১
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামাজিক বিপ্লবের স্বরূপ
লেখকঃ সিরজুল ইসলাম আলী আকবর • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪
রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়ে সমাজ
আমরা সকলেই জানি যে, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী ভূ-খন্ডের প্রসিদ্ধ নগর মক্কায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন সেখানেই তিনি লালিত-পালিত ও বর্ধিত হয়েছিলেন। এই নগরের অধিবাসীরা একটি প্রাচীনতম সমাজের উত্তরাধিকারী। ঐতিহাসিকভাবে এই নগরের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল চার হাজার বছর পূর্বে হযরত ইব্রাহীম (আ) এর পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ) এর বংশধরদের দ্বারা, যদিও প্রায় সেই একই সময়ে আরও কোন কোন বংশের লোকেরা এখানে বসতি স্থাপন করেছিল।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের সময়কালীন আরব উপদ্বীপের একটা মুটামুটি চিত্র তুলে ধরার জন্য বলতে হচ্ছে এই সময়ের আরবরা নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে অধঃপতনের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যভিচার, মদ্যপান ও জুয়াখেলা ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক কর্ম। নির্মমতা ও স্ব-কল্পিত আত্মম্ভরিতা তাদেরকে সন্তান হত্যার বীভৎসতা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। ছিনতাই অপহরণ ও কাফেলার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ সৃষ্টি ও ধন-সম্পদ লুটে-পুটে নেয়াই ছিল তাদের অর্থনৈতিক তৎপরতা। নারী সমাজ ছিল সম্পূর্ণ অবহেলিত ও মানবিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তারা পশুকুল ও বস্তুসম্পদের ন্যায় উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তরিত হত। বহু প্রকারের খাদ্য কেবল পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, যা নারীদের খাওয়ার অধিকার ছিল না। পুরুষরা অসংখ্য নারীদের ভোগ করার স্বাধীনতা ভোগ করত, নারী পুরুষদের অবাধ মেলামেশা ও নাচ গান, ফূর্তিতে তারা মশগুল হয়ে থাকত। দারিদ্র ও খাদ্যাভাবের চিন্তায় তারা সন্তান হত্যা করত। জীবন্ত সন্তানকে সূতিকাগারে গলা টিপে বা অন্যভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হত। আর যে সন্তানকে সূতিকাগারে হত্যা করা কোন কারণে সম্ভব হত না, পরবর্তীকালে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হত। কুরআন, হাদীস এবং ইতিহাসে এর সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
যে সমাজে জনগণের জীবন গোত্রভূক্ত। আর গোত্রীয় হিংসা-বিদ্বেষ রক্তক্ষয়ী অবস্থার সৃষ্টি করত। গোত্রসমূহের মাঝে একবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তা বংশানুক্রমিকভাবে ও শত শত বছর ধরে চলত, আর তাতে হাজার হাজার মানুষের জীবন নিঃশেষ হয়ে যেত।
তখনকার আরব দেশে আধুনিক ধরণের কোন রাষ্ট্র বা সরকার ব্যবস্থা ছিল না। পারস্পারিক বিবাদ মীমাংসা বা মজলুমের ফরিয়াদ শোনার জন্য কোন বিচার ব্যবস্থা ছিল না। শান্তি শৃংখলা রক্ষার জন্য পুলিশ বা বৈদেশিক আগ্রাসন প্রতিরোধের জন্য কোন সুসংগঠিত সেনাবাহিনী ছিল না, কোন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ছিল না, কর ধার্য ও আদায় করার জন্য অপরাধীর বিচার ও শাস্তি দানেরও কোন ব্যবস্থা ছিল না। কোন ব্যক্তির কোন অধিকার বা মর্যাদা সুরক্ষিত ছিল না। কেউ অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে তা ফিরিয়ে দেয়ারও কেউ ছিল না। এক এক গোত্রের অন্তভূক্ত লোকদের কোন সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না অপরাপর গোত্রের লোকদের সঙ্গে। মানুষ ছিল মরুভূমির উন্মুক্ত প্রান্তরের পশুকূলের মতো লাগামহীন। গোত্রের সর্বাধিক প্রবীন ব্যক্তি (যে অধিক ধন-সম্পদের মালিক ও সমধিক প্রভাবশালী)-কে গোত্রের সরদার বানানো হত। কোন গোত্রের লোকসংখ্যা বেশী হয়ে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে গেলে এক একটি শাখা-গোত্র স্বাধীন ও স্বতন্ত্র গোত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করত। এভাবে গোত্র ব্যবস্থা সমগ্র আরবে বিস্তৃত ও সমপ্রসারিত হয়ে পড়েছিল। গোত্র ব্যবস্থায় কোন গোত্রের একজন লোক যদি অন্যায় করত অন্য গোত্রের কোন ব্যক্তির সাথে তাহলে তার গোত্রের সব লোক তাকে পূর্ণ সমর্থন দিত। প্রয়োজন হলে তার জন্য যুদ্ধও শুরু করে দিত।
তখন মক্কা তথা গোটা আরবে প্রচলিত ছিল মূর্তি পূজার ধর্ম (দীন)। আমর ইবনে লুহাই নামের খুজারী বংশের এক ব্যক্তি সিরিয়া থেকে এই মূর্তি পূজার পদ্ধতি কাবাগৃহে এনে স্থাপন করেছিল। ভাগ্য গণনার জন্য বা কাজের ভালো-মন্দ ফল জানবার জন্য তারা তীর ব্যবহার করত এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। লাত, মানাত, হুবল, ওজ্জা প্রভূতি ছিল কুরাইশ বংশের সেরা মূর্তি। তারা এসব মূর্তির সন্তুষ্টির জন্য সেগুলোর সামনে পশু বলি দিত। লেখাপড়াও জ্ঞান চর্চার কোন সুষ্ঠু ব্যবস্থা ছিল না। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু লোক নিজস্ব চেষ্টা ও উদ্যোগে কিছু পরিমাণ লেখা-পড়ার যোগ্যতা অর্জন করে ছিল। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বলা যায়, মক্কা ছিল একটি নগর, যেটি জীবন-ধারা, সামাজিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক দিয়ে ছিল সম্পূর্ণ বাল্যাবস্থায়। খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকে মক্কা যাযাবরত্ব (Nomadism) থেকে সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছিল বলা যায়। তবে সেই সভ্যতা ছিল খুবই সীমাবদ্ধতায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা যায়- তদানীন্তন সমগ্র দুনিয়া, বিশেষ করে গোটা আরব উপদ্বীপ ছিল প্রগাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত। আর মক্কা নগরের অবস্থান ছিল সূচিভেদ্য অন্ধকারের নিম্নদেশে। অথচ এ নগরেই আল্লাহতায়ালা তাঁর সবশেষ নবী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ছিলেন। কিন্তু কেন?
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের সময়কালীন আরব উপদ্বীপের একটা মুটামুটি চিত্র তুলে ধরার জন্য বলতে হচ্ছে এই সময়ের আরবরা নৈতিক চরিত্রের দিক দিয়ে অধঃপতনের চরম সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। ব্যভিচার, মদ্যপান ও জুয়াখেলা ছিল তাদের নিত্য নৈমিত্তিক কর্ম। নির্মমতা ও স্ব-কল্পিত আত্মম্ভরিতা তাদেরকে সন্তান হত্যার বীভৎসতা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। ছিনতাই অপহরণ ও কাফেলার উপর অতর্কিত আক্রমণ চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ সৃষ্টি ও ধন-সম্পদ লুটে-পুটে নেয়াই ছিল তাদের অর্থনৈতিক তৎপরতা। নারী সমাজ ছিল সম্পূর্ণ অবহেলিত ও মানবিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। তারা পশুকুল ও বস্তুসম্পদের ন্যায় উত্তরাধিকারীদের নিকট হস্তান্তরিত হত। বহু প্রকারের খাদ্য কেবল পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট ছিল, যা নারীদের খাওয়ার অধিকার ছিল না। পুরুষরা অসংখ্য নারীদের ভোগ করার স্বাধীনতা ভোগ করত, নারী পুরুষদের অবাধ মেলামেশা ও নাচ গান, ফূর্তিতে তারা মশগুল হয়ে থাকত। দারিদ্র ও খাদ্যাভাবের চিন্তায় তারা সন্তান হত্যা করত। জীবন্ত সন্তানকে সূতিকাগারে গলা টিপে বা অন্যভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হত। আর যে সন্তানকে সূতিকাগারে হত্যা করা কোন কারণে সম্ভব হত না, পরবর্তীকালে তাকে জীবন্ত কবর দেয়া হত। কুরআন, হাদীস এবং ইতিহাসে এর সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে।
