড় কারণ।