hadith book logo

বিশ্বমানবতার প্রতি বিশ্বনবীর শাশ্বত অবদান

লেখকঃ সিরাজুল ইসলাম আলী আকবর • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ২

বিশ্বমানবতার প্রতি বিশ্বনবীর শাশ্বত অবদান

দীন ও রিসালাতের ইতিহাসে অনন্য ঘোষণা,

﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧﴾ [ الانبياء : ١٠٧ ]

“আর আমরা আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৭]

বস্তুত ধর্ম ও রিসালাতের ইতিহাসে এ এক অনন্য ও দৃষ্টান্তহীন ঘোষণা। এই ঘোষণায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সমগ্র বিশ্বলোক ও তার মধ্যে অবস্থিত সব কিছুর জন্য আল্লাহর একমাত্র ‘রহমত’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার শাশ্বত কালাম কুরআন মাজীদে এ চূড়ান্ত ঘোষণা বিধৃত। আর কুরআন বিশ্বমানবের অধ্যয়নের চিরন্তন গ্রন্থ। দুনিয়ার অসংখ্য মানুষ এ কালাম দিন রাত চব্বিশ ঘন্টা তিলওয়াত করছে। এ কুরআনের সার্বিক ও পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণের দায়িত্ব আল্লাহ তা‘আলা নিজেই গ্রহণ করেছেন।

যুগ, কাল ও শতাব্দির সীমাহীন প্রেক্ষিতে আল্লাহর এ ঘোষণা যেমন অসাধারণ, তেমনি সম্পূর্ণ ব্যাতিক্রমধর্মী ও দৃষ্টান্তহীন। কাল, বংশ ও ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের পরিবেষ্টনী থেকে মুক্ত হয়েই আল্লাহর এ অনন্য ঘোষণার তাৎপর্য ও যথার্থতা অনুসন্ধান করতে হবে। কেননা বিশ্বনবীর অবস্থান স্থান-কাল-বংশের সীমাবদ্ধতা ও সংকীর্ণতার বহু ঊর্ধ্বে। আল্লাহর এ ঘোষণায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেবল আরব উপদ্বীপ, প্রাচ্য বা পাশ্চাত্য কিংবা কোনো বিশেষ মহাদেশের অথবা বিশেষ জাতি-গোষ্ঠী-বর্ণ-গোত্রের অথবা বিশেষ কোনো যুগের জন্য রহমত বলা হয় নি। বলা হয়েছে, তিনি সর্বকালের সমগ্র বিশ্বলোকের জন্য রহমত।

সত্যি কথা, এ ঘোষণার ব্যাপকতা, বিশালতা, উচ্চতা, বিরাটত্ব ও মহত্ব এবং চিরন্তনতা অনস্বীকার্য। বিশ্বের ঐতিহাসিক ও দার্শনিকগণ এ ঘোষণার যথার্থতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়েছে। গোটা মানবীয় মেধা-চিন্তা, প্রতিভা-মণীষা এ ঘোষণার ফলে বিস্মিত, স্তম্ভিত। কেননা দুনিয়ার ধর্মমতসমূহে, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও দর্শনের ইতিহাসে, সংস্কারমূলক আন্দোলন ও বিপ্লবী তৎপরতার বিবরণে এরূপ বিশ্ব-ব্যাপক ও সার্বজনীন ঘোষণার কোনো দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের ক্ষেত্রেও এরূপ কোনো ঘোষণার উল্লেখ নেই। কারো সম্পর্কেই এরূপ ঘোষণা কোনো ধর্মগ্রন্থে, কোনো জীবন চরিতে কোনো ব্যক্তি বা জনসমষ্ঠির জন্য কোনো দিনই উচ্চারিত হয় নি।

ধর্মের পর্যায়ে ও ধারাবাহিকতায় ইয়াহুদী ধর্ম প্রাচীনতম। তাতে স্বয়ং আল্লাহকে বনী ইসরাঈলের ‘রব’ বলে পরিচিত করা হয়েছে। বাইবেলের ‘পুরাতন নিয়ম’ অংশে ‘রাব্বুল আলামীন’ সমগ্র বিশ্বলোকের রব বলে স্বয়ং আল্লাহকে পরিচিত করা হয় নি। তাই পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের মধ্যে কারো জন্যে এ ধরণের কোনো ঘোষণার সন্ধান করা নিতান্তই অর্থহীন।

খ্র্রিস্টধর্মের গ্রন্থ ‘নতুন নিয়মে’ নবী ঈসা আলাইহিস সালাম নিজেকে কেবল বনী ইসরাঈলের বিভ্রান্ত লোক সমষ্টিকে সঠিক পথে নিয়ে আসার জন্য প্রেরিত বলে পরিচিত করেছেন। নির্বিশেষে সমগ্র মানবতার প্রতি তার কোনো বক্তব্যই উদ্ধৃত হয় নি। হিন্দু ধর্মের গ্রন্থাবলীতে বড় বড় ব্যক্তিত্বের উল্লেখ রয়েছে বটে; কিন্তু তারা কেউই বনী ইসরাঈলের নবী-রাসূলদের চেয়ে ভিন্নতর কোনো বিশেষত্বের দাবীদার ছিলেন না। বিশেষতঃ ব্রাহ্মণ্য ধর্মে সাধারণ মানুষের কোনো স্থান নেই। তারা সকল প্রকার মানবিক মর্যাদা ও অধিকার থেকে জন্মগতভাবেই বঞ্চিত বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। মনু শাস্ত্রে বলা হয়েছে, নীচ জাতের লোকদেরকে সৃষ্টিকর্তা কেবল উঁচুজাতের লোকদের দাসত্ব করার উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন।

প্রাচীন ভারতের লোকেরা হিমালয়ের বাইরের জগত এবং মানুষ সম্পর্কে কিছুই জানত না। বহির্জগতের সাথে তাদের কোনো সম্পর্ক বা যোগাযোগই ছিল না। বাইরের মানুষ সম্পর্কে জানার কোনো আগ্রহও তাদের ছিল না। কাজেই এখানে প্ররিত কোনো মহাপুরুষকে বিশ্বের রহমত বলার প্রশ্নই উঠে না।