১
ইসলাম একমাত্র পরিপূর্ণ দীন
লেখকঃ মুহাম্মাদ আল-আমীন ইবন মুহাম্মাদ আল-মুখতার আশ্-শানকীতী • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ৪
প্রথম মাসআলা: আল্লাহর তাওহীদ প্রসঙ্গে
কুরআনের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যায় যে, তাওহীদ তথা একত্ববাদের তিনটি অংশ রয়েছে:
প্রথম প্রকার: রুবুবিয়াত (সৃষ্টি, সার্বভৌম প্রভুত্ব ও পরিচালন)-এর ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ:
তাওহীদের এই অংশের ওপর জ্ঞানবানদের স্বভাব-প্রকৃতি প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُ﴾ الآية [ سُورَةُ الزخرف : 87]
“যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮৭]
তিনি আরও বলেন,
﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ ٣١﴾ [ سُورَةُ يونس : 31]
“বল, কে তোমাদেরকে আকাশ ও পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করে এবং মৃততে জীবিত থেকে কে বের করে এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। বল, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩১] আর অনুরূপ আরও অনেক আয়াত রয়েছে।
আর এই প্রকার তাওহীদকে ফির‘আউন অহঙ্কার ও গোঁড়ামিবশত অস্বীকার করেছে। যেমন, তার কথায়:
﴿قَالَ فِرۡعَوۡنُ وَمَا رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢٣﴾ [ سُورَةُ الشعراء : 23]
“ফির‘আউন বলল, সৃষ্টিজগতের রব আবার কী?” [সূরা আশ-শু‘আরা, আয়াত: ২৩] তার অস্বীকার করা যে অহঙ্কারবশত ও ইচ্ছাকৃত, তার প্রমাণে আল্লাহ তা‘আলা অন্য আয়াতে বলেন,
﴿قَالَ لَقَدۡ عَلِمۡتَ مَآ أَنزَلَ هَٰٓؤُلَآءِ إِلَّا رَبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ بَصَآئِرَ ﴾ الآية [ سُورَةُ الإسراء : 102]
“মূসা বলেছিল, তুমি অবশ্যই অবগত আছ যে, এসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রব-ই অবতীর্ণ করেছেন প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১০২]
তিনি আরও বলেন,
﴿وَجَحَدُواْ بِهَا وَٱسۡتَيۡقَنَتۡهَآ أَنفُسُهُمۡ ظُلۡمٗا وَعُلُوّٗاۚ﴾ [ سُورَةُ النمل : 14]
“তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ১৪]
আর এই কারণে তাওহীদের এই প্রকারকে প্রমাণ করার জন্য সাব্যস্তকরণসূচক প্রশ্নবোধক ( استفهام التقرير ) শব্দ দ্বারা আল-কুরআন অবতীর্ণ হতো, যেমন তাঁর বাণী:
﴿أَفِي ٱللَّهِ شَكّٞ فَاطِرِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ ۚ﴾ [ سُورَةُ إبراهيم : 10]
“আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোনো সন্দেহ আছে, যিনি আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা?” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১০]
তিনি আরও বলেন,
﴿قُلۡ أَغَيۡرَ ٱللَّهِ أَبۡغِي رَبّٗا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيۡءٖۚ﴾ [ سُورَةُ الأنعام : 164]
“বল, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য রবকে খুঁজব? অথচ তিনিই সবকিছুর রব।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৬৪]
তিনি আরও বলেন,
﴿قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ قُلِ ٱللَّهُ﴾ [ سُورَةُ الرعد : 16]
“বল, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রব? বল, আল্লাহ।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৬) এবং অনুরূপ আর আয়াত। কারণ, তারা এর স্বীকৃতি প্রদান করে।
আর এই প্রকারের তাওহীদে বিশ্বাস কাফির সম্প্রদায়ের কোনো উপকার করে নি। কারণ, তারা ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে নি। যেমন, তিনি বলেছেন:
﴿وَمَا يُؤۡمِنُ أَكۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ ١٠٦﴾ [ سُورَةُ يوسف : 106]
“তাদের অধিকাংশ আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু তারা তাঁর সাথে শরীক করে।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০৬] তিনি আরও বলেছেন:
﴿مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ﴾ [ سُورَةُ الزمر : 3]
“আমরা তো তাদের ইবাদত-আনুগত্য এজন্যই করি যে, তারা আমাদেরকে সুপারিশ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩]
তিনি আরও বলেছেন:
