hadith book logo

আল-কুরআন ও তার সুমহান মর্যাদা

লেখকঃ শাইখ আব্দুল আযীয ইবন আবদুল্লাহ আলে শাইখ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাবকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করেছেন

আল্লাহ তা‘আলা এ কিতাবকে বিভিন্ন নামে নামকরণ করেছেন। আবার তিনি সেটাকে নানা বিশেষণে বিশেষিত করেছেন। এর দ্বারাই এ কিতাবের সুমহান সম্মান ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। কুরআনের নামসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে: আল কুরআন, আল-ফুরকান, আল-কিতাব, আল-হুদা (হিদায়েতের পথ প্রদর্শনকারী), নূর (আলো), শিফা (আরোগ্যকারী), বায়ান (বর্ণনাকারী) মাও‘য়েযা (সুপদেশ), রহমত, বাসায়ের (অন্তর্দৃষ্টি দানকারী), বালাগ (প্রজ্ঞাপন), আরবী, মুবীন (স্পষ্টকারী), কারীম (অতি সম্মানিত), আযীম (মহান), মাজীদ (সম্মানিত), মুবারক (বরকতময়), তানযীল (অবতীর্ণ), সিরাতুম-মুসতাকিম (সরল সঠিক পথ), যিকরুল হাকীম (প্রজ্ঞাময় বাণী), হাবলুল্লাহ (আল্লাহর রশি), যিকরা (উপদেশ), তাযকিরা (স্মরণিকা), বুশরা (সুসংবাদ), পূর্ববর্তী কিতাবের সত্যায়নকারী, পূর্ববর্তী কিতাবের রক্ষাকারী, মাসানী, সব বিষয়ের ব্যাখ্যাকারী, সব বিষয়ের বর্ণনাকারী, সন্দেহাতীত ও বক্রহীন কিতাব ইত্যাদি নামে পরিচিত। এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ

﴿ قُرۡءَانًا عَرَبِيًّا غَيۡرَ ذِي عِوَجٖ لَّعَلَّهُمۡ يَتَّقُونَ ٢٨ ﴾ [ الزمر : ٢٨ ]

“আরবী ভাষায় এ কুরআন বক্রতামুক্ত, যাতে তারা সাবধান হয়ে চলে।”[ সূরা যুমার:২৮]

﴿ تَبَارَكَ ٱلَّذِي نَزَّلَ ٱلۡفُرۡقَانَ عَلَىٰ عَبۡدِهِ ﴾ [ الفرقان : ١ ]

“পরম কল্যাণময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফয়সালার গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন।” [সূরা আল-ফুরকান: ১]

﴿ الٓمٓ ١ ذَٰلِكَ ٱلۡكِتَٰبُ لَا رَيۡبَۛ فِيهِۛ هُدٗى لِّلۡمُتَّقِينَ ٢ ﴾ [ البقرة : ١، ٢ ]

“আলিফ লাম মীম, এ সেই কিতাব যাতে কোনোই সন্দেহ নেই। পথ প্রদর্শনকারী মুত্তাকীদের জন্য।” [সূরা আল-বাকারা: ১-২]

﴿ قُلۡ مَن كَانَ عَدُوّٗا لِّـجِبۡرِيلَ فَإِنَّهُۥ نَزَّلَهُۥ عَلَىٰ قَلۡبِكَ بِإِذۡنِ ٱللَّهِ مُصَدِّقٗا لِّمَا بَيۡنَ يَدَيۡهِ وَهُدٗى وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُؤۡمِنِينَ ﴾ [ البقرة : ٩٧ ]

“আপনি বলে দিন, যে কেউ জিবরাঈলের শত্রু হয়-যেহেতু তিনি আল্লাহর আদেশে এ কালাম আপনার অন্তরে নাযিল করেছেন, যা সত্যায়নকারী তাদের সম্মুখস্থ কালামের এবং মুমিনদের জন্য পথপ্রদর্শক ও সুসংবাদদাতা।” [সুরা বাকারা: ৯৭]

﴿ ذَٰلِكَ نَتۡلُوهُ عَلَيۡكَ مِنَ ٱلۡأٓيَٰتِ وَٱلذِّكۡرِ ٱلۡحَكِيمِ ٥٨ ﴾ [ ال عمران : ٥٨ ]

এটা তো তা-ই যা আমরা আপনাকে পড়ে শুনাই, আয়াত এবং প্রজ্ঞাময় যিকির থেকে।” [সূরা আলে-ইমরান: ৫৮]

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَكُم بُرۡهَٰنٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَأَنزَلۡنَآ إِلَيۡكُمۡ نُورٗا مُّبِينٗا ١٧٤ ﴾ [ النساء : ١٧٤ ]

“হে লোকসকল, তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট দলীল-প্রমাণাদি পৌঁছে গেছে। আর আমরা তোমাদের প্রতি প্রকৃষ্ট আলো অবতীর্ণ করেছি।” [সূরা আন-নিসা: ১৭৪]

