hadith book logo

প্রবৃত্তি পূজাই সকল ব্যাধির কারণ

লেখকঃ ড. আব্দুল আজিজ আব্দুল লতিফ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

ক্ষমতার মোহ :

ক্ষমতা ও পদের মোহ ঐ সব প্রবৃত্তের একটি যা মানব জাতির বড় একটি অংশকে দাসে পরিণত করে রেখেছে। তাদের অন্তরসমূহ এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত হয়ে গেছে। ক্ষমতা, পদের মোহ, প্রসিদ্ধি লাভ ও খ্যাতি অর্জন ইত্যাদি তাদের উদ্দেশ্য ও অভিষ্ট লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে।

ইতিপূর্বে কাব ইবনে মালেক রা. এর একটি হাদিসে জেনেছি, রাসূল সা. বলেছেন, ‘দু’টি ক্ষুধার্ত বাঘ বকরির পালে ছেড়ে দেয়ার ফলে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়, সম্পদ ও পদের মোহের কারণে ব্যক্তির ধর্ম তার চেয়েও বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’ (তিরমিজি)

ইবনে রজব রহ. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, ‘রাসূল সা. জানিয়ে দিয়েছেন যে, দু’টি ক্ষুধার্ত বাঘ বকরির পালে ছেড়ে দিলে যে পরিমাণ ক্ষতি করবে, সম্পদ ও পদের মোহ ব্যক্তির ধর্মকে তার থেকে কম ক্ষতি করবে না। ক্ষতির পরিমাণ হয়তো সমান কিংবা তার চেয়েও বেশী হতে পারে। এ হাদিস দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, সম্পদ ও পদের মোহের সঙ্গে ব্যক্তির ধর্ম খুব ক্ষীণ অবস্থায় বিদ্যমান থাকে। যেমন ক্ষুধার্ত বাঘ বকরির পালে ছেড়ে দিলে মাত্র কয়েকটি বকরির বেচে যাওয়ার সম্ভাবনাই বিদ্যমান থাকে। সম্পদ ও পদের মোহ ত্যাগ করার জন্য এ উদাহরণটি উপদেশমূলক।

ইবনে রজব রহ. আরো বলেন, তবে ক্ষমতার মোহ সম্পদের মোহের চেয়েও বেশী ক্ষতিকর। কারণ, দুনিয়ার সম্মান, তার বড়ত্ব, মানুষের ওপর প্রাধান্য বিস্তার এবং পৃথিবীর বুকে একক ক্ষমতা অর্জনের বাসনা সম্পদের লোভের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর। এর ক্ষতি সব চেয়ে বড়, এর থেকে বিরত থাকা সব চেয়ে বেশী কঠিন। অধিকন্তু সম্পদ অন্বেষণ করার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে ক্ষমতা ও সম্মান।’ (মাজিবান হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ :৭ ও ১৩ পৃ.)

অতঃপর তিনি সম্পদের মোহের বিভিন্ন প্রকার উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘পদের মোহ দু’ধরনের।

প্রথম প্রকার মোহ : রাজত্ব, কর্তৃত্ব ও সম্পদের মাধ্যমে সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করার অভিলাষ। এটাই সব চেয়ে বেশী ক্ষতিকর। এর কারণেই মানুষ আখেরাতের কল্যাণ, মর্যাদা, সম্মান ও ইজ্জত থেকে বঞ্চিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

(আরবি)

‘এই হচ্ছে আখেরাতের নিবাস, যা আমি তাদের জন্য নির্ধারণ করি, যারা যমীনে ঔদ্ধত্য দেখাতে চায় না এবং ফাসাদও চায় না। আর শুভ পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।’ (আল-কাসাস : ৮৩) যারা রাজত্ব ও সম্পদের মাধ্যমে দুনিয়ার কর্তৃত্ব অর্জন করতে চায়, তারা খুব সামান্যই আল্লাহর তওফিক প্রাপ্ত হয়, বরং তাদেরকে নিজের ওপরই সোপর্দ করা হয়।

