১
আয়াতে তাতহীর ও হাদিসে কিসার অর্থ
লেখকঃ সানাউল্লাহ নজির আহমদ • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৮
(ঘ). আয়াতের শানে নুযূল কী?
আহযাব (খন্দক) যুদ্ধ শেষে সাথে সাথেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু কুরাইজার বিষয়টি মীমাংসা করেন। বনু কুরাইজার ইয়াহূদীরা খন্দকের যুদ্ধের জন্য মক্কার কাফেরদের উস্কানি দিয়ে ছিল ও তাদের সাথে চুক্তি করেছিল, অথচ তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মদীনার নিরাপত্তা বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ ছিল। মক্কার কাফেররা যখন ব্যর্থ অভিযান শেষে বিফল ফিরে গেল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চুক্তি ভঙ্গকারী ইহুদীদের দিকে মনোযোগ দেন। তাদেরকে বিতাড়িত করেন, তাদের জমি, ঘর ও সহায়-সম্পদ গণিমত হিসেবে গ্রহণ করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
﴿ وَأَنزَلَ ٱلَّذِينَ ظَٰهَرُوهُم مِّنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ مِن صَيَاصِيهِمۡ وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ ٱلرُّعۡبَ فَرِيقٗا تَقۡتُلُونَ وَتَأۡسِرُونَ فَرِيقٗا ٢٦ وَأَوۡرَثَكُمۡ أَرۡضَهُمۡ وَدِيَٰرَهُمۡ وَأَمۡوَٰلَهُمۡ وَأَرۡضٗا لَّمۡ تَطَُٔوهَاۚ وَكَانَ ٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٗا ٢٧ ﴾ [ الاحزاب : ٢٦، ٢٧ ]
“আর আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা তাদের সহযোগিতা করেছিল, আল্লাহ তাদেরকে অবতরণ করালেন তাদের দুর্গসমূহ থেকে এবং তাদের অন্তরসমূহে ভীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা হত্যা করছ একদলকে, আর বন্দী করছ অন্য দলকে। আর তিনি তোমাদেরকে উত্তরাধিকারী করলেন তাদের ভূমি, তাদের ঘরÑবাড়ী ও তাদের ধনÑসম্পদের এবং এমন ভূমির যাতে তোমরা পদার্পণও করনি। আল্লাহ সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান”। [সূরা আহযাব: (২৬-২৭)] এসব গনিমত গরিব মুসলিমগণ লাভ করে অভাবমুক্ত হলেন, বিশেষ করে মুহাজিরগণ। তারা নিজেদের ঘর ও পরিবারে সাধ্যানুসারে সচ্ছলতা দিলেন। তাদের নারীদের ও পরিবার দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ অনুরূপ ভরণপোষণ তলব করল, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী আয়াত নাযিল করেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيۡنَ أُمَتِّعۡكُنَّ وَأُسَرِّحۡكُنَّ سَرَاحٗا جَمِيلٗا ٢٨﴾
“হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই”। [সূরা আহযাব: (২৮)] পূর্বের আয়াতে যেসব সম্পদের উল্লেখ রয়েছে, তার ইচ্ছা পোষণ করেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তার নিকট সচ্ছলতা তলব করেছিল। এ আয়াতে তার সমাধান দেয়া হয়েছে। এ হচ্ছে পূর্বাপর আয়াতের যোগসূত্র। এ আয়াতে দুনিয়াবি যে জীবন ও চাকচিক্য দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত পূর্বের আয়াতে উল্লেখিত বনু কুরাইজা থেকে প্রাপ্ত গণিমতের সম্পদ। এরপর পরবর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা বলে:
﴿ وَإِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلدَّارَ ٱلۡأٓخِرَةَ فَإِنَّ ٱللَّهَ أَعَدَّ لِلۡمُحۡسِنَٰتِ مِنكُنَّ أَجۡرًا عَظِيمٗا ٢٩ يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ مَن يَأۡتِ مِنكُنَّ بِفَٰحِشَةٖ مُّبَيِّنَةٖ يُضَٰعَفۡ لَهَا ٱلۡعَذَابُ ضِعۡفَيۡنِۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٗا ٣٠ ۞وَمَن يَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتَعۡمَلۡ صَٰلِحٗا نُّؤۡتِهَآ أَجۡرَهَا مَرَّتَيۡنِ وَأَعۡتَدۡنَا لَهَا رِزۡقٗا كَرِيمٗا ٣١ يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ كَأَحَدٖ مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِنِ ٱتَّقَيۡتُنَّۚ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِٱلۡقَوۡلِ فَيَطۡمَعَ ٱلَّذِي فِي قَلۡبِهِۦ مَرَضٞ وَقُلۡنَ قَوۡلٗا مَّعۡرُوفٗا ٣٢ وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ وَأَقِمۡنَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتِينَ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا ٣٣ وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا ٣٤ ﴾ [ الاحزاب : ٢٨، ٣٤ ]
“আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। হে নবী-পত্নীগণ, তোমাদের মধ্যে যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করবে, তার জন্য আযাব দ্বিগুণ করা হবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে এবং নেক আমল করবে আমি তাকে দু’বার তার প্রতিদান দেব এবং আমি তার জন্য প্রস্তুত রেখেছি সম্মানজনক রিযক। হে নবী-পত্নীগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক - জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়-তা তোমরা স্মরণ রেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। সূরা আহযাব: (২৮-৩৪)
এভাবেই আল্লাহ তা'আলা আহলে বায়েত তথা নবী পরিবারে সৃষ্ট জটিলতা সমাধান করেছেন। শানে নুযূল ও পূর্বাপর যোগসূত্রসহ এসব আয়াতে চিন্তা করলে যে কারো নিকট শিয়াদের অপব্যাখ্যা ও ইসলামের নামে হীনস্বার্থ সিদ্ধির মুখোশ খসে পড়বে। তারা যেহেতু দুনিয়া তলব করেছিল, তাই আল্লাহ তাদেরকে ইখতিয়ার দিয়েছেন দুনিয়া গ্রহণ কর, অথবা আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতকে গ্রহণ কর। নবীর পরিবারে কাউকে বেঁধে রাখা হয়নি। তারা যখন আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতকে গ্রহণ করল আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া-আখেরাত উভয় দান করলেন। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে সংশোধন, পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জনের বিভিন্ন আদেশ, নিষেধ ও উপদেশ প্রদান করেন: “হে নবী পরিবার তোমরা এরূপ কর, এরূপ কর না, এরূপ করলে দ্বিগুণ সাওয়াব, এরূপ না করলে দ্বিগুণ শাস্তি”।
কারণ আল্লাহ চান নবীর ঘর ও তাতে বসবাসকারী সবাই অপবিত্রতা ও দোষ মুক্ত হোক, যা নবীর আদর্শ ও সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত করতে পারে। অতএব যে নবী পরিবার ও তার সাথে সম্পৃক্ত হবে, তার স্বভাব ও চরিত্র নবীর আদর্শ মোতাবেক হওয়া চাই। যার ইচ্ছা নেই সে যেন তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয় অতঃপর যা ইচ্ছা করুক। এ জন্য নবীকে জিজ্ঞাসা করা হবে না, তখন তার সাওয়াব ও শাস্তি অন্যান্য মুসলিমদের মত হবে। যদি নবীর সাথে সম্পর্ক রাখ ও অপরাধে জড়িত হও, তাহলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে যেমন পুরষ্কার দ্বিগুণ। এটা শুধু নবীর ঘরের সম্মান ও মর্যাদার কারণেই। যেমন মসজিদে সালাত আদায় করলে সাওয়াব দ্বিগুণ, সেখানে অপরাধের শাস্তিও দ্বিগুণ। আল্লাহর ঘরে চুরি করা আর রাস্তায় চুরি করা সমান নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তার পরিবার ও তার সাথে সম্পৃক্ত, তাদের সাওয়াবের পুরষ্কার যেরূপ দ্বিগুণ, পাপের শাস্তিও দ্বিগুণ।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿... وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا ٣٣ وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا ٣٤ ﴾ [ الاحزاب : ٣٣، ٣٤ ]
“... এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়-তা তোমরা স্মরণ রেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। সূরা আহযাব: (২৮-৩৪)
অতএব যাদের উদ্দেশ্য করে এবং যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াত নাযিল হয়েছে, শিয়ারা কিভাবে তাদেরকে এর থেকে খারিজ করে!? অথচ শাব্দিক অর্থে তারাই আহলে বায়েতের প্রথম সদস্য, প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাদের ব্যতীত কাউকে এর অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু যে আরবি ভাষা বুঝে না, অথবা যার অন্তরে রয়েছে প্রবৃত্তি ও আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত রাখার ইচ্ছা, তার চোখ অন্ধ, বিবেক রুদ্ধ ও চিন্তা ব্যাধিগ্রস্ত। দেখুন শিয়ারা কিভাবে আল্লাহর কুরআনকে তিলাওয়াত করে:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ ...
