১
ইসলামে জিযয়াহ্র বিধান
লেখকঃ ড. মুনকিয বিন মাহমুদ আস-সাক্কার • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১
পরিচ্ছেদঃ ১০
পাঁচ. যিম্মিদের সাথে মুসলিমদের আচার ব্যবহারের কতিপয় নমুনা :
মুসলিমগণ যখন যিম্মিদের অধিকার আদায় ও তাদের সুরক্ষা দিতে পারে নি, তখন তারা তাদের জিযয়াহ্ ফিরৎ দিয়েছিল, কারণ তারা জিযয়াহ্র শর্ত পুরণে সক্ষম ছিল না, অর্থাৎ তাদের সুরক্ষা দেয়া। কাজি আবু ইউসুফ ‘কিতাবুল খারাজ’ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ মাকহুল থেকে বর্ণনা করেন, আবু উবাইদার নিকট বিশ্বস্ত সূত্রে সংবাদ আসে যে, রোমকরা তাদের বিপক্ষে অভিযান পরিচালনা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তিনি সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ জাতির নিকট রেখে যাওয়া প্রতিনিধিদের এ মর্মে ফরমান জারি করেন, জিযয়াহ্ ও খারাজ হিসেবে যে ট্যাক্স নেয়া হয়েছে, তা যেন ফেরৎ দেয়া হয়। তিনি তাদেরকে বলার নির্দেশ দেন : জিযয়াহ্ ফেরৎ দেয়ার কারণ এই যে, আমরা জানতে পেরেছি রোমকরা আমাদের জন্য বিরাট বাহিনী প্রস্তুত করেছে, যাদের প্রতিরোধ করে তোমাদের সুরক্ষা দেয়ার সামর্থ আমাদের নেই, যে সুরক্ষা দেয়ার দায়িত্ব আমরা নিয়েছিলাম, তাই তোমাদের সম্পদ তোমাদেরকে ফেরৎ দিলাম। তবে আল্লাহ যদি আমাদের বিজয় দান করেন, তাহলে আমাদের উভয়ের শর্ত পুনরায় কার্যকর হবে। [আল-খারাজ : (১৩৫) দেখুন : ফুতুহুল বুলদান লিল বালাযুরি ও ফুতুহুশ শাম লিল আযরি।]’
আবার যিম্মিরা যখন দেশ রক্ষায় মুসলিমদের অংশিদার হয়েছিল, তখন মুসলিমরা তাদের থেকে জিযয়াহ্ মওকুফ করে দিয়েছিল। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক লোরেন স্বীয় কিতাব "Armenia between Byzantium and Islam" এ উল্লেখ করেন : আর্মেনিয়রা বাইজেনটিয়ামদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মুসলিমদের সুন্দরভাবে স্বাগতম জানিয়েছে এবং খাযারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। আরবরা তাদের যে সম্পদ হস্তগত করেছিল এবং যার উপর দিয়ে তারা বিজয়ী বেশে হেঁটে গিয়েছিল, তা সব তাদের মালিকানায় পূর্ববৎ রেখে দিয়েছিল। থিয়োডর রখতুনি এবং তার সকল অনুসারীদের ৬৫৩ ইং সনে মু‘আবিয়া এ অঙ্গীকার প্রদান করেন, যে পর্যন্ত তারা এ সন্ধিতে থাকতে ইচ্ছুক। এ সন্ধিতে আরও ছিল : ‘তিন বছর তাদের থেকে কোন জিযয়াহ্ নেয়া হবে না, অতঃপর তারা চুক্তি অনুসারে জিযয়াহ্ প্রদান করবে এবং জিযয়াহ্র পরিবর্তে প্রয়োজন সাপেক্ষে তারা পনের হাজার অশ্বারোহী সৈন্য দ্বারা সাহায্য করবে। আর খলিফা আর্মেনীয়দের গোত্র প্রধানের নিকট কোন আমির, সেনা প্রধান, অশ্বারোহী ও কাজি প্রেরণ করবে না। রোমকরা যখন তাদের উপর চড়াও হবে, তখন তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। মুআবিয়া এ চুক্তির উপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখেন। [ফুতুহুল বুলদান : (২১০-২১১)]’
যিম্মিদেরকে শুধু শত্রুদের থেকে রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়, বরং কষ্টদায়ক সব কিছু থেকেই তাদের সুরক্ষা দিতে হবে, যদিও তা হয় একটি কথা। কারাফি বলেন : ‘যিম্মা চুক্তি আমাদের উপর তাদের কিছু দায়িত্ব অর্পণ করে, কারণ তারা আমাদের হিফাযত ও সুরক্ষায় বিদ্যমান। এ যিম্মা আমাদের, আল্লাহর এবং রাসূল ও ইসলামের যিম্মা। কোন বাক্য অথবা গিবত করে যারা তাদের উপর যুলম করল তারা আল্লাহর যিম্মা, রাসূলের যিম্মা ও দীন ইসলামের যিম্মা বিনষ্ট করল। [আল-ফুরুক : (৩/১৪)]’