অতঃপর তিনি বলেন, ‘ক্ষমতা ও সম্মানের মোহের একটি সূক্ষ্ণ ক্ষতি হচ্ছে, ক্ষমতা চাওয়া ও তার ব্যাপারে আশা পোষণ করা। এটা খুব সূক্ষ্ণ স্তর যা আল্লাহকে মহববতকারী প্রকৃত আলেম ছাড়া বুঝা কঠিন।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যে ব্যক্তি সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজের নিষেধ ও মানুষদের সৎপরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে সম্মান ও তাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে চায় এবং সাথে এও প্রকাশ করতে চায় যে, মানুষ তার মুখাপেক্ষি, এটা সরাসরি আল্লাহর প্রভুত্ব ও রুবুবিয়াতের সঙ্গে সংঘর্ষ।

দ্বিতীয় প্রকার মোহ : দীনি বিষয়াদির মাধ্যমে, যেমন এলম, আমল ও দুনিয়া ত্যাগ ইত্যাদি প্রকাশ করে মানুষের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ ও তাদের কাছে মর্যাদা প্রত্যাশী হওয়া। এটা প্রথম প্রকারের চেয়ে বেশী ক্ষতিকর, ঘৃণিত ও নিন্দনীয়। কারণ, এলম, আমল ও দুনিয়া ত্যাগের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য, জান্নাত ও তার সুউচ্চ স্থানই একমাত্র কাম্য হওয়া উচিত।’ (মাজিবান হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ : ১৩, ২০, ১৬ ও ১৫ নং পৃ.)

আরেকটি জিনিস চিন্তা করার মাধ্যমেও ক্ষমতার মোহের ভয়াবহতার চিত্র ফুটে উঠে যে, ক্ষমতা ও প্রসিদ্ধি পাওয়ার বাসনা মানুষের মজ্জাগত স্বভাব। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, ‘মানুষ যদি নিজের প্রতি ও অপরের প্রতি দৃষ্টি দেয়, তবে সহজেই বুঝতে পারবে যে, একজন চাচ্ছে সকলেই তার অনুসরণ করুক, সকলের ওপর তার প্রধান্যের চিত্র ফুটে উঠুক। সব মানুষই আলাদা বৈশিষ্ট্য, শ্রেষ্ঠত্ব ও ক্ষমতার প্রত্যাশী। যার সঙ্গে তার প্রবৃত্তির মিল রয়েছে, তার সঙ্গে সে বন্ধুত্ব করছে, যার সঙ্গে তার প্রবৃত্তের মিল নেই, তার সঙ্গে সে শত্রুতা পোষণ করছে। মানুষ তার প্রবৃত্তির গোলামে পরিণত।

তিনি আরো বলেন, যদি এ নেতা মুসলমান হয়, আর সে চায় যে, মানুষ তার নফসের অনুসরণ করুক, যদিও তা আল্লাহর বিধানের বিরোধী হয়। যে তার অনুসরণ করে সে তার নিকট ঐ ব্যক্তির চেয়ে বেশী প্রিয়, যে আল্লাহর আনুগত্য করে ও তার নফসের বিরোদ্ধাচারণ করে, তবে এটা ফেরআউন ও নবিদের ওপর মিথ্যারোপকারী অন্যান্য কাফেরদের স্বভাব বা তাদের একটি শাখা।

এ ব্যক্তি আলেম বা বড় কোন শায়খ হলেও একই কথা। যে তাকে সম্মান করে সেই তার নিকট বড়। অনেক সময় সে সমকক্ষ ও সমর্যদার অন্যান্য আলেমদের হিংষা করে ও তাদের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে। (মাজমুউল ফতোয়া : ৮/২১৮ সংক্ষিপ্ত)