﴿وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ قُلۡ أَتُنَبُِّٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِ﴾ [ سُورَةُ يونس : 18]
“তারা বলে, এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিবে, যা তিনি জানেন না?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]
দ্বিতীয় প্রকার: ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ:
এটা এমন একটি বিষয়, যাকে কেন্দ্র করেই রাসূলগণ ও বিভিন্ন জাতির মধ্যে সকল যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। আর এটা এমন একটি ব্যাপার, যা বাস্তবায়ন করার জন্যই নবী ও রাসূলদের প্রেরণ করা হয়েছে। আর তার মূলকথা হলো: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’-এর অর্থ। সুতরাং তা দু’টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত: নীতি দু’টি হলো (আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই) এর মধ্যকার নেতিবাচক দিক এবং ইতিবাচক দিক।
বাক্যটির নেতিবাচক অর্থ হলো: সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সকল প্রকার উপাস্যকে পরিহার বা প্রত্যাহার করে নেওয়া।
বাক্যটির ইতিবাচক অর্থ হলো: সকল প্রকার ইবাদত তাঁর বিধিবদ্ধ শর‘ঈ পদ্ধতিতে এককভাবে ও একমাত্র তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করা। আল-কুরআনের সিংহভাগ আয়াতই এই প্রকার তাওহীদ প্রসঙ্গে। যেমন,
﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [ سُورَةُ النحل : 36]
“আল্লাহর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমরা তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [ سُورَةُ الأنبياء : 25]
“আমরা তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসূল প্রেরণ করিনি তার প্রতি এই ওহী ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫]
﴿فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَا﴾ [ سُورَةُ البقرة : 256]
“সুতরাং যে তাগুতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, সে এমন এক মজবুত হাতল ধরবে, যা কখনও ভাঙ্গবে না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬]
﴿وَسَۡٔلۡ مَنۡ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رُّسُلِنَآ أَجَعَلۡنَا مِن دُونِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ءَالِهَةٗ يُعۡبَدُونَ ٤٥﴾ [ سُورَةُ الزخرف : 45]
“তোমার পূর্বে আমরা যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে তুমি জিজ্ঞাসা কর, আমরা কি দয়াময় আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য স্থির করেছিলাম, যার ইবাদত করা যায়?” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৪৫]
﴿قُلۡ إِنَّمَا يُوحَىٰٓ إِلَيَّ أَنَّمَآ إِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ فَهَلۡ أَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٨﴾ [ سُورَةُ الأنبياء : 108]
“বল আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একজন ইলাহ। সুতরাং তোমরা কি আত্মসমর্পণকারী হবে না?” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৮] আর এই প্রসঙ্গে আরও বহু আয়াত রয়েছে।
তৃতীয় প্রকার: নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ:
এ প্রকারের তাওহীদ দু’টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন:
প্রথমত: আল্লাহ তা‘আলাকে সৃষ্টির গুণাবলির সাথে তুলনা করা থেকে পবিত্র রাখা।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন, রূপকার্থে নয় বরং প্রকৃতার্থে আল্লাহ তা‘আলার পরিপূর্ণতা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা। আর এটা জানা কথা যে, আল্লাহ সম্পর্কে আল্লাহর চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই যে আল্লাহর গুণ বর্ণনা করতে পারে, আর আল্লাহর পরে আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে আল্লাহ্র রাসূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ নেই যে তাঁর গুণাবলি বর্ণনা করতে সক্ষম।
আর আল্লাহ তা‘আলা নিজের ব্যাপারে বলছেন:
﴿ءَأَنتُمۡ أَعۡلَمُ أَمِ ٱللَّهُ﴾ [ سُورَةُ البقرة : 140]
“তোমরা কি বেশি জানো, না আল্লাহ?” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪০]
