hadith book logo

সূরা আন-নাবা-এর তাফসীর

লেখকঃ আবু আবদুল্লাহ কুরতুবী রহ. • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১০

রূহ-এর তাফসীর বা ব্যাখ্যা:

আল্লাহ তা‘আলার বাণী: يَوۡمَ يَقُومُ ٱلرُّوحُ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ صَفّٗاۖ “সেদিন রূহ (জিবরাঈল) আর ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে” يوم শব্দটিতে যবর হয়েছে কেননা তা ظرف (অর্থাৎ ক্রিয়া সংঘটিত হবার কাল) অর্থাৎ সেদিন তার সম্মুখে কারও কথা বলার সাহস হবে না যেদিন রূহ দাঁড়াবেন এ আয়াতে روح (রূহ) দ্বারা কে বা কী উদ্দেশ্য এ ব্যাপারে আট প্রকার মত রয়েছে:

প্রথম মত হচ্ছে: রূহ হচ্ছে ফিরিশতাদের মধ্য থেকে অন্যতম একজন ফিরিশতা। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ‘আরশের পরে তার চেয়ে বড় আর কোনো সৃষ্টি তৈরি করেন নি যখন কিয়ামত সংঘটিত হবে তখন সে এক কাতারে দাঁড়াবে আর সমস্ত ফিরিশতা এক কাতারে দাঁড়াবে, তার অবয়ব হবে ফিরিশতাদের কাতারের মতো। এ ব্যাপারে আব্দুল্লাহ ইবন মাসঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকেও অনুরূপ বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, রূহ এমন একজন ফিরিশতা যিনি সপ্ত আসমান, সপ্ত জমিন এবং পাহাড়সমূহ থেকেও বড়, চতুর্থ আসমানের বিপরীতে তার অবস্থান, সে প্রত্যহ বারো হাজার বার আল্লাহ তা‘আলার তাসবীহ পাঠ করে, আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক তাসবীহ থেকে একজন করে ফিরিশতা সৃষ্টি করেন, সে কিয়ামত দিবসে একাই এক কাতারে দাঁড়াবে আর সমস্ত ফিরিশতা দাঁড়াবে এক কাতারে।

দ্বিতীয় মত হচ্ছে: রূহ হচ্ছে জিবরীল আলাইহিস সালাম, এ মত পোষণ করেছেন শা‘বী, দাহ্হাক, সা‘ঈদ ইবন জুবাইর। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমাবর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলার ‘আরশের ডান পার্শ্বে নূরের একটি দরিয়া আছে, যা সপ্ত আসমান, সপ্ত জমিন এবং সাত সমুদ্রের মতো। জিবরীল আলাইহিস সালাম প্রতিদিন সকালে এতে ডুব দিয়ে গোসল করেন। ফলে তার নূর, তার সৌন্দর্য এবং তার সম্মান আরও বেড়ে যায়, এরপর তিনি কেঁপে উঠেন এরপর তার পালক থেকে নির্গত হওয়া প্রতিটি ফোঁটা থেকে আল্লাহ তা‘আলা সত্তর হাজার ফিরিশতা সৃষ্টি করেন, তাদের থেকে প্রত্যেক দিন সত্তর হাজার ফিরিশতা বাইতুল মা‘মূর এবং সত্তর হাজার ফিরিশতা কা‘বায় প্রবেশ করে; কিন্তু কিয়ামত দিবস পর্যন্ত এদের কারও দ্বিতীয়বার সেখানে ফিরে আসার সুযোগ হবে না ওয়াহাব বলেন, জিরবীল আলাইহিস সালাম আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে দাঁড়ান, তাতে ভয়ে তিনি কম্পবান থাকেন, প্রত্যেক কম্পনে আল্লাহ তা‘আলা এক লক্ষ ফিরিশতা সৃষ্টি করেন, ফিরিশতাগণ আল্লাহ তা‘আলার সম্মুখে অবনত মস্তকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকে, এরপর আল্লাহ তা‘আলা যখন তাদেরকে কথা বলার অনুমতি দান করেন তখন তারা বলে لا إله إلا انت আপনি ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই আর এটাই হচ্ছে وَقَالَ صَوَابٗا এর অর্থ। এ কথাই আল্লাহ তা‘আলার বাণী, يَوۡمَ يَقُومُ ٱلرُّوحُ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ صَفّٗاۖ لَّا يَتَكَلَّمُونَ إِلَّا مَنۡ أَذِنَ لَهُ ٱلرَّحۡمَٰنُ “সেদিন রূহ (জিবরাঈল) আর ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে, কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না, সে ব্যতীত যাকে পরম করুণাময় অনুমতি দিবেন” কথা বলার وَقَالَ صَوَابٗا “আর সে যথার্থ কথাই বলবে” অর্থাৎ তার কথা: لا إله إلا انت (আপনি ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই)

