hadith book logo

ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান

লেখকঃ ড. মুনকিয বিন মাহমুদ আস-সাক্কার • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৪

দ্বিতীয়ত : ইসলাম পূর্বে জিযয়াহ্‌ :

পৃথিবীর বুকে ইসলাম যেমন নতুন নয়, তেমনি মুসলিমগণ তাদের অধীনদের উপর জিযয়াহ্‌ নতুন করে আরোপ করেন নি, বরং আদিকাল থেকেই বিজয়ী জাতি পরাজিত জাতির উপর জিযয়াহ্‌ আরোপ করে আসছে, মানব ইতিহাস তার সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

নিউটেস্টামেন্টে (বাইবেল) জিযয়াহ্‌ প্রথার প্রচলন :

মাসিহ সিমোনকে বলেন : ‘হে সিমোন! বাদশাহ যাদের কাছ থেকে কর বা জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করে, তারা কি বাদশাহর প্রজাভুক্ত, না পরদেশি? পিটার্‌স তাকে বললেন : তারা পরদেশি। যিশু তাকে বললেন: তবে তাদের সন্তানেরা স্বাধীন।’ [মথি ১৭ : ২৪-২৫]

নবীগণ যখন আল্লাহর ইচ্ছা ও তার সাহায্যে কোন দেশের উপর বিজয় লাভ করেছেন, তখন তারা পরাজিত জাতির উপর জিযয়াহ্‌ আরোপ করেছেন, এমনকি তাদেরকে দাসে পরিণত করেছেন, যেমন নবী যশোয়া বিজয় লাভ করে কিনআনীদের দাসে পরিণত করেছেন: ‘(ফিলিস্তিনের) ‘গেজের’-নিবাসী কিনআনীদেরকে তারা তাড়িয়ে দেন নি, বরং তারা আজ পর্যন্ত ‘এফ্রাইম’ -এর মধ্যে বসবাস করছে, তারা জিযয়াহ্‌ প্রদান করে দাসত্ব মেনে নিয়েছিল। [যশোয়া ১৬ : ১০] নবী যশোয়া তাদের উপর দাসত্ব এবং জিযয়াহ্‌ উভয় আরোপ করেন।

খ্রিষ্টধর্ম ইহুদি ধর্মে কোন পরিবর্তন আনে নি, বরং ইহুদি-ধর্মের পূর্ণতা দান করার জন্য ঈসা আলাইহিস সালাম আগমন করেছেন। [দেখুন, মথি ৫ : ১৭] তাই আমরা বলতে পারি, ইহুদি-ধর্মে প্রচলিত জিযয়াহ্‌ প্রথা খ্রিষ্টধর্মেও বিদ্যমান ছিল। অধিকন্তু মাসিহ তার অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছেন, যেন তারা রোমানদের জিযয়াহ্‌ প্রদান করে, তিনি নিজে তা সবার আগে প্রদান করেছেন। যেমন তিনি সিমোনকে বলেছেন : ‘তুমি সমুদ্রে গিয়ে বড়শি ফেল এবং প্রথম যে মাছটি ধরা পড়ে তা হাতে নাও, মাছটির মুখ খুলে তুমি তার মধ্যে মুদ্রা পাবে, তা নিয়ে তুমি আমার ও তোমার পক্ষ থেকে তাদেরকে (রোমান) প্রদান কর।’ [মথি ১৭ : ২৪-২৭]

ইহুদিরা যখন (বাইবেলের ভাষ্যমতে) জিযয়াহ্‌ প্রদানের ব্যাপারে তার (মাসিহের) অভিমত জানতে চায়, তখন তিনি জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করা সিজারের অধিকার স্বীকার করেন। তার কাছে তাদের ছাত্রদের হেরোদের সাথে এ মর্মে প্রেরণ করে : ‘হে শিক্ষক, আমরা জানি আপনি সত্যবাদী, আর আপনি আল্লাহর দীন সম্পর্কে সত্য-শিক্ষা দেন, আপনি কারো পরোয়া করেন না, কারণ আপনি মানুষের চেহারার দিকে তাকান না। আপনি আমাদেরকে বলুন আপনার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে, সিজারকে জিযয়াহ্‌ প্রদান করা বৈধ কি না? … তিনি বললেন : এ-প্রতিকৃতি ও এ-লেখা কার? তারা বলল : সিজারের। তিনি বললেন : যা সিজারের, তা সিজারকে প্রদান কর, আর যা আল্লাহর, তা আল্লাহকে প্রদান কর।’ [মথি ২২ : ১৬-২১]

রোমানদের পক্ষ থেকে যারা জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করত, তাদের সাথে উঠাবসা করা ও তাদেরকে ভালবাসা মাসিহ কোনরূপ দোষণীয় মনে করেন নি। [মথি ১১ : ১৯] এমনকি তিনি কর-আদায়কারী মথিকে তার বার শিষ্যের একজন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। [মথি ৯ : ৯]

নিউ-টেস্টামেন্টের মতে বাদশাহদেরকে জিযয়াহ্‌ প্রদান করা একটি বৈধ অধিকার; বরং এটাকে পবিত্র এবং ধর্মীয় কাজ মনে করা হয়েছে। যেমন পল বলেন : ‘প্রত্যেকের উচিত বাদশাহর অধীনতা মেনে নেওয়া, ... কারণ বাদশাহি ও ক্ষমতা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রদত্ত। যে কেউ এ-বিধানকে অস্বীকার করে, সে আল্লাহ্‌ যা নিয়োগ করেছেন তার বিরোধিতা করে। আর যারা তেমন বিরোধিতা করে, তারা নিজেদের উপর শাস্তি অবধারিত করে। ... কারণ, সে আল্লাহর প্রতিনিধি; যে খারাপ কর্ম করে, তার থেকে ক্রোধের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। সুতরাং তার অধীনতা মেনে নেয়া আবশ্যক, শুধু ক্রোধের ভয়ে নয়, বরং সদ্বিবেকের খাতিরেই তার অধীনতা মেনে নেয়া আবশ্যক। এ জন্য তোমরা তাকে জিযয়াহ্ও প্রদান করে থাক, কারণ তারা আল্লাহর নিযুক্ত সেবক, তাদের উপর প্রদত্ত কাজই তারা করে যায়। অতএব যার যা প্রাপ্য, তা তাকে দাও; যাকে জিযয়াহ্‌ দিতে হয়, তাকে জিযয়াহ্‌ প্রদান কর; যাকে কর দিতে হয়, তাকে কর প্রদান কর; যাকে ভয় করা উচিত তাকে ভয় কর; যাকে সম্মান করতে হয়, তাকে সম্মান কর।’ [রোমীয় ১৩ : ১-৭]