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ قَدۡ جَآءَتۡكُم مَّوۡعِظَةٞ مِّن رَّبِّكُمۡ وَشِفَآءٞ لِّمَا فِي ٱلصُّدُورِ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٞ لِّلۡمُؤۡمِنِينَ ٥٧ ﴾ [ يونس : ٥٧ ]

“হে লোকসকল, তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে উপদেশবাণী এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুসলিমদের জন্য।” [সূরা ইউনুস: ৫৭]

﴿ إِنَّ هَٰذَا ٱلۡقُرۡءَانَ يَهۡدِي لِلَّتِي هِيَ أَقۡوَمُ وَيُبَشِّرُ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أَنَّ لَهُمۡ أَجۡرٗا كَبِيرٗا ٩ ﴾ [ الاسراء : ٩ ]

“নিশ্চয় এ কুরআন প্রদর্শন করে সর্বাধিক সরল পথের দিকে এবং সৎকর্ম পরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্যে রয়েছে মহা পুরস্কার।” [সূরা বনী ইসরাঈল: ৯]

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ ٱلَّذِيٓ أَنزَلَ عَلَىٰ عَبۡدِهِ ٱلۡكِتَٰبَ وَلَمۡ يَجۡعَل لَّهُۥ عِوَجَاۜ ١ قَيِّمٗا لِّيُنذِرَ بَأۡسٗا شَدِيدٗا مِّن لَّدُنۡهُ وَيُبَشِّرَ ٱلۡمُؤۡمِنِينَ ٱلَّذِينَ يَعۡمَلُونَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ أَنَّ لَهُمۡ أَجۡرًا حَسَنٗا ٢ ﴾ [ الكهف : ١، ٢ ]

“সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাঁর বান্দার উপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে রাখেন নি কোনো বক্রতা। সরলরূপে, যাতে সে তাঁর পক্ষ থেকে কঠিন আযাব সম্পর্কে সতর্ক করে এবং সুসংবাদ দেয়, সেসব মুমিনকে, যারা সৎকর্ম করে, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।” [সূরা কাহাফ, আয়াত ১-২]

﴿ بَلۡ هُوَ قُرۡءَانٞ مَّجِيدٞ ٢١ فِي لَوۡحٖ مَّحۡفُوظِۢ ٢٢ ﴾ [ البروج : ٢١، ٢٢ ]

“বরং এটা মহান কুরআন, লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ”। [সূরা বুরূজ, আয়াত ২১-২২]

﴿ إِنَّهُۥ لَقُرۡءَانٞ كَرِيمٞ ٧٧ فِي كِتَٰبٖ مَّكۡنُونٖ ٧٨ لَّا يَمَسُّهُۥٓ إِلَّا ٱلۡمُطَهَّرُونَ ٧٩ تَنزِيلٞ مِّن رَّبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٨٠ ﴾ [ الواقعة : ٧٧، ٨٠ ]

“নিশ্চয় এটা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক গোপন কিতাবে, যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না, এটা সৃষ্টিকুলের রবের পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।” [সূরা ওয়াক্বি‘আ, আয়াত ৭৭-৮০]

এগুলো ছাড়াও আরো অনেক আয়াতে এই মহাগ্রন্থের নানা নাম ও গুণাবলীর কথা উল্লেখ হয়েছে, যা এর সুমহান মর্যাদা, সর্বোচ্চ সম্মানের প্রমাণিত হয়। কেনইবা হবে না? এর কথক হলেন স্বয়ং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন, যিনি গোপন ও প্রকাশ্য সব বিষয়ের সর্বজ্ঞানী। তিনি বলেনঃ

﴿ وَلَوۡ أَنَّمَا فِي ٱلۡأَرۡضِ مِن شَجَرَةٍ أَقۡلَٰمٞ وَٱلۡبَحۡرُ يَمُدُّهُۥ مِنۢ بَعۡدِهِۦ سَبۡعَةُ أَبۡحُرٖ مَّا نَفِدَتۡ كَلِمَٰتُ ٱللَّهِۚ إِنَّ ٱللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٞ ٢٧ ﴾ [ لقمان : ٢٧ ]

“পৃথিবীতে যত বৃক্ষ আছে, সবই যদি কলম হয় এবং সমুদ্রের সাথেও সাত সমুদ্র যুক্ত হয়ে কালি হয়, তবুও তাঁর বাক্যাবলী লিখে শেষ করা যাবে না। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়”। [সূরা লোকমান, আয়াত ২৭]

﴿ إِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا ٱلذِّكۡرَ وَإِنَّا لَهُۥ لَحَٰفِظُونَ ٩ ﴾ [ الحجر : ٩ ]

“নিশ্চয় আমরা স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমরা নিজেই এর সংরক্ষক”। [সূরা হিজর, আয়াত ৯]