এখানেই শেষ নয়, বরং মুসলিমরা জিযয়াহ্র বিনিময়ে গরিব যিম্মিদের দান-সদকা দিয়ে যিম্মা চুক্তির হিফাযত করেছে। ইবন যানজুইয়া নিজ সনদে বর্ণনা করেন, ওমর ইবন খাত্তাব রা. এক যিম্মিকে দেখেন ভিক্ষা করছে, তিনি বলেন : তোমার থেকে জিযয়াহ্ গ্রহণ করে আমরা যদি তোমার বার্ধক্য খেয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে তোমার উপর ইনসাফ হল না। অতঃপর ওমর রা. তার গভর্নরদের নিকট বৃদ্ধদের জিযয়াহ্ মওকুফ করা মর্মে পত্র লিখেন। [আল-আমওয়াল : (১/১৬৩)]’ তিনি আরো নির্দেশ দেন : ‘যার জন্য জিযয়াহ্ কষ্টকর, তার উপর তোমরা শিথিল কর, আর যে অক্ষম তাকে তোমরা সাহায্য কর। [তারিখু মদিনাতি দিমাশক : (১/১৭৮)]’
খলিফা ওমর ইবন আব্দুল আযিয বসরায় তার গভর্নর আদি ইবন আরতার নিকট এ মর্মে পত্র লিখেন : ‘তুমি তোমার পাশের যিম্মিদের লক্ষ্য কর, কার বয়স বেড়ে গেছে, শক্তি কমে গেছে ও কার উপার্জন হ্রাস পেয়েছে, তার জন্য প্রয়োজন মোতাবিক বায়তুল মাল থেকে ভাতা নির্ধারণ কর। [আল-আমওয়াল : (১/১৭০)]’
তবে কোন যিম্মি যদি সামর্থ্য সত্বেও জিযয়াহ্ আদায় না করে, তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে, কিন্তু তার যিম্মা চুক্তি বাতিল করা হবে না। ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন : ‘সামর্থ সত্বেও যদি যিম্মিরা জিযয়াহ্ আদায় না করে, তাহলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া বৈধ, তবে যার অপারগতা প্রমাণ হবে, তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না, কারণ অপারগ ব্যক্তির উপর জিযয়াহ্ মওকুফ, আর ধনীদেরকে বলা হবে না তোমরা গরিবদের জিযয়াহ্ প্রদান কর। [আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (৮/৭৩-৭৪)]’
ইসলামি আইনজ্ঞরা জিযয়াহ্ ও জিযয়াহ্ বিষয়ে বাড়াবাড়িকে খুব গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন, তারা বলেছেন শুধু জিযয়াহ্ প্রদান থেকে বিরত থাকার কারণে যিম্মা চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে না। আল্লামা কাসানি হানাফি বলেন : ‘যিম্মা চুক্তি আমাদের উপর অবশ্য কর্তব্য, কোন অবস্থাতেই আমরা তা ভঙ্গ করতে পারি না, তবে তাদের ব্যাপারে এ চুক্তি জরুরী নয়। [বাদায়েউস সানায়ে : (৭/১১২)]’
আবার যিম্মিরা যখন দেশ রক্ষায় মুসলিমদের অংশিদার হয়েছিল, তখন মুসলিমরা তাদের থেকে জিযয়াহ্ মওকুফ করে দিয়েছিল। ফ্রান্সের ঐতিহাসিক লোরেন স্বীয় কিতাব "Armenia between Byzantium and Islam" এ উল্লেখ করেন : আর্মেনিয়রা বাইজেনটিয়ামদের দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য মুসলিমদের সুন্দরভাবে স্বাগতম জানিয়েছে এবং খাযারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছে। আরবরা তাদের যে সম্পদ হস্তগত করেছিল এবং যার উপর দিয়ে তারা বিজয়ী বেশে হেঁটে গিয়েছিল, তা সব তাদের মালিকানায় পূর্ববৎ রেখে দিয়েছিল। থিয়োডর রখতুনি এবং তার সকল অনুসারীদের ৬৫৩ ইং সনে মু‘আবিয়া এ অঙ্গীকার প্রদান করেন, যে পর্যন্ত