hadith book logo

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমকালীন আরবের অবস্থা ও তাঁর মক্কী জীবন

লেখকঃ মো. আব্দুল কাদের • পরিচ্ছেদ সংখাঃ ১

পরিচ্ছেদঃ ১১

খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ

খাদীজা রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন দৃঢ়চেতা ব্যক্তিত্বসম্পন্না, প্রখর বুদ্ধিমতী, বোধশক্তিসম্পন্না, আত্মমর্যাদাসম্পন্না ও অতি উচ্চ বংশীয় মহীসয়ী মহিলা। নবীর মহত্ব ও সততার সাথে পরিচিত হওয়া তাঁর জন্য একটা অতিরিক্ত সৌভাগ্য হয়ে দেখা দিল। বলা বাহুল্য, এটা ছিল আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুগ্রহের ফল। মায়সারার উক্ত অলৌকিক ঘটনা শুনে খাদীজা এত অভিভূত হলেন যে, তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নিম্নরূপ বার্তা পাঠালেন, “ভাই আপনার গোত্রের মধ্যে আপনার যে মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান, যে আত্মীয়তার বন্ধন এবং সর্বোপরি আপনার বিশ্বস্ততা ও সত্যবাদিতার যে সুনাম রয়েছে, তাতে আমি মুগ্ধ ও অভিভুত।” এ বলে খাদীজা তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। কুরাইশদের মধ্যে তখন খাদীজা ছিলেন ধনে-মানে, মর্যাদায় ও বংশীয় আভিজাত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মহিলা। তাঁর গোত্রে এমন কোন পুরুষ ছিল না, যে তাকে সাধ্যে কুলালে বিয়ে করা অভিলাষ পোষণ করতো না। খাদীজার পিতার নাম খুওয়ায়লিদ এবং মাতার নাম ফাতিমা। পিতামাতা উভয়েই পূর্বপুরুষ লুওয়াইতে গিয়ে একই প্রজন্মে মিলিত হয়েছেন। [প্রাগুক্ত, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৬২; মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ, পৃ. ৩৮।]

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদীজার প্রস্তাব চাচাদের কাছে পেশ করলেন। চাচা হামযা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সাথে নিয়ে তৎক্ষণাৎ খাদীজার পিতার কাছে চলে গেলেন। তার সাথে দেখা করে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব দিলেন। নির্ধারিত দিনে বিবাহ অনুষ্ঠানে আবু তালিব বনু হাশিম এবং মুদের বংশের সর্দারগণ খাদীজার গৃহে সমবেত হলেন। আবু তালিব বিবাহের খুতবা পাঠ করেন। এ খুতবায় তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যে সমস্ত কথাবার্তা বলেছেন তা উল্লেখ্যযোগ্য।

আবু তালিব বলেন, “ইনি মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ। যদিও তিনি ধন-সম্পদে কম, কিন্তু ভদ্র, চরিত্র ও উচ্চ মর্যাদার কারণে যে ব্যক্তিকেই প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রাখা যাক না কেন, পরিণামে তিনিই হবেন উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। কেননা ধনদৌলত ধ্বংসশীল, ছায়া স্বরূপ এবং ক্ষীয়মান বস্তু। ইনি মুহাম্মদ, যার আত্মীয়তা সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন, খাদীজা বিনত খুয়ায়লিদের সাথে প্রণয়সূত্রে আবদ্ধ করতে চাই। তার সমস্ত মোহরে মু‘আজ্জাল (তাৎক্ষণিক আদায়কৃত) মোহরে মুয়াজ্জাল (বিলম্বে পরিশোধযোগ্য) আমার সম্পদ হতে আদায়কৃত এবং আল্লাহর শপথ, এরপর তাঁর মান-সম্মান ও প্রভাব অনেক গুণ বেড়ে যাবে।” [মুহাম্মাদ রসূলুল্লাহ, পৃ. ৩৮।]

ইবন হিশাম বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণী খাদিজাকে মোহরানা স্বরূপ ২০টি তরুণ উট প্রদান করেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বয়স ছিল ২৫ বছর। আর খাদীজার বয়স হয়েছিল ৪০ বছর। খাদীজাই ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর প্রথম স্ত্রী এবং তাঁর জীবদ্দশায় তিনি আর কোন বিবাহ করেন নি।

খাদীজার গর্ভে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাসিম, তাহির, তায়্যিব, যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতিমা-এই কজন সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। একমাত্র ইব্রাহীম ছাড়া তাঁর সকল সন্তানই খাদীজার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। কাসিমের নাম অনুসারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবুল কাসিম নামেও খ্যাত হন। কাসিম, তায়্যিব, তাহির জাহিলিয়ার যুগেই মারা যান। কিন্তু মেয়েরা সবাই ইসলামের আবির্ভাব প্রত্যক্ষ করেন এবং সবাই ইসলাম গ্রহণ করে পিতার সঙ্গে হিজরত করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন কাসিম। তারপর ক্রমান্বয়ে তায়্যিব, তাহির, কন্যা রুকাইয়া, যয়নব, উম্মে কুলসুম ও সর্বশেষে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহু জন্মগ্রহণ করেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অপর এক সন্তান ছিলেন ইব্রাহীম। ইনি মারিয়্যার গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। মিসরের খ্রিষ্টান শাসক মুকাওকিস মারিয়্যাকে উপঢৌকন হিসেবে প্রেরণ করেছিলেন। [আস সীরাতুল নবুবিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, পৃ. ১৫৬-১৫৭।]