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কুরআনের যে সব নাম বা সিফাত রয়েছে তার প্রত্যেকটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আলোচনা অতিদীর্ঘ হওয়ার ভয় না হলে বাকী নামসমূহ বিস্তারিতভাবে এখানে আলোচনা করতাম। এ সম্মানিত কিতাবের সবচেয়ে বড় মহত্ব হলো এর সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই নিয়েছেন। কোনো সৃষ্ট জীবের কাছে এর হিফাযতের দায়িত্ব দেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ بَلۡ هُوَ قُرۡءَانٞ مَّجِيدٞ ٢١ فِي لَوۡحٖ مَّحۡفُوظِۢ ٢٢ ﴾ [ البروج : ٢١، ٢٢ ]

“বরং এটা মহান কুরআন, লওহে মাহফুযে লিপিবদ্ধ”। [সূরা বুরুজ, আয়াত ২১-২২]

ইবনুল কাইয়্যেম (রহ.) বলেছেন: আল্লাহ তা‘আলা নিন্মোক্ত আয়াতে

﴿ بَلۡ هُوَ قُرۡءَانٞ مَّجِيدٞ ٢١ فِي لَوۡحٖ مَّحۡفُوظِۢ ٢٢ ﴾ [ البروج : ٢١، ٢٢ ]

“আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।” [সূরা হিজর, আয়াত ৯] কুরআনের সংরক্ষণ ও সূরায়ে বুরুজে সংরক্ষণের জায়গা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে কোনো ধরণের সংযোজন ও বিয়োজন থেকে মুক্ত রেখেছেন, এর অর্থ বিকৃতি, শব্দ পরিবর্তন ও সংরক্ষণ করেছেন। এর হরফসমূহ সব ধরণের বাড়ানো বা কমানো থেকে এবং অর্থসমূহ বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে হেফাযত করেছেন।

আল্লাহর কিতাব আল কুরআন সব ফিতনা ফাসাদ থেকে মুক্ত, তা মু’মিনের নিত্যসঙ্গী, অন্তরের আলো, হৃদয়ের বসন্ত, দুঃশ্চিন্তা দুর্ভাবনা দূরকারী। আল্লাহর কিতাব আমাদের পূর্ববর্তীদের ও পরবর্তীদের সংবাদদাতা, পরস্পরের মাঝে ফয়সালাকারী। তা চিরন্তন ফয়সালা, কোনোরূপ হাসি তামাশার জিনিস নয়। যেসব আল্লাহদ্রোহীরা তাকে ত্যাগ করেছে আল্লাহ তার প্রতিশোধ নিয়েছেন, কেউ তাকে বাদ দিয়ে অন্য কোথাও হিদায়াত অন্বেষণ করলে আল্লাহ তা‘আলা তাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, তা আল্লাহ তা‘আলার শক্ত রজ্জু, প্রজ্ঞাময় উপদেশবাণী, সরল সঠিক পথ, যা কখনো পথভ্রষ্ট করে না, কাউকে দ্বিধা সংকোচে ফেলে না, উলামায়ে কিরামগণ কখনো এর মহাজ্ঞান বিজ্ঞান অর্জনে পরিতুষ্ট হতে পারবে না (তারা আরো বেশি বেশি অর্জন করতে চাইবে), অধিক উত্তর প্রদানের পরও তা পুরাতন হয় না। এর বিস্ময় শেষ হবার নয়, এর উপদেশ চিরন্তন। তা জ্বীন সম্প্রদায়কে বিরত রাখতে পারেনি যখন তারা এর তিলাওয়াত শ্রবন করেছিল, তখন তারা বলেছিল,

﴿ إِنَّا سَمِعۡنَا قُرۡءَانًا عَجَبٗا ١ ﴾ [ الجن : ١ ]

“আমরা (জ্বিন জাতি) বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি।” [সূরা আল জিন: ১]

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : «مَا مِنَ الْأَنْبِيَاءِ مِنْ نَبِيٍّ إِلَّا قَدِ اُعْطِيَ مِنَ الْآيَاتِ مَا مِثْلُهُ آمَنَ عَلَيْهِ الْبَشَرُ، وَإِنَّمَا كَانَ الَّذِي أُوتِيتُ وَحْيًا أَوْحَى اللهُ إِلَيَّ، فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَكْثَرَهُمْ تَابِعًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ»

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা‘আলা ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক নবীকে তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের প্রায় অনুরূপ মু‘জিযা দেওয়া হয়েছিল। অতঃপর লোকেরা তাঁর উপর ঈমান এনেছে। কিন্তু আমাকে যে মু‘জিযা দেওয়া হয়েছে তা হলো অহী (আল কুরআন), যা আল্লাহ তা‘আলা আমার উপর নাযিল করেছেন। আমি আশা করি কিয়ামতের দিবসে তাঁদের অনুসারীদের তুলনায় আমার অনুসারীর সংখ্যা সর্বাধিক হবে।” [বুখারী, হাদীস নং ৪৯৮১ ও মুসলিম, হাদীস নং ১৫২।]