তৃতীয় মত হচ্ছে: আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এ আয়াতে রূহ হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার সৈন্যসামন্তের মধ্য থেকে এক সৈন্য, তারা ফিরিশতা নয়, তাদের মাথা, হাত-পা আছে, তারা আহার করে, এরপর তিনি পাঠ করেন: يَوۡمَ يَقُومُ ٱلرُّوحُ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ صَفّٗا “সেদিন রূহ (জিবরীল) আর ফিরিশতাগণ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াবে ” ওরাও সৈন্য, এরাও সৈন্য, এ মত পোষণ করেছেন আবু সালিহ, মুজাহিদ, এর ভিত্তিতে মানুষের মতোই তাদের আকৃতি, তবে তারা মানুষ নয়

চতুর্থ মত হচ্ছে: তারা হচ্ছে ফিরিশতাদের মাঝে সবচেয়ে সম্মানিত, মুকাতিল ইবন হাইইয়ান এ মত ব্যক্ত করেছেন

পঞ্চম মত হচ্ছে: তারা হচ্ছে ফিরিশতাগণের তত্ত্বাবধায়ক, ইবন আবু নাজীহ এ মত পোষণ করেছেন।

ষষ্ঠ মত হচ্ছে: তারা হচ্ছে আদম সন্তান (অর্থাৎ মানব), হাসান এবং কাতাদা এ মত ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ যাদের রূহ (আত্মা) রয়েছে। আওফী এবং কুরাযী বলেন, এ মতটি আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু গোপন রাখতেন। তিনি বলেন, তারা হচ্ছে মানুষের আকৃতির মত এক সৃষ্টি, আসমান থেকে যে ফিরিশতাই অবতীর্ণ হয় তার সাথে রূহ থাকে।

সপ্তম মত হচ্ছে: আদম সন্তানদের রূহসমূহ এক কাতারে দাঁড়াবে আর ফিরিশতাগণ এক কাতারে দাঁড়াবে, আর সেটা সিঙ্গার দুই ফুৎকারের মধ্যবর্তী সময়ে তাদের রূহগুলোকে তাদের দেহসমূহে ফিরিয়ে দেওয়ার পূর্বে। আতিয়্যাহ এ মত ব্যক্ত করেছেন।

