hadith book logo

মুসলিম উম্মাহর মানসিক বিপর্যয়ঃ কারণ ও প্রতিকার

লেখকঃ ড. আব্দুল্লাহ আল-খাতির • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১৭

তৃতীয় কারণঃ দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে অনিবার্য বিপদাপদের ভয়

দ্বীন আহকাম পালনে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে যেসব বিপদাপদের মুখোমুখি হতে হয়, বর্তমান মুসলিমগণ তার জন্য সম্পূর্ণ অপ্রস্ত্তত। সেগুলোকে তারা অনাকাঙ্খিত মনে করে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় তারা যেন এই আশা নিয়ে বসে আছে যে, দ্বীনের পথ হবে কুসুমাস্তীর্ণ, সহজ-সংক্ষেপ ও বিপদমুক্ত। অথচ প্রকৃত সত্য হল, দ্বীনের পথ হচ্ছে বিপদসংকুল ও কন্টকাকীর্ণ। পরীক্ষা করার জন্যই আল্লাহ তাআলা এসব বিপদাপদ দিয়ে থাকেন। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آَمَنَّا وَهُمْ لا يُفْتَنُونَ . وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ .

‘‘মানুষ কি মনে করে যে, তারা এ কথা বলেই অব্যাহতি পেয়ে যাবে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না। আমি তো তাদেরকে পরীক্ষা করেছি যারা এদের পূর্বে ছিল। আল্লাহ নিশ্চয়ই জেনে নিবেন (প্রকাশ করবেন) কারা সত্যবাদী এবং নিশ্চয়ই জেনে নিবেন (প্রকাশ করবেন) কারা মিথ্যাবাদী।’’ (সূরা আনকাবুতঃ ২-৩)

সুতরাং যারা এ আশা পোষণ করে যে, দ্বীনের পথ হবে নিস্কন্টক, সহজ ও বিপদমুক্ত, তারা মূলতঃ ভুলের মধ্যে রয়েছে। কেননা বিপদাপদ এসে থাকে ইসলাম অনুসরণে একনিষ্ঠতার দাবীতে সত্যবাদী ও মিথ্যাবাদীদের মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করার জন্য। এ জন্য আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনঃ

فليعلمن الله الذين صدقوا وليعلمن الكاذبين .

‘‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা জেনে নিবেন (প্রকাশ করে দিবেন) কারা সত্য বলেছে, আর কারা মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে।’’

যারা সত্যবাদী, শত বিপদের সময়েও তারা দ্বীনের উপর অবিচল থাকে। আর যারা মিথ্যাশ্রয়ী, বিপদের সময় তাদের স্বরূপ উন্মোচিত হয়ে যায়।

সত্যবাদিতা ও একনিষ্ঠতা তো আর দাবী করে প্রমাণ করার বিষয় নয় যে, ‘আমার ঈমান ঠিক’ ‘আমার দিল সাফ’ ইত্যাদি বাগাড়ম্বর দ্বারা তা প্রমাণিত হয়ে যাবে। বরং সত্যবাদিতা হল কঠিন বাস্তবতা- যা প্রমাণিত হয় বাস্তব জীবনে বিপদ ও মুসীবতের মুখোমুখি হলে।

এ বিপদ দু’ধরনের হয়ে থাকে, ছোট ও বড়। দ্বীনের উপর চলতে গিয়ে পরিবারস্থ লোকজন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের দিক থেকে যে সব বাধা বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয় সেগুলো ছোট বিপদ। আর জেল, জুলুম, হত্যা, নির্যাতন, নাগরিকত্ব হরণ ইত্যাকার মুসিবত হল বড় বিপদ। ছোট হোক, আর বড় হোক- দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাধা-বিপত্তি ও বিপদাপদের সম্মুখীন হওয়াটা স্বাভাবিক। এসব বাধা-বিপত্তি ডিঙ্গিয়ে এবং দুঃখ-যতনা জয় করেই অবিরাম সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কাজেই দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথে কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করার জন্য সবাইকে মানসিকভাবে প্রস্ত্তত থাকতে হবে। কেননা দ্বীনের পথ হল কন্টকময়, বন্ধুর। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ

حفت النار بالشهوات وحجت الجنة بالمكاره

‘‘জাহান্নামকে প্রবৃত্তির কামনা দ্বারা, আর জান্নাতকে কষ্ট-ক্লেশ দ্বারা আবৃত করা হয়েছে।’’ (বুখারী : ২/৯৬০)

অর্থাৎ যে সব কর্মের পরিণতিতে মানুষ জাহান্নামে যাবে, তার সবগুলোই বাহ্যিকভাবে সুন্দর ও মনোগ্রাহী। সফস বা প্রবৃত্তি এগুলোকে খুবই পছন্দ করে। এজন্য জাহান্নামের পথ অতি সহজ। আর যে সব কর্মগুণে মানুষ জান্নাতের অধিকারী হবে, সেগুলো কঠিন ও কষ্টকর। প্রবৃত্তি কখনো তা করতে চায় না। এজন্য জান্নাতের রাস্তা কঠিন ও বিপদসংকুল। তাই জান্নাতের প্রত্যাশী ঈমানদারদের বিপদাপদে মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত থাকতে হবে।