যে সমাজে জনগণের জীবন গোত্রভূক্ত। আর গোত্রীয় হিংসা-বিদ্বেষ রক্তক্ষয়ী অবস্থার সৃষ্টি করত। গোত্রসমূহের মাঝে একবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তা বংশানুক্রমিকভাবে ও শত শত বছর ধরে চলত, আর তাতে হাজার হাজার মানুষের জীবন নিঃশেষ হয়ে যেত।
তখনকার আরব দেশে আধুনিক ধরণের কোন রাষ্ট্র বা সরকার ব্যবস্থা ছিল না। পারস্পারিক বিবাদ মীমাংসা বা মজলুমের ফরিয়াদ শোনার জন্য কোন বিচার ব্যবস্থা ছিল না। শান্তি শৃংখলা রক্ষার জন্য পুলিশ বা বৈদেশিক আগ্রাসন প্রতিরোধের জন্য কোন সুসংগঠিত সেনাবাহিনী ছিল না, কোন প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ছিল না, কর ধার্য ও আদায় করার জন্য অপরাধীর বিচার ও শাস্তি দানেরও কোন ব্যবস্থা ছিল না। কোন ব্যক্তির কোন অধিকার বা মর্যাদা সুরক্ষিত ছিল না। কেউ অধিকার থেকে বঞ্চিত হলে তা ফিরিয়ে দেয়ারও কেউ ছিল না। এক এক গোত্রের অন্তভূক্ত লোকদের কোন সম্পর্ক বা যোগাযোগ ছিল না অপরাপর গোত্রের লোকদের সঙ্গে। মানুষ ছিল মরুভূমির উন্মুক্ত প্রান্তরের পশুকূলের মতো লাগামহীন। গোত্রের সর্বাধিক প্রবীন ব্যক্তি (যে অধিক ধন-সম্পদের মালিক ও সমধিক প্রভাবশালী)-কে গোত্রের সরদার বানানো হত। কোন গোত্রের লোকসংখ্যা বেশী হয়ে বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে গেলে এক একটি শাখা-গোত্র স্বাধীন ও স্বতন্ত্র গোত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করত। এভাবে গোত্র ব্যবস্থা সমগ্র আরবে বিস্তৃত ও সমপ্রসারিত হয়ে পড়েছিল। গোত্র ব্যবস্থায় কোন গোত্রের একজন লোক যদি অন্যায় করত অন্য গোত্রের কোন ব্যক্তির সাথে তাহলে তার গোত্রের সব লোক তাকে পূর্ণ সমর্থন দিত। প্রয়োজন হলে তার জন্য যুদ্ধও শুরু করে দিত।
তখন মক্কা তথা গোটা আরবে প্রচলিত ছিল মূর্তি পূজার ধর্ম (দীন)। আমর ইবনে লুহাই নামের খুজারী বংশের এক ব্যক্তি সিরিয়া থেকে এই মূর্তি পূজার পদ্ধতি কাবাগৃহে এনে স্থাপন করেছিল। ভাগ্য গণনার জন্য বা কাজের ভালো-মন্দ ফল জানবার জন্য তারা তীর ব্যবহার করত এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করত। লাত, মানাত, হুবল, ওজ্জা প্রভূতি ছিল কুরাইশ বংশের সেরা মূর্তি। তারা এসব মূর্তির সন্তুষ্টির জন্য সেগুলোর সামনে পশু বলি দিত। লেখাপড়াও জ্ঞান চর্চার কোন সুষ্ঠু ব্যবস্থা ছিল না। তা সত্ত্বেও কিছু কিছু লোক নিজস্ব চেষ্টা ও উদ্যোগে কিছু পরিমাণ লেখা-পড়ার যোগ্যতা অর্জন করে ছিল। ঐতিহাসিক দৃষ্টিতে বলা যায়, মক্কা ছিল একটি নগর, যেটি জীবন-ধারা, সামাজিকতা ও সভ্যতা-সংস্কৃতির দিক দিয়ে ছিল সম্পূর্ণ বাল্যাবস্থায়। খৃষ্টীয় পঞ্চম শতকে মক্কা যাযাবরত্ব (Nomadism) থেকে সভ্যতার দিকে অগ্রসর হতে শুরু করেছিল বলা যায়। তবে সেই সভ্যতা ছিল খুবই সীমাবদ্ধতায়। সংক্ষেপে বলতে গেলে বলা যায়- তদানীন্তন সমগ্র দুনিয়া, বিশেষ করে গোটা আরব উপদ্বীপ ছিল প্রগাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত। আর মক্কা নগরের অবস্থান ছিল সূচিভেদ্য অন্ধকারের নিম্নদেশে। অথচ এ নগরেই আল্লাহতায়ালা তাঁর সবশেষ নবী ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ছিলেন। কিন্তু কেন?