আর তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন,
﴿وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤﴾ [ سُورَةُ النجم : 3-4]
“এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। এটা তো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪]
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণী দ্বারাই তাঁর অনুরূপ কোনো কিছু নেই বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,
﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞ﴾ [ سُورَة الشورى : 11]
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] আর তিনি তাঁর ইতিবাচক গুণাবলীসমূহ প্রকৃতার্থেই সাব্যস্ত করেছেন তাঁর ভাষায়:
﴿وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [ سُورَة الشورى : 11]
“..আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] সুতরাং আয়াতের প্রথমাংশ দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর গুণাবলি অকার্যকর বা অসার করার অবকাশ নেই।
তাই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক হলো কোনো প্রকার সাদৃশ্যস্থাপন ছাড়া প্রকৃত অর্থেই তাঁর গুণাবলী তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা এবং তাঁর গুণাবলি অকার্যকর না করে অন্য সব কিছুর সাথে তাঁর সাদৃশ্যতাকে অস্বীকার করা।
কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টি কর্তৃক তাঁকে জ্ঞানে বেষ্টন করার অক্ষমতার কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
﴿يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِۦ عِلۡمٗا ١١٠ ﴾ [ سُورَةُ طه : 110]
“তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না”। [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১০]
প্রথম প্রকার: রুবুবিয়াত (সৃষ্টি, সার্বভৌম প্রভুত্ব ও পরিচালন)-এর ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ:
তাওহীদের এই অংশের ওপর জ্ঞানবানদের স্বভাব-প্রকৃতি প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَلَئِن سَأَلۡتَهُم مَّنۡ خَلَقَهُمۡ لَيَقُولُنَّ ٱللَّهُ﴾ الآية [ سُورَةُ الزخرف : 87]
“যদি তুমি তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, কে তাদেরকে সৃষ্টি করেছে, তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৮৭]
তিনি আরও বলেন,
﴿قُلۡ مَن يَرۡزُقُكُم مِّنَ ٱلسَّمَآءِ وَٱلۡأَرۡضِ أَمَّن يَمۡلِكُ ٱلسَّمۡعَ وَٱلۡأَبۡصَٰرَ وَمَن يُخۡرِجُ ٱلۡحَيَّ مِنَ ٱلۡمَيِّتِ وَيُخۡرِجُ ٱلۡمَيِّتَ مِنَ ٱلۡحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ ٱلۡأَمۡرَۚ فَسَيَقُولُونَ ٱللَّهُۚ فَقُلۡ أَفَلَا تَتَّقُونَ ٣١﴾ [ سُورَةُ يونس : 31]
“বল, কে তোমাদেরকে আকাশ ও পৃথিবী থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করে অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করে এবং মৃততে জীবিত থেকে কে বের করে এবং সকল বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করে? তখন তারা বলবে, আল্লাহ। বল, তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ৩১] আর অনুরূপ আরও অনেক আয়াত রয়েছে।
আর এই প্রকার তাওহীদকে ফির‘আউন অহঙ্কার ও গোঁড়ামিবশত অস্বীকার করেছে। যেমন, তার কথায়:
﴿قَالَ فِرۡعَوۡنُ وَمَا رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ ٢٣﴾ [ سُورَةُ الشعراء : 23]
“ফির‘আউন বলল, সৃষ্টিজগতের রব আবার কী?” [সূরা আশ-শু‘আরা, আয়াত: ২৩] তার অস্বীকার করা যে অহঙ্কারবশত ও ইচ্ছাকৃত, তার প্রমাণে আল্লাহ তা‘আলা অন্য আয়াতে বলেন,
﴿قَالَ لَقَدۡ عَلِمۡتَ مَآ أَنزَلَ هَٰٓؤُلَآءِ إِلَّا رَبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ بَصَآئِرَ ﴾ الآية [ سُورَةُ الإسراء : 102]
“মূসা বলেছিল, তুমি অবশ্যই অবগত আছ যে, এসব স্পষ্ট নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রব-ই অবতীর্ণ করেছেন প্রত্যক্ষ প্রমাণস্বরূপ।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১০২]
তিনি আরও বলেন,
﴿وَجَحَدُواْ بِهَا وَٱسۡتَيۡقَنَتۡهَآ أَنفُسُهُمۡ ظُلۡمٗا وَعُلُوّٗاۚ﴾ [ سُورَةُ النمل : 14]
“তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে সত্য বলে গ্রহণ করেছিল।” [সূরা আন-নামল, আয়াত: ১৪]
আর এই কারণে তাওহীদের এই প্রকারকে প্রমাণ করার জন্য সাব্যস্তকরণসূচক প্রশ্নবোধক ( استفهام التقرير ) শব্দ দ্বারা আল-কুরআন অবতীর্ণ হতো, যেমন তাঁর বাণী:
﴿أَفِي ٱللَّهِ شَكّٞ فَاطِرِ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِۖ ۚ﴾ [ سُورَةُ إبراهيم : 10]
“আল্লাহ সম্বন্ধে কি কোনো সন্দেহ আছে, যিনি আকাশমণ্ডলী ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা?” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১০]
তিনি আরও বলেন,
﴿قُلۡ أَغَيۡرَ ٱللَّهِ أَبۡغِي رَبّٗا وَهُوَ رَبُّ كُلِّ شَيۡءٖۚ﴾ [ سُورَةُ الأنعام : 164]
“বল, আমি কি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য রবকে খুঁজব? অথচ তিনিই সবকিছুর রব।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ১৬৪]
তিনি আরও বলেন,
﴿قُلۡ مَن رَّبُّ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضِ قُلِ ٱللَّهُ﴾ [ سُورَةُ الرعد : 16]
“বল, কে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর রব? বল, আল্লাহ।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৬) এবং অনুরূপ আর আয়াত। কারণ, তারা এর স্বীকৃতি প্রদান করে।
আর এই প্রকারের তাওহীদে বিশ্বাস কাফির সম্প্রদায়ের কোনো উপকার করে নি। কারণ, তারা ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে গ্রহণ করে নি। যেমন, তিনি বলেছেন:
﴿وَمَا يُؤۡمِنُ أَكۡثَرُهُم بِٱللَّهِ إِلَّا وَهُم مُّشۡرِكُونَ ١٠٦﴾ [ سُورَةُ يوسف : 106]
“তাদের অধিকাংশ আল্লাহতে বিশ্বাস করে, কিন্তু তারা তাঁর সাথে শরীক করে।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০৬] তিনি আরও বলেছেন:
﴿مَا نَعۡبُدُهُمۡ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَآ إِلَى ٱللَّهِ زُلۡفَىٰٓ ﴾ [ سُورَةُ الزمر : 3]
“আমরা তো তাদের ইবাদত-আনুগত্য এজন্যই করি যে, তারা আমাদেরকে সুপারিশ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দিবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩]
তিনি আরও বলেছেন:
﴿وَيَقُولُونَ هَٰٓؤُلَآءِ شُفَعَٰٓؤُنَا عِندَ ٱللَّهِۚ قُلۡ أَتُنَبُِّٔونَ ٱللَّهَ بِمَا لَا يَعۡلَمُ فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَلَا فِي ٱلۡأَرۡضِ﴾ [ سُورَةُ يونس : 18]
“তারা বলে, এগুলো আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিবে, যা তিনি জানেন না?” [সূরা ইউনুস, আয়াত: ১৮]
দ্বিতীয় প্রকার: ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ:
এটা এমন একটি বিষয়, যাকে কেন্দ্র করেই রাসূলগণ ও বিভিন্ন জাতির মধ্যে সকল যুদ্ধবিগ্রহ সংঘটিত হয়েছে। আর এটা এমন একটি ব্যাপার, যা বাস্তবায়ন করার জন্যই নবী ও রাসূলদের প্রেরণ করা হয়েছে। আর তার মূলকথা হলো: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’-এর অর্থ। সুতরাং তা দু’টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত: নীতি দু’টি হলো (আল্লাহ ছাড়া কোনো হক ইলাহ নেই) এর মধ্যকার নেতিবাচক দিক এবং ইতিবাচক দিক।
বাক্যটির নেতিবাচক অর্থ হলো: সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত সকল প্রকার উপাস্যকে পরিহার বা প্রত্যাহার করে নেওয়া।
বাক্যটির ইতিবাচক অর্থ হলো: সকল প্রকার ইবাদত তাঁর বিধিবদ্ধ শর‘ঈ পদ্ধতিতে এককভাবে ও একমাত্র তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট করা। আল-কুরআনের সিংহভাগ আয়াতই এই প্রকার তাওহীদ প্রসঙ্গে। যেমন,
﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَۖ﴾ [ سُورَةُ النحل : 36]
“আল্লাহর ইবাদত করার ও তাগুতকে বর্জন করার নির্দেশ দেওয়ার জন্য আমরা তো প্রত্যেক জাতির মধ্যেই রাসূল পাঠিয়েছি।” [সূরা আন-নাহল, আয়াত: ৩৬]
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِيٓ إِلَيۡهِ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّآ أَنَا۠ فَٱعۡبُدُونِ ٢٥﴾ [ سُورَةُ الأنبياء : 25]
“আমরা তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসূল প্রেরণ করিনি তার প্রতি এই ওহী ব্যতীত যে, আমি ব্যতীত অন্য কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫]
