hadith book logo

দানে বাড়ে সম্পদ, বৃদ্ধি পায় মর্যাদা

লেখকঃ কামাল উদ্দিন মোল্লা • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৩

জাকাত বা ওশর প্রসঙ্গ

زكاة জাকাত এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে বৃদ্ধি ও পবিত্র হওয়া। ইসলামি পরিভাষায় জাকাত বলা হয়, শরিয়তের নির্দেশ অনুযায়ী স্বীয় মালের একটা নির্ধারিত অংশ তার হকদারদের মাঝে বন্টন করা এবং তার আয় হতে নিজেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখা।

عُشْرٌ ওশর এর অর্থ হচ্ছে উৎপন্ন শস্যের এক দশমাংশ দান করা। অর্থাৎ বৃষ্টির পানিতে ও বিনা সিঞ্চনে উৎপাদিত শস্যের দশ ভাগের এক ভাগ বা বিশ মণে দুই মণ, আর সিঞ্চনের মাধ্যমে উৎপাদিত হলে নিসফ ওশর বা বিশ মণে এক মণ বর্ণিত নিয়মানুসারে দান করে দেয়া।

উল্লেখ্য, হিজরি ২য় সনে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার পূর্বে জাকাত বিস্তারিত বিবরণসহ ফরজ হয়।

স্মর্তব্য, জাকাত আদায়ের মাধ্যমে মাল-সম্পদ বৃদ্ধি পায় ও পবিত্র হয়। আর আদায়কারী (জাকাত দাতা) কৃপণতার দোষ হতে প্রবিত্রতা লাভে ধন্য হয়। সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ তাআলাও খুশি হন। বস্তুত: জাকাত হচ্ছে ইসলামের ৩য় স্তম্ভ। যেমন হাদিসে বলা হয়েছে:

عَنْ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَالْحَجِّ وَصَوْمِ رَمَضَانَ . رواه البخاري

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের উপর স্থাপিত। এক. সাক্ষ্য দেয়া যে আল্লাহ ব্যতীত কোনো (সত্য) মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর রাসূল। দুই. নামাজ কায়েম করা। তিন. জাকাত প্রদান করা। চার. হজ্জ সম্পাদন করা। পাঁচ. রমজান মাসে রোজা রাখা। বোখারি ।

এ হাদিসে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাকাতকে ইসলামরে ৩য় স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করছেন। তাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামে জাকাতের গুরুত্ব অনেক বেশি। তাই তো দেখা যায় পবিত্র কোরআন ও হাদিসে অনেক বেশি পরিমাণে এর উপকারিতার বর্ণনা এসেছে। প্রায় জায়গাতেই নামাজের পাশাপাশি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জাকাত প্রদানের নির্দেশ দিয়ে নামাজের মতই এর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। পার্থক্য এই যে নামজ কায়িম করা প্রাপ্ত বয়স্ক ধনী গরিব নির্বিশেষে সকলের জন্য বাধ্যতামূলক, আর জাকাত আদায় করা কেবল ধনীদের জন্য ফরজ। এছাড়া নামাজের হুকম দৈনিক পাঁচ বার পালনীয়। আর জাকাত প্রতি বছর মাত্র একবার আদায় করা কর্তব্য। বস্তুত: নামজ হচ্ছে ইবাদতে বদনি বা শারীরিক ইবাদত, যা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের দ্বারা সম্পাদন করতে হয়। আর জাকাত হচ্ছে, ইবাদতে মালী বা আর্থিক ইবাদত যা সাধারণত: অর্থ, সম্পদ ব্যয় ও দানের মাধ্যমে সম্পাদন করতে হয়।

জাকাত প্রদানের নির্দেশ অবশ্য পালনীয়। এ ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কোরআনুল কারিমে অনেক আয়াত নাজিল করেছেন। বিশেষত: নামাজের নির্দেশের পরপরই জাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই জাকাতের গুরুত্বকে কোনোক্রমেই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অপরিহার্য বা বাধ্যতামূলক দানসমূহের মধ্যে জাকাতই হচ্ছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রাপকদের অভাব পূরণে প্রধানতম সহায়ক দান। তাই এখানে জাকাতের গুরুত্ব ও ফজিলত এবং জাকাত না দেয়ার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।