তারা এ সন্ধিতে থাকতে ইচ্ছুক। এ সন্ধিতে আরও ছিল : ‘তিন বছর তাদের থেকে কোন জিযয়াহ্ নেয়া হবে না, অতঃপর তারা চুক্তি অনুসারে জিযয়াহ্ প্রদান করবে এবং জিযয়াহ্র পরিবর্তে প্রয়োজন সাপেক্ষে তারা পনের হাজার অশ্বারোহী সৈন্য দ্বারা সাহায্য করবে। আর খলিফা আর্মেনীয়দের গোত্র প্রধানের নিকট কোন আমির, সেনা প্রধান, অশ্বারোহী ও কাজি প্রেরণ করবে না। রোমকরা যখন তাদের উপর চড়াও হবে, তখন তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। মুআবিয়া এ চুক্তির উপর আল্লাহকে সাক্ষী রাখেন। [ফুতুহুল বুলদান : (২১০-২১১)]’
যিম্মিদেরকে শুধু শত্রুদের থেকে রক্ষা করাই যথেষ্ট নয়, বরং কষ্টদায়ক সব কিছু থেকেই তাদের সুরক্ষা দিতে হবে, যদিও তা হয় একটি কথা। কারাফি বলেন : ‘যিম্মা চুক্তি আমাদের উপর তাদের কিছু দায়িত্ব অর্পণ করে, কারণ তারা আমাদের হিফাযত ও সুরক্ষায় বিদ্যমান। এ যিম্মা আমাদের, আল্লাহর এবং রাসূল ও ইসলামের যিম্মা। কোন বাক্য অথবা গিবত করে যারা তাদের উপর যুলম করল তারা আল্লাহর যিম্মা, রাসূলের যিম্মা ও দীন ইসলামের যিম্মা বিনষ্ট করল। [আল-ফুরুক : (৩/১৪)]’
এখানেই শেষ নয়, বরং মুসলিমরা জিযয়াহ্র বিনিময়ে গরিব যিম্মিদের দান-সদকা দিয়ে যিম্মা চুক্তির হিফাযত করেছে। ইবন যানজুইয়া নিজ সনদে বর্ণনা করেন, ওমর ইবন খাত্তাব রা. এক যিম্মিকে দেখেন ভিক্ষা করছে, তিনি বলেন : তোমার থেকে জিযয়াহ্ গ্রহণ করে আমরা যদি তোমার বার্ধক্য খেয়ে ফেলি, তাহলে আমাদের পক্ষ থেকে তোমার উপর ইনসাফ হল না। অতঃপর ওমর রা. তার গভর্নরদের নিকট বৃদ্ধদের জিযয়াহ্ মওকুফ করা মর্মে পত্র লিখেন। [আল-আমওয়াল : (১/১৬৩)]’ তিনি আরো নির্দেশ দেন : ‘যার জন্য জিযয়াহ্ কষ্টকর, তার উপর তোমরা শিথিল কর, আর যে অক্ষম তাকে তোমরা সাহায্য কর। [তারিখু মদিনাতি দিমাশক : (১/১৭৮)]’
খলিফা ওমর ইবন আব্দুল আযিয বসরায় তার গভর্নর আদি ইবন আরতার নিকট এ মর্মে পত্র লিখেন : ‘তুমি তোমার পাশের যিম্মিদের লক্ষ্য কর, কার বয়স বেড়ে গেছে, শক্তি কমে গেছে ও কার উপার্জন হ্রাস পেয়েছে, তার জন্য প্রয়োজন মোতাবিক বায়তুল মাল থেকে ভাতা নির্ধারণ কর। [আল-আমওয়াল : (১/১৭০)]’
তবে কোন যিম্মি যদি সামর্থ্য সত্বেও জিযয়াহ্ আদায় না করে, তাকে শাস্তি প্রদান করা হবে, কিন্তু তার যিম্মা চুক্তি বাতিল করা হবে না। ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন : ‘সামর্থ সত্বেও যদি যিম্মিরা জিযয়াহ্ আদায় না করে, তাহলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া বৈধ, তবে যার অপারগতা প্রমাণ হবে, তাকে শাস্তি দেয়া যাবে না, কারণ অপারগ ব্যক্তির উপর জিযয়াহ্ মওকুফ, আর ধনীদেরকে বলা হবে না তোমরা গরিবদের জিযয়াহ্ প্রদান কর। [আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (৮/৭৩-৭৪)]’
ইসলামি আইনজ্ঞরা জিযয়াহ্ ও জিযয়াহ্ বিষয়ে বাড়াবাড়িকে খুব গুরুত্বসহকারে নিয়েছেন, তারা বলেছেন শুধু জিযয়াহ্ প্রদান থেকে বিরত থাকার কারণে যিম্মা চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে না। আল্লামা কাসানি হানাফি বলেন : ‘যিম্মা চুক্তি আমাদের উপর অবশ্য কর্তব্য, কোন অবস্থাতেই আমরা তা ভঙ্গ করতে পারি না, তবে তাদের ব্যাপারে এ চুক্তি জরুরী নয়। [বাদায়েউস সানায়ে : (৭/১১২)]’