অষ্টম মত হচ্ছে: তা হচ্ছে কুরআন, যায়েদ ইবন আসলাম এ মত পোষণ করেছেন আর তিনি দলীল হিসেবে এ আয়াত পাঠ করেন: ﴿وَكَذَٰلِكَ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ رُوحٗا مِّنۡ أَمۡرِنَاۚ ٥٢﴾ [ الشورى : ٥٢ ] “এভাবে (উপরোক্ত ৩টি উপায়েই) আমার নির্দেশের মূল শিক্ষাকে তোমার কাছে আমরা অহী যোগে প্রেরণ করেছি” [সূরা আশ- -শূরা, আয়াত: ৫২] আর صفا এটি মাসদার অর্থাৎ তারা দাঁড়াবে সারিবদ্ধভাবে, মাসদার একবচন ও বহুবচন উভয়ের জন্যই ব্যবহৃত হয়, যেমন عدل (ন্যায়বিচার) صوم (সিয়াম)। আর এখান থেকেই ঈদের দিনকে বলা হয় يوم الصف সারিবদ্ধ (হয়ে দাঁড়ানো)-এর দিন আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের অপর এক স্থানে বলেন, ﴿وَجَآءَ رَبُّكَ وَٱلۡمَلَكُ صَفّٗا صَفّٗا ٢٢﴾ [ الفجر : ٢٢ ] “আর যখন তোমার রব আসবেন আর ফিরিশতাগণ আসবে সারিবদ্ধ হয়ে” [সূরা আল-ফাজর, আয়াত: ২২] এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয় যে, সারির সংখ্যা একাধিক হবে। আর তা সংঘটিত হবে উপস্থাপন ও হিসাব-নিকাশের দিনে। ক্বুতাবী এবং অন্যান্যরা এ অর্থ প্রকাশ করেছেন। কেউ কেউ বলেন, রূহ দাঁড়াবে এক কাতারে আর ফিরিশতাগণ দাঁড়াবে আরেক কাতারে, তাঁরা দু’টি কাতারে দাঁড়াবে কেউ বলেন, তারা সকলে একই কাতারে দাঁড়াবে।

لَّا يَتَكَلَّمُونَ “কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না” অর্থাৎ সুপারিশ করতে পারবে না, إِلَّا مَنۡ أَذِنَ لَهُ ٱلرَّحۡمَٰنُ “সে ব্যতীত যাকে পরম করুণাময় অনুমতি দিবেন” সুপারিশের।

وَقَالَ صَوَابٗا “আর সে যথার্থ কথাই বলবে” অর্থাৎ সঠিক তথা হক্ব কথা দাহ্হাক এবং মুজাহিদ এ মত পোষণ করেছেন আবু সালিহ বলেন, অর্থাৎ لا إله إلا الله অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই দাহ্হাক বর্ণনা করেন, আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা বলেন, যে ব্যক্তি لا إله إلا الله বলেছে তার জন্য সুপারিশ করবে। তবে ‘সঠিক কথা’ তো তা-ই যা হবে কথা ও কাজে সঠিক। ...

কেউ কেউ বলেন, (কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না) অর্থাৎ ফিরিশতাগণ এবং রূহ যারা কাতারে দণ্ডায়মান হবে, তারা কথা বলতে পারবে না আল্লাহ তা‘আলার হাইবাত অর্থাৎ ভীতিজড়িত শ্রদ্ধা এবং তাঁর সম্মান-মর্যাদার কারণে, তবে দয়াময় যাকে অনুমতি প্রদান করবেন শাফা‘আত করার, তারা হচ্ছে ওরাই যারা সঠিক কথা বলেছে, তারা আল্লাহ তা‘আলার একত্ববাদ ঘোষণা করেছে এবং তাঁর তাসবীহ পাঠ করেছে

হাসান বলেন, রূহ কিয়ামত দিবসে বলবে: কেউ আল্লাহ তা‘আলার রহমাত ছাড়া জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর কেউ জাহান্নামেও নয়; তবে আমলের কারণে, আর তাই হচ্ছে وَقَالَ صَوَابٗا “আর সে যথার্থ কথাই বলবে” এ কথার অর্থ।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ذَٰلِكَ ٱلۡيَوۡمُ ٱلۡحَقُّۖ “এ দিনটি সত্য, সুনিশ্চিত” অর্থাৎ অবশ্যই ঘটবে فَمَن شَآءَ ٱتَّخَذَ إِلَىٰ رَبِّهِۦ مَ‍َٔابًا “অতএব যার ইচ্ছে সে তার রবের দিকে আশ্রয় গ্রহণ করুক” অর্থাৎ সৎকর্মের মাধ্যমে তার প্রত্যাবর্তনস্থল, অর্থাৎ যখন সে ভালো কাজ করে তখন তা আল্লাহ তা‘আলার দিকে ফিরায় (তার দয়ায় হয়েছে বলে), আর যখন সে মন্দ কাজ করে তখন সেটা তার নিজের (কারণে হয়েছে) বলে গণ্য করে। আর এ অর্থই বুঝা যায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত হাদীস থেকে, তিনি বলেন, الخير كله بيديك والشر ليس إليك অর্থাৎ “ভালো সব কিছুই আপনার হাতে আর মন্দ আপনার প্রতি সম্বন্ধযুক্ত নয়”। কাতাদা বলেন, مأبا এর অর্থ হচ্ছে পথ।