হে নবী তোমার স্ত্রীদেরকে বল ...
وَإِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ...
আর যদি তোমরা কামনা কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ...
يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ مَن يَأۡتِ مِنكُنَّ ...
হে নবী-পত্নীগণ, তোমাদের মধ্যে যে করবে ...
وَمَن يَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ ...
আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে ...
يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ ...
হে নবী-পত্নীগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও ...
وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ ...
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে ...
وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ...
এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর ...
إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ ] يا علي ويا فاطمة ويا الحسن ويا الحسين [ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا
হে নবী পরিবার / আহলে বায়েত [আলি, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন !] আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।
وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ ...
[হে নবী পত্নীগণ] আর স্মরণ কর তোমাদের ঘরে যে পঠিত হয় ...
শিয়াদের এটা কি পাগলামি নয়!? আয়াতের পূর্বাপর নবীর স্ত্রীদের কথা, বারবার তাদেরকেই সম্বোধন, মাঝখানে তারা আলি, ফাতেমা ও হাসান-হুসাইনকে কিভাবে দাখিল করল?!
﴿ وَأَنزَلَ ٱلَّذِينَ ظَٰهَرُوهُم مِّنۡ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِ مِن صَيَاصِيهِمۡ وَقَذَفَ فِي قُلُوبِهِمُ ٱلرُّعۡبَ فَرِيقٗا تَقۡتُلُونَ وَتَأۡسِرُونَ فَرِيقٗا ٢٦ وَأَوۡرَثَكُمۡ أَرۡضَهُمۡ وَدِيَٰرَهُمۡ وَأَمۡوَٰلَهُمۡ وَأَرۡضٗا لَّمۡ تَطَُٔوهَاۚ وَكَانَ ٱللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ قَدِيرٗا ٢٧ ﴾ [ الاحزاب : ٢٦، ٢٧ ]
“আর আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা তাদের সহযোগিতা করেছিল, আল্লাহ তাদেরকে অবতরণ করালেন তাদের দুর্গসমূহ থেকে এবং তাদের অন্তরসমূহে ভীতির সঞ্চার করলেন। ফলে তোমরা হত্যা করছ একদলকে, আর বন্দী করছ অন্য দলকে। আর তিনি তোমাদেরকে উত্তরাধিকারী করলেন তাদের ভূমি, তাদের ঘরÑবাড়ী ও তাদের ধনÑসম্পদের এবং এমন ভূমির যাতে তোমরা পদার্পণও করনি। আল্লাহ সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান”। [সূরা আহযাব: (২৬-২৭)] এসব গনিমত গরিব মুসলিমগণ লাভ করে অভাবমুক্ত হলেন, বিশেষ করে মুহাজিরগণ। তারা নিজেদের ঘর ও পরিবারে সাধ্যানুসারে সচ্ছলতা দিলেন। তাদের নারীদের ও পরিবার দেখে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ অনুরূপ ভরণপোষণ তলব করল, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা পরবর্তী আয়াত নাযিল করেন:
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيۡنَ أُمَتِّعۡكُنَّ وَأُسَرِّحۡكُنَّ سَرَاحٗا جَمِيلٗا ٢٨﴾
“হে নবী, তুমি তোমার স্ত্রীদেরকে বল, ‘যদি তোমরা দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা কর তবে আস, আমি তোমাদের ভোগ-বিলাসের ব্যবস্থা করে দেই এবং উত্তম পন্থায় তোমাদের বিদায় করে দেই”। [সূরা আহযাব: (২৮)] পূর্বের আয়াতে যেসব সম্পদের উল্লেখ রয়েছে, তার ইচ্ছা পোষণ করেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তার নিকট সচ্ছলতা তলব করেছিল। এ আয়াতে তার সমাধান দেয়া হয়েছে। এ হচ্ছে পূর্বাপর আয়াতের যোগসূত্র। এ আয়াতে দুনিয়াবি যে জীবন ও চাকচিক্য দেয়ার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত পূর্বের আয়াতে উল্লেখিত বনু কুরাইজা থেকে প্রাপ্ত গণিমতের সম্পদ। এরপর পরবর্তী আয়াতগুলোতে আল্লাহ তা‘আলা বলে:
﴿ وَإِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَٱلدَّارَ ٱلۡأٓخِرَةَ فَإِنَّ ٱللَّهَ أَعَدَّ لِلۡمُحۡسِنَٰتِ مِنكُنَّ أَجۡرًا عَظِيمٗا ٢٩ يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ مَن يَأۡتِ مِنكُنَّ بِفَٰحِشَةٖ مُّبَيِّنَةٖ يُضَٰعَفۡ لَهَا ٱلۡعَذَابُ ضِعۡفَيۡنِۚ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٗا ٣٠ ۞وَمَن يَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِۦ وَتَعۡمَلۡ صَٰلِحٗا نُّؤۡتِهَآ أَجۡرَهَا مَرَّتَيۡنِ وَأَعۡتَدۡنَا لَهَا رِزۡقٗا كَرِيمٗا ٣١ يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ كَأَحَدٖ مِّنَ ٱلنِّسَآءِ إِنِ ٱتَّقَيۡتُنَّۚ فَلَا تَخۡضَعۡنَ بِٱلۡقَوۡلِ فَيَطۡمَعَ ٱلَّذِي فِي قَلۡبِهِۦ مَرَضٞ وَقُلۡنَ قَوۡلٗا مَّعۡرُوفٗا ٣٢ وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجۡنَ تَبَرُّجَ ٱلۡجَٰهِلِيَّةِ ٱلۡأُولَىٰۖ وَأَقِمۡنَ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتِينَ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا ٣٣ وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا ٣٤ ﴾ [ الاحزاب : ٢٨، ٣٤ ]
“আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও পরকালীন নিবাস কামনা কর, তবে তোমাদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীলদের জন্য আল্লাহ অবশ্যই মহান প্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন। হে নবী-পত্নীগণ, তোমাদের মধ্যে যে কেউ প্রকাশ্য অশ্লীল কাজ করবে, তার জন্য আযাব দ্বিগুণ করা হবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ। আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে এবং নেক আমল করবে আমি তাকে দু’বার তার প্রতিদান দেব এবং আমি তার জন্য প্রস্তুত রেখেছি সম্মানজনক রিযক। হে নবী-পত্নীগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও। যদি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে (পরপুরুষের সাথে) কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, তাহলে যার অন্তরে ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে। আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে এবং প্রাক - জাহেলী যুগের মত সৌন্দর্য প্রদর্শন করো না। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়-তা তোমরা স্মরণ রেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। সূরা আহযাব: (২৮-৩৪)
এভাবেই আল্লাহ তা'আলা আহলে বায়েত তথা নবী পরিবারে সৃষ্ট জটিলতা সমাধান করেছেন। শানে নুযূল ও পূর্বাপর যোগসূত্রসহ এসব আয়াতে চিন্তা করলে যে কারো নিকট শিয়াদের অপব্যাখ্যা ও ইসলামের নামে হীনস্বার্থ সিদ্ধির মুখোশ খসে পড়বে। তারা যেহেতু দুনিয়া তলব করেছিল, তাই আল্লাহ তাদেরকে ইখতিয়ার দিয়েছেন দুনিয়া গ্রহণ কর, অথবা আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতকে গ্রহণ কর। নবীর পরিবারে কাউকে বেঁধে রাখা হয়নি। তারা যখন আল্লাহ, রাসূল ও আখেরাতকে গ্রহণ করল আল্লাহ তাদেরকে দুনিয়া-আখেরাত উভয় দান করলেন। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে সংশোধন, পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতা অর্জনের বিভিন্ন আদেশ, নিষেধ ও উপদেশ প্রদান করেন: “হে নবী পরিবার তোমরা এরূপ কর, এরূপ কর না, এরূপ করলে দ্বিগুণ সাওয়াব, এরূপ না করলে দ্বিগুণ শাস্তি”।
