hadith book logo

প্রবৃত্তি পূজাই সকল ব্যাধির কারণ

লেখকঃ ড. আব্দুল আজিজ আব্দুল লতিফ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৬

নারী প্রেম ও নারী আসক্তি ইহজাগতিক ও পরজাগতিক বহু বিপর্যয়ের কারণ :

ইবনে জাওজী রহ. এসব বিপর্যয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘নারী প্রেম ও নারী আসক্তির প্রায়শ্চিত্য বিভিন্ন প্রকার। কখনো ভোগ করতে হয় সঙ্গে সঙ্গে কখনো দেরিতে, কখনো প্রকাশ পায় কখনো তা পায় না। আবার এর কিছু শাস্তি রয়েছে যা আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেও বুঝতে সক্ষম হয় না। তবে সব চেয়ে বড় শাস্তি হচ্ছে আল্লাহকে ভুলে যাওয়া ও ইমান বিলুপ্ত হওয়া। নারী আসক্তি ও গুনাহের কারণে অন্তর মরে যায়, যার ফলে সে আল্লাহর সঙ্গে মুনাজাতের স্বাদ আস্বাদন করতে সক্ষম হয় না, পবিত্র কুরআন তার অন্তরে অবস্থান করে না। এস্তেগফারসহ অন্যান্য এবাদত তার কাছে অর্থহীন মনে হয়। আরো অনেক ধর্মীয় অবক্ষয় রয়েছে, যা তাকে আস্তে আস্তে গ্রাস করে নেয়, যা সে অনুধাবনও করতে পারে না। তার অন্তরের দিগন্ত জুড়ে বিস্তৃত হয় গুনাহের অন্ধকার, নষ্ট হয়ে যায় তার অন্তর দৃষ্টি, যার প্রভাব পড়ে তার শরীরেও। যেমন, চোখের দৃষ্টি চলে যায়, স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটে ইত্যাদি। তাই অন্তরের মধ্যে গুনাহের আসক্তি উপলব্দি করার সাথে সাথে তওবা করা, হয়তো এর দ্বারা আসন্ন বিপদ দূরীভূত হয়ে যাবে।’ (জাম্মুল হাওয়া : ২১৭)

অবৈধ ভালবাসা সম্পর্কে ইবনে তাইমিয়াহ রহ. বলেন, ‘নারী কিংবা ছোট বাচ্চাদের আসক্তি ব্যক্তিকে এমন বিপর্যয়ে নিপতিত করতে পারে, যার থেকে উদ্ধার করার ক্ষমতা কারো নেই। এর পরিণতি খুবই ভয়াবহ, তার পূন্যের ভান্ডার একেবারে শূন্য হয়ে যায়। প্রথম পর্যায়ে কারো অন্তরে কোন চেহারার আসক্তি সৃষ্টি হলে, দ্বিতীয় পর্যায়ে সে তার ভালবাসায় মগ্ন হয়ে যায়। যার ফলশ্রুতিতে সে আস্তে আস্তে নানা অপকর্ম ও অপরাধে জড়িত হয়ে পড়ে, যা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। তবে সব চেয়ে বড় মসিবত হচ্ছে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে নিক্ষিপ্ত হওয়া। কারণ, বান্দা যখন আল্লাহর এবাদত ও তার প্রতি নিবিষ্ট চিত্ত থাকে, তখন তার কাছে আল্লাহর মহববতের চেয়ে মধুর ও সুখকর কোন জিনিস হতে পারে না।’ (মাজমুউল ফতওয়া : খ ১০, পৃ : ১৮৭)

তিনি আরো বলেছেন, গুনাহের প্রতি আসক্তি অন্তরের অন্যতম ব্যাধি, যা উন্মাদনার জন্ম দেয়। লুত আ.-এর জাতি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

(আরবি)

‘তোমার জীবনের কসম, নিশ্চয় তারা তাদের নেশায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।’ (হিজর : ৭২)

বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘চোক্ষুদ্বয়ও যেনা করে, চক্ষুর যেনা হচ্ছে দৃষ্টি।’ অনেকেই প্রবৃত্তির তাড়নায় পরনারীর প্রতি দৃষ্টি দেয়, তাদের কথা শ্রবণ করে ও তাদের সঙ্গে বাক্যালাপ করতে চায়। আবার কেউ এর চেয়ে অগ্রগামী হয়ে র্স্পশ, চুম্মুন ও সংঘ লাভ করতে চায়। এসব কিছুই নিষিদ্ধ ও হারাম। এসব লোকদের ওপর শাস্তি নিশ্চিত করার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা আমাদের নমনীয় হতে ও দয়া দেখাতে নিষেধ করেছেন। (মুসলমানদের সরকার না থাকলে বা তাদের শাস্তির কোন ব্যবস্থা না থাকলে) সামাজিকভাবে তাদের বয়কট করা, তাদেরকে এ থেকে নিষেধ করা ও তাদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করা। অতএব যেনার এসব প্রাথমিক কার্যাদি ও যেনার অন্যান্য সকল উপায়-উপকরণ ত্যাগ করা, তার থেকে দূরে থাকা সবার জন্য একান্ত জরুরি।’ (মাজমুউল ফতওয়া : খ : ১৫ পৃ : ২৮৮, ২৮৯)

