hadith book logo

ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান

লেখকঃ ড. মুনকিয বিন মাহমুদ আস-সাক্কার • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৯

চার. যিম্মিদের নিরাপত্তা বিধান ও তাদের অধিকার সুরক্ষা সম্পর্কে মুসলিম আলেমদের বাণী :

আমরা পূর্বে দেখেছি ইসলাম যিম্মিদের অধিকার এবং তাদের ধর্ম ও উপাসনালয়ের অধিকার স্বীকার করে। قوانين الأحكام الشرعية গ্রন্থে রয়েছে : দ্বিতীয় মাসআলা : আমাদের কর্তব্য যাযিরাতুল আরব তথা হিজাজ ও ইয়ামান ব্যতীত আমাদের দেশের অন্যান্য স্থানে তাদেরকে বসবাস করার সুযোগ প্রদান করা, আমরা তাদের পিছু নেব না এবং চুক্তি মোতাবিক তাদের জান ও মালের সুরক্ষা দেব, আমরা তাদের গীর্জা, মদ ও শূকরের ব্যাপারে বাধা দেব না, যদি তারা প্রকাশ্যে না করে। [কাওয়ানীনুল আহকামিশ শারঈয়্যাহ : (১৭৬)]’

যিম্মিরা মদ পান, শূকর ভক্ষণ ও তাদের ধর্মে হালাল বস্তুর ব্যাপারে স্বাধীনতা ভোগ করবে, এ সম্পর্কে ইমাম তাহাবি রহ. ইজমা ও মুসলিমদের ঐক্য নকল করেছেন। তিনি বলেন : ‘তারা এ ব্যাপারে একমত যে, মুসলিম আমির যিম্মিদেরকে মদ পান, শূকর ভক্ষণ এবং যেসব ঘর-বাড়ির ব্যাপারে তারা চুক্তি বদ্ধ হয়েছে, সে ব্যাপারে তাদেরকে নিষেধ করতে পারবে না, যদি সেখানে মুসলিম বসবাস না করে। (অর্থাৎ যে শহরে যিম্মিরাই আধিক।) [ইখতিলাফুল ফুকাহা : (২৩৩)]’

ইসলামি শরিআত যিম্মির জান ও মাল সংরক্ষণ করেছে এবং তাকে হত্যাকারীর উপর কিসাসের বিধান রেখেছে। আলি রা. এর খেলাফতকালে এক ব্যক্তিকে যিম্মি হত্যার দায়ে পাকড়াও করা হয়, তিনি তার উপর কিসাসের বিধান জারি করেন। মৃত ব্যক্তির ভাই এসে কিসাসের পরিবর্তে দিয়াত (রক্তপণ) গ্রহণ করতে সম্মত হয়। আলি রা. তাকে বলেন : খুব সম্ভব তারা তোমাকে বয়কট করেছে, অথবা শাসিয়েছে, অথবা ধমক দিয়েছে ? সে বলল : না, বরং আমি নিজেই দিয়াত গ্রহণ করতে সম্মত হয়েছি, কারণ আমি জানি এ ব্যক্তিকে হত্যা করলে আমার ভাই ফিরে আসবে না, আলি রা. হত্যাকারীকে ছেড়ে দেন এবং বলেন : তুমি ভাল করেই জান, যে ব্যক্তি আমাদের যিম্মায় থাকে, তার রক্ত আমাদের রক্তের ন্যায় এবং তার দিয়াত আমাদের দিয়াতের ন্যায়। [মুসনাদুশ শাফে‘য়ী : (১/৩৪৪)]’

ইসলামি শরিআত যিম্মি ও মুসলিমের সম্পদে কোন পার্থক্য করেনি, তার দিকে প্রসারিত হাত ইসলাম কর্তন করে দেয়, যদিও সে হাতটি হয় কোন মুসলিমের। বিশিষ্ট তাফসিরকারক কুরতুবি রহ. বলেন : ‘যিম্মির রক্ত সবসময় হারাম ও নিরাপদ, মুসলিমের রক্তও অনুরূপ। তারা উভয়ে দারুল ইসলামের অধিবাসী। তাই যিম্মির সম্পদ চুরি করার ফলে মুসলিমের হাত কর্তন করা হবে। এর মাধ্যমেই প্রমাণ হয় যে, যিম্মির সম্পদ মুসলিমের সম্পদের ন্যায়, উভয়ের রক্তও সমান, সম্পদের এ সম্মান মালিক সম্মানিত বলেই। [আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (২/২৪৬)]’