কারণ আল্লাহ চান নবীর ঘর ও তাতে বসবাসকারী সবাই অপবিত্রতা ও দোষ মুক্ত হোক, যা নবীর আদর্শ ও সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত করতে পারে। অতএব যে নবী পরিবার ও তার সাথে সম্পৃক্ত হবে, তার স্বভাব ও চরিত্র নবীর আদর্শ মোতাবেক হওয়া চাই। যার ইচ্ছা নেই সে যেন তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয় অতঃপর যা ইচ্ছা করুক। এ জন্য নবীকে জিজ্ঞাসা করা হবে না, তখন তার সাওয়াব ও শাস্তি অন্যান্য মুসলিমদের মত হবে। যদি নবীর সাথে সম্পর্ক রাখ ও অপরাধে জড়িত হও, তাহলে শাস্তি দ্বিগুণ হবে যেমন পুরষ্কার দ্বিগুণ। এটা শুধু নবীর ঘরের সম্মান ও মর্যাদার কারণেই। যেমন মসজিদে সালাত আদায় করলে সাওয়াব দ্বিগুণ, সেখানে অপরাধের শাস্তিও দ্বিগুণ। আল্লাহর ঘরে চুরি করা আর রাস্তায় চুরি করা সমান নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীগণ তার পরিবার ও তার সাথে সম্পৃক্ত, তাদের সাওয়াবের পুরষ্কার যেরূপ দ্বিগুণ, পাপের শাস্তিও দ্বিগুণ।
অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন:
﴿... وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥٓۚ إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا ٣٣ وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ مِنۡ ءَايَٰتِ ٱللَّهِ وَٱلۡحِكۡمَةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ لَطِيفًا خَبِيرًا ٣٤ ﴾ [ الاحزاب : ٣٣، ٣٤ ]
“... এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে। আর তোমাদের ঘরে আল্লাহর যে, আয়াতসমূহ ও হিকমত পঠিত হয়-তা তোমরা স্মরণ রেখো। নিশ্চয়ই আল্লাহ অতি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত। সূরা আহযাব: (২৮-৩৪)
অতএব যাদের উদ্দেশ্য করে এবং যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে এ আয়াত নাযিল হয়েছে, শিয়ারা কিভাবে তাদেরকে এর থেকে খারিজ করে!? অথচ শাব্দিক অর্থে তারাই আহলে বায়েতের প্রথম সদস্য, প্রেক্ষাপট বিবেচনায় তাদের ব্যতীত কাউকে এর অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব নয়। কিন্তু যে আরবি ভাষা বুঝে না, অথবা যার অন্তরে রয়েছে প্রবৃত্তি ও আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত রাখার ইচ্ছা, তার চোখ অন্ধ, বিবেক রুদ্ধ ও চিন্তা ব্যাধিগ্রস্ত। দেখুন শিয়ারা কিভাবে আল্লাহর কুরআনকে তিলাওয়াত করে:
يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّبِيُّ قُل لِّأَزۡوَٰجِكَ ...
হে নবী তোমার স্ত্রীদেরকে বল ...
وَإِن كُنتُنَّ تُرِدۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ...
আর যদি তোমরা কামনা কর আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ...
يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ مَن يَأۡتِ مِنكُنَّ ...
হে নবী-পত্নীগণ, তোমাদের মধ্যে যে করবে ...
وَمَن يَقۡنُتۡ مِنكُنَّ لِلَّهِ وَرَسُولِهِ ...
আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে ...
يَٰنِسَآءَ ٱلنَّبِيِّ لَسۡتُنَّ ...
হে নবী-পত্নীগণ, তোমরা অন্য কোন নারীর মত নও ...
وَقَرۡنَ فِي بُيُوتِكُنَّ ...
আর তোমরা নিজ গৃহে অবস্থান করবে ...
وَأَطِعۡنَ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُ ...
এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর ...
إِنَّمَا يُرِيدُ ٱللَّهُ لِيُذۡهِبَ عَنكُمُ ٱلرِّجۡسَ أَهۡلَ ٱلۡبَيۡتِ ] يا علي ويا فاطمة ويا الحسن ويا الحسين [ وَيُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِيرٗا
হে নবী পরিবার / আহলে বায়েত [আলি, ফাতেমা, হাসান ও হুসাইন !] আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।
وَٱذۡكُرۡنَ مَا يُتۡلَىٰ فِي بُيُوتِكُنَّ ...
[হে নবী পত্নীগণ] আর স্মরণ কর তোমাদের ঘরে যে পঠিত হয় ...
শিয়াদের এটা কি পাগলামি নয়!? আয়াতের পূর্বাপর নবীর স্ত্রীদের কথা, বারবার তাদেরকেই সম্বোধন, মাঝখানে তারা আলি, ফাতেমা ও হাসান-হুসাইনকে কিভাবে দাখিল করল?!