hadith book logo

মাবরুর হজ

লেখকঃ মুহাম্মদ ইবন জামীল যাইনু • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ৭

হজ্জের আমলসমূহ (২)

১. ইহরাম

২. মিনায় রাত্রিযাপন

৩. আরাফায় অবস্থান

৪. মুযদালিফায় রাত্রিযাপন

৫. জামরাতে পাথর নিক্ষেপ

৬. হাদী জবাই

৭. মাথা মুণ্ডন

৮. তাওয়াফে যিয়ারত ও সাঈ

৯. ঈদ ও পাথর নিক্ষেপের দিনগুলিতে মিনায় রাত্রিযাপন

১০. বিদায়ী তাওয়াফ

প্রথমত: ইহরাম

১- ৮ যিলহজ মক্কায় নিজ নিজ বাসস্থানে ইহরামের নির্ধারিত কাপড় পরে নিন। কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে বলুন, لبيك اللهم حجة

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণে আরো বলতে পারেন,

«اللَّهُمَّ حَجَّةٌ لَا رِيَاءَ فِيهَا، وَلَا سُمْعَةَ»

“হে আল্লাহ! এ এমন হজ, যাতে কোনো প্রদর্শনেচ্ছা বা প্রচারেচ্ছা নেই”। [ইবন মাজাহ, হাদীস নং ২৮৯০, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

এরপর উঁচু আওয়াজে তালবিয়া পাঠ করুন। বলুন-

«لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالمُلْكَ، لاَ شَرِيكَ لَكَ»

“আমি হাযির, হে আল্লাহ আমি হাযির, আমি হাযির তোমার কোনো শরীক নেই আমি হাযির, নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও যাবতীয় নি‘আমত তোমার এবং রাজত্বও, তোমার কোনো শরীক নেই”। [সহীহ বুখারী, হাদীস নং ১৫৪৯, সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১১৮৪।]

দ্বিতীয়ত: মিনায় রাত্রিযাপন

১. ইহরাম সম্পন্ন করে চারিদিক আলোকিত হবার পর মিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা করুন। সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কসর করে আদায় করুন। জোহর, আসর ও ইশা নিজ নিজ ওয়াক্তে দু’রাকাত করে আদায় করুন। এবং সেখানে রাত্রিযাপন করে পরদিনের ফজর আদায় করুন।

তৃতীয়ত: আরাফায় অবস্থান

১. ৯ যিলহজ সূর্য উদিত হয়ে চারিদিক ফর্সা হয়ে গেলে (ইশরাকের পর) তালবিয়া ও তাকবির পাঠ করতে করতে আরাফা অভিমুখে যাত্রা করুন। জোহরের ওয়াক্তে জোহর ও আসর একসাথে এক আযান ও দুই ইকামতে কসর করে আদায় করুন। সুন্নত আদায় করতে হবে না। আরাফার নির্ধারিত সীমানার অভ্যন্তরে অবস্থান করছেন মর্মে নিশ্চিত হোন। কেননা উকুফে আরাফা হজের প্রধান রুকন। এটি বাদ পড়ে গেলে হজই বাতিল হয়ে যাবে।

২. সালাত আদায় করে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়ান। দুই হাত তুলে দো‘আ করুন। লা শরীক আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করুন। তাঁর লা শরিকত্বের ঘোষণা উচ্চারণ করে বলুন,

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

“আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই, তাঁর জন্য রাজত্ব এবং তাঁর জন্য সমস্ত প্রশংসা, আর তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান”। [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১২১৮।]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

«خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي : لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ» .

“সর্বোত্তম দো‘আ হচ্ছে আরাফার দো‘আ, আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের সর্বোত্তম কথা হল:

«لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ»

“আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই, তাঁর জন্য রাজত্ব এবং তাঁর জন্য সমস্ত প্রশংসা, আর তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান”। [তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫৮৫, আলবানী রহ. হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। দো‘আটি সহীহ মুসলিমে এসেছে, হাদীস নং ১২১৮।]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,

«أَحَبُّ الْكَلَامِ إِلَى اللهِ أَرْبَعٌ : سُبْحَانَ اللهِ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، وَلَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ»

আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় বাক্য চারটি, তা হলো,

«سبحان الله، والحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر» [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২১৩৭।]

সূর্যাস্ত পর্যন্ত দো‘আ ও যিকিরে মশগুল থাকুন।

চতুর্থত: মুযদালিফায় রাত্রিযাপন

১- সূর্যাস্তের পর ধীরে-সুস্থে-শান্তভাবে মুযদালিফা অভিমুখে রওয়ানা হোন। সেখানে পৌঁছে ইশার ওয়াক্তে এক আযান ও দুই ইকামতে মাগরিব ও ইশার সালাত কসর করে আদায় করুন। সুন্নত আদায় করতে হবে না। মুযদালিফায় রাত্রিযাপন ওয়াজিব। আওয়াল ওয়াক্তে ফজর সালাত আদায় করুন। সালাত আদায়ান্তে মাশআরে হারামে কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে দুই হাত উঠিয়ে আল্লাহকে ডাকুন। খুব দীন-হীন হয়ে তাঁর করুণা প্রার্থনা করুন। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু বলে তাঁর প্রশংসা করুন, বড়ত্ব ও একত্ববাদের স্বীকৃতি দিন। মুযদালিফা পুরোটাই মাশআর। দুর্বলদের জন্য মধ্য রাতের পর মুযদালিফা ত্যাগের অনুমতি আছে।