ইমাম মাওয়ারদি রহ. বলেন : ‘ইমামের কর্তব্য তাদের দুইটি অধিকার সংরক্ষণ করা : এক. তাদের থেকে বিরত থাকা। দুই. তাদেরকে সুরক্ষা দেয়া। তাদের থেকে বিরত থাকার ফলে তারা নিরাপত্তা ভোগ করবে, আর তাদেরকে সুরক্ষা দিলে তারা সংরক্ষিত থাকবে। [আল-আহকামুস সুলতানিয়া ; (১৪৩)]’

ইমাম নববি রহ. বলেছেন : ‘আমাদের কর্তব্য তাদের থেকে বিরত থাকা এবং জান ও মালের ক্ষতির সম্মুখীন হলে তার ক্ষতিপুরণ দেয়া, আর তাদের সাথে যারা যুদ্ধ করতে চায়, তাদেরকে প্রতিহত করা। [দেখুন : মুগনিল মুহতাজ : (৪/২৫৩)]’

ইসলামের অধিকাংশ বিদ্যানগণ যিম্মির বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়েছেন। ইবনুন নাজ্জার আল-হাম্বলি বলেন : ‘ইমামের কর্তব্য যিম্মিদের সংরক্ষণ করা, তাদের যারা কষ্ট দেয় তাদেরকে বাধা দেয়া, তাদের বন্দিদের মুক্ত করা ও তাদের সাথে যারা অনিষ্টের ইচ্ছা করে, তাদেরকে প্রতিরোধ করা। [মাতালেব উলিননুহা : (২/৬০২)]’

হিজরির অষ্টম শতাব্দির শুরুতে তাতারিদের আমির কুতুলুশাহ দামেশক আক্রমন করে মুসলিম, নাসারা ও কতক ইহুদি যিম্মিকে বন্দি করে নিয়ে যায়। ইবনে তাইমিয়াহ রহ. আলেমদের একটি বড় জামাতসহ তার কাছে গিয়ে বন্দিদের মুক্তি দাবি করেন, তিনি মুসলিম বন্দিদের ছেড়ে দিতে সম্মত হন, কিন্তু যিম্মিদের ছেড়ে দিতে রাজি হননি। শাইখুল ইসলাম তাকে বলেন : ‘আপনার কাছে বিদ্যমান সকল বন্দিদের ছেড়ে দিতে হবে, ইহুদি ও নাসারা সবাই আমাদের যিম্মায় ছিল, আপনার কাছে একজন বন্দিকেও আমরা রেখে যাব না, না কোন মুসলিম, না কোন যিম্মি। কারণ আমাদের মাঝে শর্ত রয়েছে, আমরা যা ভোগ করব, তারাও তা ভোগ করবে, আমরা যে মুসিবতে পতিত হব, তারাও তাতে অংশিদার হবে।’ অতঃপর তাতারি আমির সকল বন্দিদের মুক্ত করে দেন’। [মাজমুউল ফতোয়া : (২৮/৬১৭-৬১৮)]

ইমাম কারাফি ইমাম ইবন হাযম থেকে মুসলিমদের যে ঐক্য বর্ণনা করেছেন, ইসলাম ব্যতীত অন্য ধর্মে যার কোন নজির নেই। তিনি বলেন : ‘আমাদের যিম্মায় বিদ্যমান কাউকে যদি দারুল হারবের কেউ নিতে আসে, আমাদের উপর ওয়াজিব তাকে অস্ত্র দিয়ে হলেও রক্ষা করা, তার জন্য মৃত্যুকে বরণ করে নেয়া, আল্লাহ ও তার রাসূলের যিম্মায় বিদ্যমান ব্যক্তিকে এভাবেই রক্ষা করতে হয়, এর বিপরীতে তাকে তুলে দেয়া যিম্মা চুক্তি লঙ্ঘন করার শামিল। [আল-ফুরুক : (৩/১৪-১৫)]’