নিশ্চয় ক্ষমতা ও ক্ষমতা অর্জনের মোহ অনেক ক্ষতি ও বিশৃঙ্খলার জন্ম দেয়। ইবনে রজব রহ. বলেন, ‘মনে রেখ! ক্ষমতা ও পদের স্বাদ ভোগ করার পূর্বেই অনেকে তা অর্জন করার জন্য অবৈধ পন্থা গ্রহণ করে ও নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আবার তা অর্জনে সক্ষম হলে দ্বিতীয় পর্যায়ের অপরাধে লিপ্ত হয়। যেমন, অহংকার, জুলুম ও সত্য প্রত্যাখ্যান করা ইত্যাদি।’ (মাজিবান হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ : ১৪)

তিনি আরো বলেন, ‘সম্পদ ও ক্ষমতার মোহ মানুষের দীনদারী খতম করে দেয়, আল্লাহর করুনার ফলে যারা এর থেকে হেফাজত থাকে, তাদের সংখ্যা খুবই কম। মানুষের প্রকৃতি হচ্ছে অন্যদের ওপর প্রধান্য বিস্তার করা, তাদের ওপর কর্তৃত্ব করা। আর সেখান থেকেই অহংকার ও হিংসার জন্ম হয়।’ (মাজিবান হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ : ২৯)

ইবনে কইয়ূম রহ. সম্পদ ও ক্ষমতা লাভের বাসনার ক্ষতিসমূহ উল্লেখ করে বলেন, ‘রাজনীতি ও ক্ষমতা লোভী ছাত্ররা পার্থিব স্বার্থ লাভের জন্য সকল প্রচেষ্ঠা ও সব সামর্থ নিঃশেষ করে দেয়। তাদের উদ্দেশ্য অন্যদের অধীন করা ও তাদের দলে ভেড়াতে বাধ্য করা। তারা এ সব অপকর্ম ও অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য সবার সমর্থন ও সহযোগীতা চায়। আর এ থেকেই সকল ধরনের ফেত্না ও ফাসাদের সৃষ্টি হয়। যেমন, অত্যাচার, হিংসা ও বাড়াবাড়িসহ আরো অনেক কিছু, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। যেমন, অসৎ ব্যক্তিদের সম্মান করা, সম্মানীত ব্যক্তিদের অসম্মান করা ইত্যাদি।

মুদ্দা কথা : এ ছাড়া অন্য কোনো পন্থায় দুনিয়ার ক্ষমতা লাভ করা প্রায় অসম্ভব। বরং, এসব অপরাধ ও এর চেয়ে আরো মারাত্বক অপরাধ না করে তা পাওয়া যায় না। ক্ষমতায় অতিষ্ঠরা এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ অন্ধ। তাদের চোখের ওপর থেকে পর্দা উঠার পরই তারা নিজ ঝগড়াটে বিষয়ের অসারতা বুঝতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে যখন তাদের পদদলিত করা হয়, ইতিপূর্বে যেমন তারা আল্লাহর আইন ও বিধানকে দলিত করেছিলো।’ (কিতাবুর রুহ : পৃ : ৪৩৩,৪৩৪)

আমাদের এ সব আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতার মহববত ও তার মোহের ক্ষতিকর দিকসমূহ স্পষ্ট হলো। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, এর বিপরীতে যদি কেউ আল্লাহর প্রতি আহবান ও দীনের দাওয়াতের জন্য ক্ষমতা কামনা করে সেটা নিন্দনীয় নয়। কারণ, এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর বিধান ও তার নিদের্শ বাস্তবায়ন করা। পক্ষান্তরে শুধু ক্ষমতার জন্য ক্ষমতার লোভ হচ্ছে নিজের স্বার্থ ও বড়ত্ব প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে। ইনসাফগার বাদশারা কখনো নিজের প্রতি মানুষদের আহবান করেন না। বরং তারা আল্লাহর আনুগত্য ও একমাত্র তার এবাদতের জন্য আহবান করে। তবে, কেউ যদি আল্লাহর দীনের দিকে আহবানের জন্য সহায়ক বলে ক্ষমতার বাসনা পোষণ করেন এবং সৎ ও দীনদার লোকদের অনুকরণীয় হওয়ার ইচ্ছা রাখে, তাতে দোষ নেই, বরং এটা প্রসংশার যোগ্য। কারণ, যারা আল্লাহর দিকে আহবান করে, তার এবাদত ও আনুগত্য করে, তারা আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার সকল মাধ্যমকেই ভালবাসে।’ (কিতাবুর রুহ : পৃ: ৪৩২) (মাজিবান হাদিসের ব্যাখ্যাগ্রন্থ : ১৯)