পঞ্চমত: কঙ্কর নিক্ষেপ

১- সূর্যোদয়ের সামান্য পূর্বে চারিদিক ফর্সা হয়ে গেলে মুযদালিফা হতে তালবিয়া পাঠরত অবস্থায় শান্তভাবে মিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হোন। যাওয়ার পূর্বে বুটের দানার মতো ছোট ছোট কঙ্কর কুড়িয়ে নিতে পারেন। মিনায় পৌঁছে প্রথমে বড় জামরায় সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। মিনা ডানে আর মক্কা বামে রেখে দাঁড়ান। অতঃপর আল্লাহু আকবার বলে সাত বারে সাতটি কঙ্কর নিক্ষেপ করে নির্ধারিত গর্তে ফেলুন। কোনো কঙ্কর গর্তে না পড়লে এর পরিবর্তে আরেকটি নিক্ষেপ করতে হবে। কঙ্কর নিক্ষেপের সাথে সাথে তালবিয়া বন্ধ করে দিন। কঙ্কর সূর্যোদয়ের পর থেকে শুরু করে পরবর্তী রাত পর্যন্ত নিক্ষেপ করা যায়।

ষষ্ঠত: হাদী জবাই

ঈদের দিনগুলোর যে কোনো দিন হাদী জবাই করুন। তা হতে নিজে খান এবং দরিদ্রদের দান করুন। নিজে জবাই না করে অপরকে উকিল বানাতে পারেন। সে ক্ষেত্রে যার উপর আপনার আস্থা হয় তাকে কিংবা স্বীকৃত কোনো সংস্থাকে দায়িত্ব দিয়ে হাদির মূল্য বাবদ নগদ অর্থ হস্তান্তর করতে পারেন। হাদী জবাইয়ের আর্থিক সঙ্গতি না থাকলে ১০টি সাওম পালন করুন।। ৩টি হজে আর অবশিষ্ট ৭টি নিজ পরিজনের নিকট প্রত্যাবর্তনের পর। নারী হজযাত্রী এ ক্ষেত্রে পুরুষের ন্যায়। হাদী জবাই ক্বিরান ও তামাত্তু হজকারীর ওপর ওয়াজিব। ইফরাদ হজকারীর জন্য হাদী জবাই আবশ্যক নয়।

সপ্তমত: মাথা মুণ্ডন

১- পূর্ণ মাথার চুল মুণ্ডন করে মাথা ন্যাড়া করুন। অথবা চুল ছোট করুন। মুণ্ডন করা উত্তম। নারীরা সর্বাবস্থায় চুলের গোছা হতে এক কড়া পরিমান চুল কাটবেন। তাদের ক্ষেত্রে মুণ্ডন নেই। অনেককে দেখা যায় মাথার কিছু অংশের চুল কেটে অবশিষ্ট অংশ রেখে দেয়। এর মাধ্যমে কসরের বিধান আদায় হবে না। বরং পূর্ণ মাথার চুলই কাটতে হবে। কেননা কসর (চুল কর্তন) হলক (মুণ্ডন)-এর স্থলাভিষিক্ত। আর পূর্ণ মাথার চুল ফেলে দিলেই কেবল হলক সাধিত হয়।

২- হলকের পর গোসল করে সাধারণ পোশাক পরিধান করুন। সু-গন্ধি মাখুন। ইহরামের কারণে যা কিছু হারাম হয়ে গিয়েছিল এখন থেকে স্ত্রী ব্যতীত সব কিছুই হালাল।

অষ্টমত: তাওয়াফ ও সাঈ

১- মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিন। ওমরাতে বর্ণিত পদ্ধতিতে (রমল ও ইজতিবা ব্যতীত) পবিত্র কা‘বা সাতবার প্রদক্ষিণ করে তাওয়াফ করুন। আর সাফা মারওয়ার মাঝে সাতবার সাঈ করুন। তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করার পর স্ত্রীও হালাল হয়ে যাবে। তাওয়াফ-সাঈ এদিন কষ্টকর মনে হলে আইয়ামে তাশরিকের যে কোনো দিন আদায় করতে পারেন। তা-ও যদি সম্ভব না হয় তাহলে যিলহজ মাসের যে কোনো দিন সেরে নিলেই হবে।