নামাজের পাশাপাশি জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন:

(আরবি)

‘আর তোমরা সালাত কায়েম কর ও জাকাত দাও এবং যে নেক আমল তোমরা নিজেদের জন্য আগে প্রেরণ করবে তাই আল্লাহর নিকট পাবে। সূরা বাকারা, ১১০

জাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবীকে বলেন:

(আরবি)

‘ তুমি তাদের মাল হতে সদকাহ (জাকাত) গ্রহণ কর। যা দ্বারা তুমি তাদেরকে পবিত্র করবে। ( সূরা তাওবা : ১০৩)

জাকাত ও ওশর গ্রহণ এবং উত্তম বস্তু ব্যয়ের নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ তাআলা আরো বলেন:

(আরবি)

হে মুমিনগণ, তোমরা ব্যয় কর উত্তম বস্তু, তোমরা যা অর্জন করেছ এবং আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য যা উৎপন্ন করেছি তা থেকে এবং নিকৃষ্ট বস্তুর ইচ্ছা করো না যে, তা থেকে তোমরা ব্যয় করবে। অথচ চোখ বন্ধ করা ছাড়া যা তোমরা গ্রহণ করো না। আর জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহ অভাবমুক্ত, সপ্রশংসিত। (সূরা বাকারা: ২৬৭)

জাকাত ফরজ হওয়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম. বলেন:

ثُمَامَةُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ أَنَسٍ أَنَّ أَنَسًا حَدَّثَهُ أَنَّ أَبَا بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ كَتَبَ لَهُ هَذَا الْكِتَابَ لَمَّا وَجَّهَهُ إِلَى الْبَحْرَيْنِ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ هَذِهِ فَرِيضَةُ الصَّدَقَةِ الَّتِي فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ وَالَّتِي أَمَرَ اللَّهُ بِهَا رَسُولَهُ فَمَنْ سُئِلَهَا مِنْ الْمُسْلِمِينَ عَلَى وَجْهِهَا فَلْيُعْطِهَا وَمَنْ سُئِلَ فَوْقَهَا فَلَا يُعْطِ . رواه البخاري

‘ছুমামা বিন আব্দুল্লাহ বিন আনাস বলেন, আনাস রাদিয়াল্লাহু তাকে বলেছেন যে, তাকে যখন খলিফা আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বাহরাইনের শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠাচ্ছিলন, তখন তাকে এ নির্দেশ নামাটি লিখে দিয়েছিলেন। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। এটা ফরজ সদকা বা জাকাত যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুসলমানদের প্রতি ফরজ করে দিয়েছেন এবং যার নির্দেশ আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে দিয়েছেন। যে কোনো মুসলমানের নিকট এটা নির্দিষ্ট নিয়মে চাওয়া হবে, সে যেন তা দিয়ে দেয়। আর যার নিকট এর অধিক চাওয়া হবে সে যেন না দেয়। ........বোখারি।

একই বিষয়ে অপর এক হাদিসে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِمُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ حِينَ بَعَثَهُ إِلَى الْيَمَنِ إِنَّكَ سَتَأْتِي قَوْمًا أَهْلَ كِتَابٍ فَإِذَا جِئْتَهُمْ فَادْعُهُمْ إِلَى أَنْ يَشْهَدُوا أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَأَخْبِرْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لَكَ بِذَلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ . رواه البخاري