ইবনুল কাইয়ূম রহ. যেনা-ব্যভিচারের ক্ষতি, বিপর্যয় ও সর্বনাশ সম্পর্কে তার লেখার অনেক জায়গায় আলোকপাত করেছেন। তিনি একজায়গায় বলেন, ‘যেনা-ব্যভিচার সকল অপকর্ম ও অনিষ্টের মূল। ব্যক্তির দীনদারী, কৌলিণ্য, সুস্থ রুচিবোধ ও আত্মমর্যাদা সব নিঃশেষ করে দেয় এ অপকর্মটি। ব্যভিচারীর মধ্যে দীনদারী, ওয়াদা রক্ষা ও সততা থাকে-না বললেই চলে।

আরো কিছু ক্ষতিকর দিক হচ্ছে : আল্লাহর নিদের্শ অমান্য করা ও তার সৃষ্ট প্রকৃতির মধ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা। নিজ চেহারা কলুষিত করা এবং নিজকে চিন্তা ও পেরেশানীর ঘাটে উপস্থিত করা। এর ফলে ব্যক্তির অন্তর কালো হয়, অন্তরদৃষ্টি লোপ পায়, সম্মানহানী ঘটে, আল্লাহ ও মানুষের সুনজর থেকে বঞ্চিত হয়, ভাল উপাধির পরিবর্তে খারাপ উপাধিতে তাকে ডাকা হয়, তার অন্তর সংকীর্ণ ও কোনঠাসা হয়ে যায়, অনেকে সময় সে নিজ ইচ্ছার বিরুদ্ধে দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দেয়। সে আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে জীবনের স্বাদ উপভোগ করতে চায়, অথচ আল্লাহর নিকট হতে শান্তি একমাত্র তার আনুগত্যের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব, তার অবাধ্যতা কখনো কোনো কল্যান বয়ে আনতে পারে না।’ (রওজাতুল মুহিবিবন : পৃ : ৩৬০)

তিনি আরো বলেন, ‘কর্ম অনুযায়ী ফলাফল দেয়া হয়। যে হারাম অশান্তির কারণ, সে হারামে লিপ্ত ব্যক্তি অশান্তি থেকে মুক্ত হতে চাইলেও মুক্ত হতে পারবে না, বরং তার আরো অশান্তি বৃদ্ধি পাবে। মৃত্যুর পরেও তার সঙ্গে অনুরূপ ব্যবহার করা হবে কবরে ও আখেরাতে।

সহিহ বোখারিতে সামুরা বিন জুনদুব রা. থেকে বর্ণিত হাদিসের কিছু অংশে বলা হয়েছে, রাসূল সা. বলেন, ‘... রাতে দেখলাম দু’জন ব্যক্তি আমার কাছে আসল এবং আমাকে ঘর থেকে বের করে তাদের সাথে নিয়ে চলল, হটাৎ চুলোর আকৃতির মত একটি ঘর দেখলাম, ওপরের অংশ সরু মাঝখানের অংশ খুব প্রসস্ত, তার নিচে আগুন জ্বলছে, ভেতরে উলঙ্গ নারী ও উলঙ্গ পুরুষ। যখন আগুন প্রজ্বলিত হয়, তারা আগুনের সঙ্গে ওপরে উঠে যায়। মনে হয়, এই যেন তারা বাইরে ছিটকে পড়ল। আগুন নিস্তেজ হলে আবার তারা নিচে চলে যায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম : এরা কারা? উত্তর দিল, এরা ব্যভিচারী।’ একটু চিন্তা করে দেখুন, দুনিয়ার অবস্থা ও পরকালের শাস্তির সাথে কি মিল! দুনিয়াতে তারা তওবা সত্বেও ফিরে আসতে পারত না, গুনা ত্যাগ করার প্রতিজ্ঞা করেও তা রক্ষা করতে পারত না, প্রবৃত্তির লালসা মুক্ত হতে চেয়েও মুক্ত হতে পারত না, পুনরায় তাতে নিমজ্জিত হয়ে যেত, তাদের শাস্তিও সেরূপ হচ্ছে, দোজখ থেকে বের হওয়ার পথে এসেও বের হতে পারছে না। বরং পুনরায় তাতে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে।’ (রওজাতুল মুহিবিবন : পৃ : ৪৪২)

আরেকটি জায়গায় তিনি বলেছেন, ‘জ্ঞানী ব্যক্তিদের জেনে নেয়া জরুরি, প্রবৃত্তপূজারীগণ এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে, যেখানে কোনো স্বাদ তারা পায় না, তা সত্বেও তারা তা ছাড়তে পারে না। কারণ, এটা তাদের জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। এর প্রত্যক্ষ উদাহরণ, যারা মাদকাসক্ত ও যেনায় অভ্যস্ত তারা ঐ সব লোকদের ন্যায় সামান্য স্বাদও উপভোগ করতে পারে না, যারা বিরতি দিয়ে, পর পর এসব অপরাধে লিপ্ত হয়।’ (রওজাতুল মুহিবিবন : পৃ : ৪৭০)

শায়খ মুহাম্মদ খিজির হুসাইন লিখেছেন, ‘ব্যভিচারের ক্ষতি অপরিসীম। এর অপকারিতা সুদূর প্রসারী : সম্মান নষ্ট হয়, মর্যাদা নষ্ট হয়, নিরাপত্তার পরিবেশ বিঘ্ন হয়, পরস্পর সুসম্পর্ক নষ্ট হয় এবং নানা মরণ ব্যাধির জন্ম হয়। ব্যভিচারী অর্থাৎ যারা চরিত্রহীন, সম্মানহীন, যাদের মধ্যে নিরাপত্তা বলতে কিছু নেই, যারা কাঁদা ছোড়াছুড়িতে লিপ্ত, যাদের শরীর রোগা শোকা, তাদের আবার কিসের জীবন?’ (রাসায়েলুল এসলাহ : পৃ : ২৩)