২- ঈদের দিনের আমল চতুষ্টয়ের মাঝে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা সুন্নত। প্রথমে বড় জামরার কঙ্কর নিক্ষেপ, এরপর হাদী জবাই, তারপর মাথা মুণ্ডন এবং সর্বশেষ তাওয়াফে ইফাযা। আর তামাত্তুকারীর জন্য তাওয়াফের পর সাঈ।

৩- আপনি যদি ধারাবাহিকতা লঙ্ঘন করে আমলগুলো আগে পরে করে ফেলেন। তাহলে সমস্যা নেই। কারণ এ ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাড় দিয়েছেন। সাহাবদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন। ( لا حرج، لا حرج ) অর্থাৎ কোনো সমস্যা নেই।

নবমত: মিনায় রাত্রিযাপন ও কঙ্কর নিক্ষেপ

১- ঈদের দিনগুলোয় মিনায় রাত্রিযাপন করা ওয়াজিব। তাই আপনি তাওয়াফ শেষ করে মিনায় ফিরে আসুন।

২- কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। ১১, ১২ ও ১৩ তারিখের কঙ্কর নিক্ষেপের সময় হচ্ছে জোহরের ওয়াক্ত হবার পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত। প্রয়োজন বশত: রাতেও মারা যায়।

৩- ১১ তারিখ তিন জামরায় ৭টি করে ২১টি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। ছোট জামরা থেকে শুরু করুন। কঙ্কর মিনা হতে সংগ্রহ করতে পারেন। ছোট জামরায় ( মিনা ডান পাশে ও মক্কা বাম পাশে রেখে দাঁড়িয়ে) আল্লাহু আকবার বলে সাত বারে ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। এর পর কিবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে আল্লাহর নিকট দো‘আ করুন।

৪- অতঃপর মধ্য জামরায় ছোট জামরার ন্যায় ৭টি কঙ্কর মারুন এবং দো‘আ করুন।

৫- সবশেষে বড় জামরায় একই নিয়মে ( মিনা ডান পাশে ও মক্কা বাম পাশে রেখে দাঁড়িয়ে) ৭টি কঙ্কর নিক্ষেপ করুন। বড় জামরাতে পাথর নিক্ষেপের পর দো‘আর জন্য আর দাঁড়াবেন না।

৬- ঈদের তৃতীয় দিন অর্থাৎ ১২ যিলহজ ১১ যিল হজের ন্যায় তিন জামরাতে ৭টি করে ২১টি পাথর নিক্ষেপ করুন। ছোট ও মধ্য জামরাতে নিক্ষেপের পর দো‘আ করুন। জামরায়ে আকাবাতে নিক্ষেপের পর আর দো‘আ নেই। এবার আপনি ইচ্ছা করলে মিনা ছেড়ে চলে যেতে পারেন। তবে সূর্যাস্তের পূর্বেই আপনাকে রওয়ানা দিয়ে মিনা ত্যাগ করতে হবে। রওয়ানা দেওয়ার আগেই সূর্য অস্তমিত হয়ে গেলে সে রাতও আপনাকে মিনায় অবস্থান করে পরদিন জোহরের পর তিন জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ করা ওয়াজিব হবে। আর এটিই উত্তম। অর্থাৎ ১২ তারিখ না গিয়ে ১৩ তারিখ অবস্থান করে পাথর মেরে তাখির করে যাওয়াই উত্তম। নবীজী তাই করেছেন।

৭- মাজুর-অক্ষমদের জন্য ঈদের দ্বিতীয় দিনের রমি (কঙ্কর নিক্ষেপ) তৃতীয় দিনে আর তৃতীয় দিনেরটি চতুর্থ দিনে বিলম্বিত করা জায়েয। দুর্বল, অসুস্থ নারী-পুরুষ ও শিশুদের পক্ষে অপরকে নিক্ষেপের জন্য উকিল বানানোও জায়েয আছে।

দশমত: বিদায়ী তাওয়াফ

১- হায়েয ও নিফাসগ্রস্ত নারী ব্যতীত দূর থেকে আসা সকল হজযাত্রীদের জন্য বিদায়ি তাওয়াফ ওয়াজিব। বিদায়ি তাওয়াফ সম্পন্ন করেই তাদেরকে মক্কা ত্যাগ করতে হবে। না হলে দম দিতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ পাথর নিক্ষেপ কিংবা মিনায় রাত্রিযাপন ত্যাগ করলেও পশু জবাই করে দম দিতে হবে।

হারাম থেকে বের হবার সময়

«اللهم صل على محمد اللهم إني أسألك من فضلك» .

“হে আল্লাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি রহমত বর্ষণ করুন, হে আল্লাহ আমি আপনার অনুগ্রহ কামনা করি”। [হাদীসের দ্বিতীয় অংশ সহীহ মুসলিমে রয়েছে, হাদীস নং ৭১৩। আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪৬৫, আলবানী রহ. হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।]

বলে বাম পা দিয়ে বের হোন। সফরের প্রাক্কালে নির্ধারিত দো‘আটি পাঠ করতে ভুল করবেন না।