﴿فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَا﴾ [ سُورَةُ البقرة : 256]
“সুতরাং যে তাগুতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে, সে এমন এক মজবুত হাতল ধরবে, যা কখনও ভাঙ্গবে না।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৬]
﴿وَسَۡٔلۡ مَنۡ أَرۡسَلۡنَا مِن قَبۡلِكَ مِن رُّسُلِنَآ أَجَعَلۡنَا مِن دُونِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ءَالِهَةٗ يُعۡبَدُونَ ٤٥﴾ [ سُورَةُ الزخرف : 45]
“তোমার পূর্বে আমরা যে সকল রাসূল প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে তুমি জিজ্ঞাসা কর, আমরা কি দয়াময় আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য স্থির করেছিলাম, যার ইবাদত করা যায়?” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৪৫]
﴿قُلۡ إِنَّمَا يُوحَىٰٓ إِلَيَّ أَنَّمَآ إِلَٰهُكُمۡ إِلَٰهٞ وَٰحِدٞۖ فَهَلۡ أَنتُم مُّسۡلِمُونَ ١٠٨﴾ [ سُورَةُ الأنبياء : 108]
“বল আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একজন ইলাহ। সুতরাং তোমরা কি আত্মসমর্পণকারী হবে না?” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ১০৮] আর এই প্রসঙ্গে আরও বহু আয়াত রয়েছে।
তৃতীয় প্রকার: নাম ও গুণাবলীর ক্ষেত্রে আল্লাহর তাওহীদ:
এ প্রকারের তাওহীদ দু’টি মূলনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন:
প্রথমত: আল্লাহ তা‘আলাকে সৃষ্টির গুণাবলির সাথে তুলনা করা থেকে পবিত্র রাখা।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে যেসব গুণে গুণান্বিত করেছেন, রূপকার্থে নয় বরং প্রকৃতার্থে আল্লাহ তা‘আলার পরিপূর্ণতা ও যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনা। আর এটা জানা কথা যে, আল্লাহ সম্পর্কে আল্লাহর চেয়ে জ্ঞানী কেউ নেই যে আল্লাহর গুণ বর্ণনা করতে পারে, আর আল্লাহর পরে আল্লাহর গুণাবলি সম্পর্কে আল্লাহ্র রাসূলের চেয়ে অধিক জ্ঞানী কেউ নেই যে তাঁর গুণাবলি বর্ণনা করতে সক্ষম।
আর আল্লাহ তা‘আলা নিজের ব্যাপারে বলছেন:
﴿ءَأَنتُمۡ أَعۡلَمُ أَمِ ٱللَّهُ﴾ [ سُورَةُ البقرة : 140]
“তোমরা কি বেশি জানো, না আল্লাহ?” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৪০]
আর তিনি তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন,
﴿وَمَا يَنطِقُ عَنِ ٱلۡهَوَىٰٓ ٣ إِنۡ هُوَ إِلَّا وَحۡيٞ يُوحَىٰ ٤﴾ [ سُورَةُ النجم : 3-4]
“এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। এটা তো ওহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়” [সূরা আন-নাজম, আয়াত: ৩-৪]
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণী দ্বারাই তাঁর অনুরূপ কোনো কিছু নেই বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন,
﴿لَيۡسَ كَمِثۡلِهِۦ شَيۡءٞ﴾ [ سُورَة الشورى : 11]
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] আর তিনি তাঁর ইতিবাচক গুণাবলীসমূহ প্রকৃতার্থেই সাব্যস্ত করেছেন তাঁর ভাষায়:
﴿وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلۡبَصِيرُ﴾ [ سُورَة الشورى : 11]
“..আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ১১] সুতরাং আয়াতের প্রথমাংশ দ্বারা প্রমাণিত যে, তাঁর গুণাবলি অকার্যকর বা অসার করার অবকাশ নেই।
তাই আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে, প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক হলো কোনো প্রকার সাদৃশ্যস্থাপন ছাড়া প্রকৃত অর্থেই তাঁর গুণাবলী তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা এবং তাঁর গুণাবলি অকার্যকর না করে অন্য সব কিছুর সাথে তাঁর সাদৃশ্যতাকে অস্বীকার করা।
কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টি কর্তৃক তাঁকে জ্ঞানে বেষ্টন করার অক্ষমতার কথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
﴿يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡ وَلَا يُحِيطُونَ بِهِۦ عِلۡمٗا ١١٠ ﴾ [ سُورَةُ طه : 110]
“তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না”। [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১০]