hadith book logo

অপরাধমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে সাওমের ভূমিকা

লেখকঃ মুহাম্মাদ শাহিদুল ইসলাম • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

অশ্লীলতা ও অনর্থক কাজকর্ম বর্জন

আরবীতে অশ্লীলতার প্রতিশব্দ হচ্ছে, فاحش، ماجن، خليع ইত্যদি। [আবূ তাহের মেসবাহ, আল-মানার [বাংলা-আরবী অভিধান], (ঢাকা : মোহাম্মাদী লাইব্রেরি, ১৯৯৮), পৃ. ৮৭।] মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ তা‘আলা এ শব্দটিকে فاحشة হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন :

﴿وَٱلَّذِينَ إِذَا فَعَلُواْ فَٰحِشَةً ﴾ [ ال عمران : ١٣٥ ]

“আর যারা কোন অশ্লীল কার্য করে ফেললে...।” [সূরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৫]

আলোচ্য আয়াতের فَاحِشَةً শব্দ দ্বারা সাধারণতভাবে অশ্লীলতাকেই বুঝানো হয়েছে। তবে এর অর্থ দ্বারা কী উদ্দেশ্য তা স্পষ্টত বুঝা যায় তাফসীরকারকদের ব্যাখ্যার মাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে ইবন জারীর আত-তাবারা রহ. বলেন, এখানে فَاحِشَةً দ্বারা সকল প্রকার গুনাহ, এমন কোনো কাজ করা যা দ্বারা নিজের আত্মার ওপর যুলুম হয়ে যায়, এমন খারাপ কাজ করা যার দ্বারা আল্লাহর আল্লার বেধে দেওয়া সীমারেখা অতিক্রম হয়ে যায়, যা দ্বারা ব্যক্তির ওপর হদ্দ জারী করা আবশ্যক হয়ে পড়ে, ব্যাভিচার করা, খরাপ কথা-বার্তা বলা এটিও অশ্লীলতার একটি অংশ। সুদ্দী রহ.-এর মতে ব্যভিচার করা। সুফিয়ান আস-সাওরী ও মানসূর রহ.-এর মতে, অন্যের ওপর যুলুম করা। [ইবন জরীর, আবূ জা‘ফার মুহাম্মদ ইব্ন জারীর আত-তাবারী, জামি‘উল বায়ান ফী তা’বীলিল কুর’আন, (দারুল ফিকর, তা.বি.), খ ৭, পৃ. ২১৭; আল-আলুসী, শিহাবুদ্দীন মাহমূদ ইব্ন ‘আব্দিল্লাহ আল-হুসাইনী, রূহুল মা‘আনী ফী তাফসীরিল কুর’আনিল ‘আজীম ওয়াস সাব‘উল মাছানী, (বৈরূত : দারুস সাদির, তা.বি.), খ ৬, পৃ. ১০৫।]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, আলোচ্য আয়াতের فَاحِشَةً শব্দ দ্বারা অবাধ্যতাকে বুঝানো হয়েছে। [আব্দুল্লাহ ইবন আহমদ, তানবীরুল মিকবাস মিন তাফসীরি ইবন ‘আব্বাস, (করাচী : কাদিমী কুতুবখানা, তা.বি.), খ. ১, পৃ. ৭১; আল-খাযিন, আবুল হাসান ‘আলী ইব্ন মুহম্মাদ ইবন ইবরাহীম ‘উমার, লুবাবত তা’বীল ফী মা‘আনিয়াত তানযীল ‘তাফসীর আল-খাযিন, বৈরূত : দারুল মারিফাহ, তা.বি.), খ. ৩, পৃ. ২০১।]

তাফসীরে বাগাভীতে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা ও মুজাহিদ রহ. فَاحِشَةً শব্দের অর্থ করেছেন : উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করা। আতা‘ রহ. বলেন : শির্ক করা এবং এমন কাজ যা আল্লাহ করতে নিষেধ করেছেন, ব্যাভিচার করা, যা কথা ও কাজের মধ্যে নিকৃষ্ট তাই অশ্লীলতা। [আল-বাগাভী, আবূ মুহাম্মাদ ইবন মাসউদ মহিউস সুন্নাহ, মা‘আলিমুত তানযীল, (বৈরূত : দারু তায়্যিব, ৪র্থ সংস্করণ, ১৪১৭হি./১৯৯৭), খ. ৩, পৃ. ২২৩; ইবন জরীর আত-তাবারী, জামি‘উল বায়ান ফী তা’বীলিল কুরআন, খ. ১২, পৃ. ৩৭৭।]

হাদীসের বর্ণনায় অশ্লীলতা বলতে নিকৃষ্ট পদ্ধতি ও তরীকা, কথা ও কাজের নিকৃষ্টতাকে বুঝানো হয়েছে। [সহীহ বুখারী, আবূ ‘আব্দিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবন ইসমা‘ঈল, আল-জামে‘উস সহীহ, (বৈরূত : দারু ইবন কাছীর, ১৪০৭হি.), খ. ৬, পৃ. ২৪৯৭।]

সিয়াম একজন মুসলিমকে অশ্লীল, বাজে ও অর্থহীন কথাবার্তা বলা থেকেও বিরত রাখে। এ কাজ মুসলিম ব্যক্তির জন্য সাধারণভাবেও হারাম বটে; কিন্তু রমযান মাসে এগুলোর হারাম আরো তীব্র ও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : “যে লোক মিথ্যা কথা ও মিথ্যা আমল ত্যাগ করল না, তার খাদ্য-পানীয় পরিত্যাগ করে চলায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [সহীহ বুখারী, কিতাবুস সাওম, হাদীস নং ১৭৭০।]

অপর হাদীসে বলা হয়েছে: “বেশ সংখ্যক সাওম পালনকারী এমন হয়ে থাকে, যাদের সাওময় ক্ষুধা পিপাসার কষ্ট সহ্য করা ছাড়া আর কিছুই লাভ হয় না।” [আহমদ, কিতাবু বাক্বিই মাসনাদিল মুকসিরিন, হাদীস নং ৯৩০৮।]

কুরআনে যদিও অন্যায়ের প্রতিশোধ গ্রহণের অধিকার সকলকেই দেয়া হয়েছে -যেমন বলা হয়েছে: “মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত : ৪০।] কিন্তু সাওম পালনকারীকে এক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ন্ত্রণ মেনে চলতে হয়। কারুর পক্ষ থেকে অন্যায় হলেই সেও তার জবাবে অন্যায় করবে এরূপ স্বাধীনতা তাকে দেওয়া হয় নি। কেউ তাকে গাল মন্দ বললে সেও অনুরূপ গাল-মন্দ তাকে শুনিয়ে দিবে, তা সাওম পালনকারীদের জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। এরূপ অবস্থা দেখা দিলে সিয়ামই তাকে ঢালস্বরূপ আড়াল করে রাখবে। হাদীসে এ কথাই বলা হয়েছে এ ভাষায় : “সাওম (রোযা) ঢাল বিশেষ। সাওমর দিনে কারো জন্য স্ত্রী সঙ্গম করা উচিৎ নয়, উচিৎ নয় হল্লা চিৎকার ও গোলমাল করা। কেউ যদি তাকে গাল-মন্দ করে বা তার সাথে মারামারি করতে আসে, তাহলে তার বলা উচিতঃ আমি একজন সাওম পালনকারী ব্যক্তি”। [সহীহ বুখারী, কিতাবুস সাওম, হাদীস নং ১৭৭১।]