আল্লাহ তা‘আলার বাণী: إِنَّآ أَنذَرۡنَٰكُمۡ عَذَابٗا قَرِيبٗا “আমরা তোমাদেরকে নিকটবর্তী শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি” এখানে কুরাইশ কাফির এবং আরবের মুশরিকদের সম্বোধন করে বলা হচ্ছে। কেননা তারা বলে: আমরা পুনরুত্থিত হবো না (এখানে) ‘আযাব দ্বারা উদ্দেশ্য পরকালের শাস্তি, যা কিছুই আসন্ন তাই নিকটবর্তী, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿كَأَنَّهُمۡ يَوۡمَ يَرَوۡنَهَا لَمۡ يَلۡبَثُوٓاْ إِلَّا عَشِيَّةً أَوۡ ضُحَىٰهَا ٤٦﴾ [ النازعات : ٤٥ ] “যেদিন তারা তা দেখবে সেদিন তাদের মনে হবে, যেন তারা (পৃথিবীতে) এক সন্ধ্যা বা এক সকালের বেশি অবস্থান করে নি”। [সূরা আন- নাযি‘আত, আয়াত: ৪৫] কালবী এবং অন্যান্যর এরূপ ব্যাখ্যা দিয়েছেন কাতাদা বলেন, দুনিয়ার শাস্তি, কেননা তা উভয় শাস্তির মাঝে অধিক নিকটবর্তী মুকাতিল বলেন, তা হচ্ছে বদরের ময়দানে কাফিরদের নিহত হওয়া, তবে সবচেয়ে স্পষ্ট হচ্ছে: তা হচ্ছে পরকালের শাস্তি, তা হচ্ছে মৃত্যু এবং কিয়ামত কেননা যে মারা যায় তার কিয়ামত শুরু হয়ে যায়, কাজেই যদি সে জান্নাতবাসী হয় তবে সে তার বাসস্থান জান্নাতে দেখতে পায় আর যদি সে হয় জাহান্নামী তবে অপমান-অপদস্থ প্রত্যক্ষ করে এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, يَوۡمَ يَنظُرُ ٱلۡمَرۡءُ مَا قَدَّمَتۡ يَدَاهُ “যেদিন মানুষ দেখতে পাবে তার হাতগুলো আগেই কী (‘আমাল) পাঠিয়েছে” সেই শাস্তির সময়ের মাঝে, অর্থাৎ আমরা তোমাদেরকে সেদিনের নিকটবর্তী শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করেছি, তা হচ্ছে যেদিন মানুষ দেখতে পাবে যে, তার হাতগুলো আগেই কী (আমল) পাঠিয়েছে; অর্থাৎ প্রত্যক্ষ করবে।

কেউ কেউ বলেন, তার দিকে দেখবে যা আগেই পাঠিয়েছে, এখানে إلى শব্দটি উহ্য আছে, المرء দ্বারা হাসানের মতে এখানে উদ্দেশ্য মুমিন, সে নিজের আমল পেয়ে যাবে, আর কাফির নিজের কোনো আমল পাবে না, সে আকাঙ্খা করবে মাটি হয়ে যেতে