আহলে এলম ও তাদের ছাত্রদের উচিত সম্পদ ও ক্ষমতার মোহ ত্যাগ করা, এটা একটা সর্বনাশা ব্যাধি। আত্মশুদ্ধি, আল্লাহর নিকট তওবা ও আত্মসামালোচনার মাধ্যমে খুব দ্রুত এর চিকিৎসা করা।

সুফিয়ান সওরি রহ. বলেন, ‘কাফিরদের নিকট লাল লাল চাক্যচিক্য স্বর্ণের চেয়ে ক্ষমতা খুব বেশী প্রিয়।’ (কিতাবুল অরা : ইমাম আহমদ : ১৯)

আবুলফারাজ ইবনে জওজি রহ. ক্ষমতা ও প্রসিদ্ধি লাভে মোহগ্রস্ত আলেমদের ব্যাপারে বলেছেন, ‘সব খানেই ক্ষমতা আর ক্ষমতা বলে চিৎকার। অথচ, অন্তরে উদাসীনতা ও আল্লাহকে ভুলে যাওয়া ভিন্ন ক্ষমতার মোহ সৃষ্টি হয় না। আর যখনই অন্তরে এগুলোর জন্ম হয়, তখনই দুনিয়ার লোকদের ওপর সে কর্তৃত্ব অর্জন ও ক্ষমতাবান হতে চায়।

তিনি আরো বলেন, আমি মানুষদের আশ্চর্য অবস্থা অবলোকন করেছি, এমনকি যারা আলেম তাদেরকেও। তারা আমাকে একা হাটতে দেখে আমার ওপর নাখোশ হয়েছে, কোনো গরীব লোককে দেখতে গেলে তারা আমার ব্যাপারে আশ্চর্য বোধ করেছে। তারা আমাকে হাসতে দেখে আমার থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। আমি আশ্চর্য হয়ে বললাম : কি আশ্চর্য! এটাই তো রাসূলের সুন্নত ছিল। মানুষের স্বভাব ও চালচলন তাদের ভাবমূর্তি ও প্রভাব সৃষ্টির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। নিশ্চিত করে বলছি, আল্লাহর শপথ! তোমরা আল্লাহর দৃষ্টি থেকে ছিটকে পড়েছ, বিধায় মানুষের নজরেও তোমরা হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছ।

প্রিয় পাঠক! আসুন একটু নিয়তটা সহিহ করি, লৌকিকতা পরিহার করি। আমাদের জীবনের শপথ গ্রহণ করি, আমরা হক ও সত্যের সাথে চলব। কারণ, এর দ্বারাই আমাদের পূর্বুরুষগণ সফলতা ও মর্যাদার শীর্ষে আরোহণ করতে সক্ষম হয়েছেন।’ (সায়দুল খাতের : পৃ : ২২৭, ৩৬০ এবং আখলাকুল উলামা : আজুরি : পৃ : ১৫৭)

পরিশেষে আল্লাহর নিকট আমাদের প্রার্থনা, তিনি যেন আমাদেরকে হেদায়েত, তাকওয়া ও স্বচ্ছলতা দান করেন। এবং আমাদেরকে প্রবৃত্তি, ধোঁকা, নফসের ধোঁকা ও বিচ্যুতি থেকে হেফাজত করেন। আমীন।

সমাপ্ত