hadith book logo

রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামাজিক বিপ্লবের স্বরূপ

লেখকঃ সিরজুল ইসলাম আলী আকবর • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৮

বাস্তব পর্যায়ে ইসলাম

হিজরতের ফলে রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং মক্কা ও আশপাশের এলাকার মুসলমানদেরকে আপন বাড়ীঘর, জমি-জায়গা, ক্ষেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অনেককে স্ত্রী-পুত্র, পরিজন ত্যাগ করে সর্বহারা ফকিরের ন্যায় মদীনার মত এক ক্ষুদ্র পরিসর বসতিতে উপস্থিত হতে হয়। এখানে তাদের ছিলনা আহার, বাসস্থান ও আয় উপার্জনের কোন নিজস্ব ব্যবস্থা। মদীনার বাসিন্দা মুসলিমগণ মুহাজির মুসলিমদের উদারভাবে গ্রহণ করলেন। তাদের যাবতীয় প্রয়োজন পূরণের ব্যবস্থা করে দিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় উপস্থিত হয়ে পর পর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের আঞ্জাম দিলেন।

প্রথমত: তিনি মসজিদ নির্মাণের ব্যবস্থা করলেন। কেননা এই মসজিদই হচ্ছে ইসলামী সমাজের মিলন কেন্দ্র, ইসলামী সমাজ বিপ্লবের বাস্তব ভিত্তি।

দ্বিতীয়ত: তিনি মুহাজির ও মদীনার মুসলিম আনসারদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করলেন। এই ভ্রাতৃত্বই হল ইসলামী সমাজ ও জাতি গঠনের প্রথম ভিত্তি প্রস্তর। এই ভ্রাতৃত্ব বংশ, বর্ণ, ভাষা, গোত্র ও সন্তানের ভিত্তিতে রচিত হয়নি। কালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর প্রতি ঈমানের সূত্রে গ্রথিত করেই এই নতুন আদর্শবাদী জাতীয়তা রচিত হল। তাতে সুহাইব রুমী, বিলাল হাবশী ও সালমান ফারসী মক্কার কুরাইশ, আশেপাশের ঈমানদার এবং মদীনার আওস ও খাজরাজের লোকেরা সমাজ মর্যাদা ও অভিন্ন অধিকার লাভ করলেন। এক আল্লাহর প্রতি ঈমান ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নেতৃত্ব অনুসরণে বিভিন্ন গোত্র, বংশ, দেশ, বর্ণ ও ভাষার লোকেরা একাকার হয়ে গেল। নাযিল হল আল্লাহর ঘোষণাঃ

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا ارْكَعُوا وَاسْجُدُوا وَاعْبُدُوا رَبَّكُمْ وَافْعَلُوا الْخَيْرَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ ۩ ﴿77﴾ وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ وَاعْتَصِمُوا بِاللَّهِ هُوَ مَوْلَاكُمْ فَنِعْمَ الْمَوْلَى وَنِعْمَ النَّصِيرُ ﴿78﴾ ( سورة الحج )

হে মুমিনগণ, তোমরা রুকু কর, সিজদা কর, তোমাদের রবের ইবাদত কর এবং ভাল কাজ কর, আশা করা যায় তোমরা সফল হতে পারবে। আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ কর যেভাবে জিহাদ করা উচিৎ। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। দীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের কঠোরতা আরোপ করেননি এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দীন। তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলিম পূর্বে এবং এ কিতাবেও। যাতে রাসূল তোমাদের জন্য স্বাক্ষী হয় আর তোমরা মানুষের জন্য স্বাক্ষী হও। (সূরা হজ্জঃ ৭৭-৭৮)

হিজরতের অব্যবহিত পরে নাযিল হওয়া কুরআন মজীদের এই আয়াতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া জনগণকে মুসলিম ও ইবরাহীমী মিল্লাত অর্থাৎ তাওহীদের অনুসারী জনগোষ্ঠী পরিচিতিতে অভিহিত করা হয়েছে। এভাবে পুরোনো সমাজের ধ্বংসাবশেষের উপর গড়ে উঠল এক নতুন সমাজ, পুরোনো সমাজ ছিল আদর্শহীন, চরিত্রহীন ও নেতৃত্বহীন। নতুন সমাজ তাওহীদী আদর্শের ভিত্তিতে ও সমাজের অবিসংবাদিত নেতা হচ্ছেন আল্লাহর শেষ ও শ্রেষ্ঠ নবী রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। পুরনো সমাজের চূড়ান্ত বিলুপ্তি ও সে সমাজ নেতৃত্বের চির অবসান এখন শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৃতীয় যে কাজটি করেন, ঐতিহাসিকগণ মদীনা সনদ নামে তার উল্লেখ করেছেন, তাতে মুহাজির ও আনসারদের সাথে সাথে মদীনার প্রাচীন ও অত্যন্ত প্রভাবশালী ইহুদীদের নাগরিক মর্যাদা, নাগরিক অধিকার ও দায়-দায়িত্ব এবং পারস্পরিক সম্পর্ক সুস্পষ্ট ভাষায় লিপিবদ্ধ করা হয়। এর মাধ্যমে মদীনার সমাজে মুসলিম প্রাধান্য ও হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিরংকুশ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মদীনার প্রাচীন অধিবাসী আওস, খাজরাজ ও ইহুদী জনগণ আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে নিজেদের বাদশাহ বানাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলমানদের মদীনায় উপনীত হওয়ার পূর্বে তাকে বাদশাহ রূপে বরণ করার জন্য মুকুটও তৈরী হয়েছিল। কিন্তু ইতিমধ্যে হঠাৎ করে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক মুসলিমের সমাবেশ হওয়ায়, সর্বোপরি মদীনার লোকদের দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করায় তাদের সে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত একেবারে বানচাল হয়ে যায়। এর পরিবর্তে সেখানে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজ গড়ে উঠে, আর তাতে ইহুদীরা সংখ্যালঘু অমুসলিম নাগরিকের অধিকার পেয়ে বসবাস করতে বাধ্য হয়। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কায়েম করা এ সমাজে সার্বভৌমত্ব কার্যকর ছিল একমাত্র আল্লাহর, নেতৃত্ব ছিল রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর। সেখানে সব নাগরিক ছিলেন আল্লাহর কুরআন ও রাসূলের সুন্নাতের অনুসারী। তাঁরা ছিলেন খালেসভাবে একমাত্র আল্লাহর বান্দা। আর এই-ই হচ্ছে প্রকৃত ইসলামী সমাজের বাস্তব রূপ।