‘ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়ায বিন জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়েমের উদ্দেশ্যে পাঠানোর সময় বললেন: তুমি আহলে কিতাবদের নিকট যাচ্ছ। তুমি প্রথমে তাদেরকে এ ঘোষণা বা সাক্ষ্য দিতে আহবান জানাবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) উপাস্য নেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয়, তবে তাদেরকে বলবে যে, আল্লাহ তাআলা তাদের উপর দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করেছেন। অত:পর তারা যদি এটাও মেনে নেয় তখন তাদেরকে বলবে যে, আল্লাহ তাদের উপর সদকা (জাকাত) ফরজ করেছেন, যা তাদের ধনীদের নিকট হতে গ্রহণ করে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে বন্টন করা হবে। যদি তারা তোমার এ কথা মেনে নেয় তবে সাবধান! জাকাত গ্রহণের সময় তুমি বেছে বেছে শুধু তাদের উত্তম জিনিসসমূহ নিবে না। আর সতর্ক থাকবে মজলুমের অভিশাপ হতে। কেননা মজলুমের বদদুআ ও আল্লাহর মধ্যে কোন আড়াল নেই। বোখারি।

জাকাত ফরজ হওয়ার প্রমাণে আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস:

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَلَمَّا نَزَلَتْ هَذِهِ الْآيَةُ { وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ } قَالَ كَبُرَ ذَلِكَ عَلَى الْمُسْلِمِينَ فَقَالَ عُمَرُ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَا أُفَرِّجُ عَنْكُمْ فَانْطَلَقَ فَقَالَ يَا نَبِيَّ اللَّهِ إِنَّهُ كَبُرَ عَلَى أَصْحَابِكَ هَذِهِ الْآيَةُ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ اللَّهَ لَمْ يَفْرِضْ الزَّكَاةَ إِلَّا لِيُطَيِّبَ مَا بَقِيَ مِنْ أَمْوَالِكُمْ وَإِنَّمَا فَرَضَ الْمَوَارِيثَ لِتَكُونَ لِمَنْ بَعْدَكُمْ فَكَبَّرَ عُمَرُ ثُمَّ قَالَ لَهُ أَلَا أُخْبِرُكَ بِخَيْرِ مَا يَكْنِزُ الْمَرْءُ الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ إِذَا نَظَرَ إِلَيْهَا سَرَّتْهُ وَإِذَا أَمَرَهَا أَطَاعَتْهُ وَإِذَا غَابَ عَنْهَا حَفِظَتْهُ سنن أبي داود

ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন এ আয়াত নাজিল হল, ‍‍‍‍‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌‌ যারা সোনা রুপা জমা করে’ মুসলমানদের নিকট এটা কষ্টসাধ্য বোধ হলো। অত:পর ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন: আমি তোমাদের এ কষ্ট দূর করব। তারপর তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট গেলেন এবং বললেন: হে আল্লাহর নবী! এ আয়াতটি আপনার সহচরদের উপর ভারিবোধ হচ্ছে। তখন তিনি বললেন: ‌‌‌‌ ’ আল্লাহ তাআলা এজন্যই জাকাত ফরজ করেছেন, যাতে তোমাদের অবশিষ্ট মালকে পবিত্র করে নেন। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ মীরাস ফরজ করেছেন। যাতে তা তোমাদের পরবর্তীদের জন্য হয়। এ কথা শুনে উমর রা. ‌ ’আল্লাহু আকবার’ বলে উঠলেন। অত:পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আমি কি তোমাকে মানুষ যা সংরক্ষণ করে, তার মধ্যে উত্তম কোনটি সে বিষয়ে বলব না ? সেটি হলো নেককার নারী (স্ত্রী), যখন সে তার দিকে তাকায় সন্তুষ্ট (ও আনন্দিত) করে দেয়। যখন কোনো নির্দেশ দেয় তা পালন করে আর যখন সে তার নিকট হতে দূরে থাকে সে তার হক সংরক্ষণ করে। (বর্ণনায় আবু দাউদ)

বাধ্যতামূলক দানসমূহের মধ্যে জাকাত ও ওশর প্রদানের হুকুম যে অবশ্য পালনীয়, তার প্রমাণে আল্লাহর পবিত্র কালাম কোরআন মাজিদের পাশাপাশি উপরের তিনটি হাদীসও বিশেষভাবে প্রনিধান যোগ্য। যাতে বিদালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে জাকাতের ফরজিয়ত বা আবশ্যিকতা বিবৃত হয়েছে। ফলে জাকাত ফরজ হওয়ার ব্যাপারে আর কোনো সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।