hadith book logo

ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান

লেখকঃ ড. মুনকিয বিন মাহমুদ আস-সাক্কার • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৫

তৃতীয়ত : ইসলামে জিযয়াহ্‌র বিধান :

ইসলাম সহজ ও সরল একটি দীন, এ দীন সকলের অধিকার যথাযথ সংরক্ষণ করেছে এবং সবাইকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করেছে, কি মুসলিম কি অমুসলিম কারো উপরই সে অনৈতিক কিছু চাপিয়ে দেয় নি, বরং পূর্বের দীনে বিদ্যমান কঠিন ও কষ্টকর বিধানগুলো সংস্কার ও পরিশুদ্ধ করে মানব জাতিকে উন্নত ও পরিমার্জিত করেছে। এটাই তার স্বাভাবিক রীতি ও বৈশিষ্ট্য। এ বৈশিষ্ট্যের আলোকে ইসলাম জিযয়াহ্‌ প্রথার মধ্যেও সংশোধনী এনেছে, তা শুধু করের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে নি, যা পরাজিতরা বিজয়ীদের প্রদান করে, বরং তাকে একটি চুক্তিতে রূপান্তরিত করেছে, যা মুসলিম এবং তাদের অধীনতা স্বীকারকারী সম্প্রদায়ের মাঝে সম্পাদিত হয়। এটা উভয়পক্ষের মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তি, যা রক্ষা করা এবং যার প্রতি সম্মান দেখানোর নির্দেশ আল্লাহ তা‘আলা দিয়েছেন, যারা তা ভঙ্গ করে ও তার অধিকার বিনষ্ট করে তাদের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন। ইসলামের দেয়া ‘আহলে যিম্মাহ’ পরিভাষার ফলে তা আরও স্পষ্ট হয়, কারণ এ যিম্মাহ ভঙ্গ করা হারাম, পূর্ণ করা ওয়াজিব, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ যিম্মাহ সংরক্ষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। অধিকন্তু যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম, কেবল তাদের উপরই জিযয়াহ্‌ আরোপ করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন :

( قَاتِلُوا الَّذِينَ لا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ ) ( سورة التوبة : 29)

‘তোমরা লড়াই কর আহলে কিতাবের সেসব লোকের সাথে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন তা হারাম মনে করে না, আর সত্য দীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযয়াহ্‌ দেয়।’ [সূরা আত-তাওবাহ্ : ২৯]

ইমাম কুরতুবি বলেছেন : ‘আমাদের আলেমগণ বলেছেন : কুরআনের ভাষ্যমতে তাদের থেকেই জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করা হবে, যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম। এ ব্যাপারে সকল আলেম একমত যে, জিযয়াহ্‌ শুধু স্বাধীন সাবালক পুরুষ থেকে গ্রহণ করা হবে, অর্থাৎ যারা যুদ্ধ করতে সক্ষম। নারী, বাচ্চা, দাস, পাগল ও খুব বৃদ্ধ ব্যক্তি থেকে জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করা যাবে না। [আল-জামে লি আহকামিল কুরআন : (৮/৭২)]’

ওমর রা. সেনা প্রধানদের নিকট এ মর্মে নির্দেশ জারি করেন : ‘নারী ও বাচ্চাদের উপর জিযয়াহ্‌ নির্ধারণ করবে না, যারা সাবালক হয়েছে একমাত্র তাদের উপরই জিযয়াহ্‌ নির্ধারণ করবে। [দেখুন : ইরওয়াউল গালিল, হাদিস নং : (১২৫৫)]’

আবার জিযয়াহ্‌র পরিমাণও এতো বেশি ছিল না যে, পুরুষরা তা আদায় করতে অক্ষম, বরং তা খুবই কম ও সহজ ছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যার পরিমাণ বাৎসরিক এক দিনারের বেশি ছিল না। উমাইয়া খিলাফতকালে যার পরিমাণ ছিল বাৎসরিক চার দিনার।

ইয়ামানে প্রেরিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিনিধি মু‘আয রা. প্রত্যেক সাবালক থেকে এক দিনার করে জিযয়াহ্‌ গ্রহণ করেন। তিনি বলেন : ‘ইয়ামানে প্রেরণকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বলেন : ত্রিশটি গরু থেকে একটি এক বছরের বাছুর এবং চল্লিশটি গরু থেকে একটি দুই বছরের বাছুর গ্রহণ করবে। (উল্লেখ্য, মুসলিমদের উপর নির্ধারিত যাকাতের পরিমাণও তাই) আর প্রত্যেক সাবালকের উপর এক দিনার অথবা তার সমপরিমাণ কাপড় জিযয়াহ্‌ আরোপ করার নির্দেশ দিয়েছেন’। [তিরমিযি : হাদিস নং : (৬২৩), আবু দাউদ : হাদিস নং : (১৫৭৬), নাসায়ি : হাদিস নং : (২৪৫০), সহিহ তিরমিযিতে আলবানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।]

ওমর ইবনে খাত্তাব রা.-এর যুগে স্বর্ণকারদের উপর চার দিনার এবং রৌপ্যকারদের উপর চল্লিশ দিরহাম জিযয়াহ্‌ ধার্য ছিল, এর সাথে ছিল মুসলিমদের উপর সদকা করা এবং কমপক্ষে তিন দিন তাদের মেহমানদারি করা’। [মিশকাতুল মাসাবিহ : হাদিস নং : (৩৯৭০), আল-বানি হাদিসটি সহিহ বলেছেন।]